ঢাকা, শনিবার 17 December 2016 ৩ পৌষ ১৪২৩, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানুষ মানুষের জন্য তাই আসুন রোহিঙ্গাদের অন্তত মানুষ মূল্যায়ন করি

রেহানা বিনতে আলী : বিজয়ের মাস ডিসেম্বর মুক্তির মাস ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই মাসে স্বাধীন বাঙ্গালীরা মুক্ত বিহঙ্গের মত আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে। কেননা এর পূর্বে বাঙ্গালীরা পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে সীমাহীন জুলুম-নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছে। সেই মুহূর্তে আমাদের প্রতিবেশী হিন্দু রাষ্ট্র আমাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য পেয়ে আমরা অনেকটা দ্রুতই স্বাধীন হয়েছি। অবশ্য তার স্বীকৃতিও বাংলাদেশ কম দেয়নি এবং এখনও দিচ্ছে। এটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বৈকি।
বর্তমান সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান করা। এমন বিষয়ে কলম না ধরলে বিবেকের দংশনে পড়তাম। আমার এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় যদি পাঠকগণ তথা রাষ্ট্রের প্রশাসকবৃন্দ একটুও টনক নড়ে তবেই স্বার্থকতা। মূলত একজন মানুষ অন্য মানুষের জন্য ন্যূনতম কিছু দায়িত্ব কর্তব্য থাকে। এখানে আমি প্রথমত মুসলিম মানুষ কথাটি বাদই দিলাম। কেননা কেউ কোন বিপদে পড়লে বা সমস্যায় পড়লে প্রথমত তাকে মানুষ হিসাবে মূল্যায়ন করা দরকার। এরপর আসবে সেকি মুসলমান, না আত্মীয়, না প্রতিবেশী, নাকি স্বদেশি অথবা ভিনদেশি। এই যে বর্তমানে মিয়ানমার মুসলমান তথা রোহিঙ্গাদের উপর বর্বর, অমানুষিক হত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে তাতে আমাদের করণীয় কি কিছুই নেই? এই মুহূর্তে আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারি? অথচ সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশেরই এখন তাদের পাশে দাঁড়ানো বেশি প্রয়োজন এবং তারচেয়েও আছে অনেকটা বাংলাদেশের দিকে। কেননা পার্শ্ববর্তী দেশ, মুসলিম দেশ ও মোটামুটি স¦াবলম্বী একটি দেশ বাংলাদেশ। তাই প্রতিনিয়তই তারা ছুটে আসছে বাংলাদেশের দিকে। যে যেভাবে পারছে সেভাবেই চেষ্টা করছে অনন্ত প্রাণে বেঁচে থাকতে। কারণ সেখানকার অর্থাৎ মিয়ানমারের অনেক সম্পদশালী, প্রভাবশালী, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত মানুষ এখন সব হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব। তবুও তারা চায় একটু শুধুমাত্র প্রাণে বেঁচে থাকতে। তারা কি বেঁচে থাকারও অধিকার হারিয়ে ফেলছে শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার কারণে। এই কঠিন সময়ে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক দেশই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ যেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে কেন? জীবনের মোড় ঘুরিয়ে আবার কোন এক সময় কি এই রোহিঙ্গারা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আমাদের প্রতি সহনশীল হতে পারে না? অথবা আমরাও তাদের কাছে ঠেকে যেতে পারি না?
সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা জোরালোভাবে বলেছেন, যেটি অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার। এখন কথায় কথা আসে, এই মুহূর্তে রোহিঙ্গারা কি অভিবাসী হতে পারে না? আর তাদের উপর আমরা যে বিরূপ আচরণ করছি, সারা বিশ্বে বাংলাদেশের নাগরিকরা ছড়িয়ে আছে সেই দেশগুলোর প্রশাসক বা নাগরিকরা এটা ভাবলে কি অপরাধ হবে? যে বাংলাদেশ এই সময়ে সাহায্যের হাত ঘুটিয়ে নেয়াটা মোটেই ঠিক করেনি।
অথচ এই সময়ে আমরা সাহায্যের দ্বার খুলে দিলে আমাদের জন্য অনেক দেশের সাহায্যের হাত খুলে যেত। কারণ আমরা এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে আত্মনির্ভরশীল হতে পারিনি। এই সহযোগিতার ফলে বাংলাদেশের সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আরো মজবুত হতে পারতো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের মূল্যায়ন বৃদ্ধি পেত। আর এর কারণে আগামীতে অন্য কোন দেশও আড় চোখে আমাদের দিকে কম তাকাবে এবং অন্যদের কাছে এর মাধ্যমে আমরা একটা মাইলফলক হতে পারতাম। যদিও এখনও মাইলফলক হিসাবেই আছি। তবে তা ভালো দৃষ্টিভঙ্গিতে নয় বরং মন্দ দৃষ্টিভঙ্গিতে।
এদিকে কিছু টকশোতে বা বিবৃতিতে দেখলাম যে, কেউ কেউ গলা উঁচু করে বলেছেন, এখন রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিন্তু তাদের নিকট আমার ছোট্ট নিবেদন যে, লাখ লাখ মুসলমানের জীবনের দিকে তাকিয়ে একটু রাষ্ট্রীয় ত্যাগ কি করা যায় না? যার ফলশ্রুতিতে আমরাও বিরাট স্বার্থ কুড়াতে পারি। তাই আসুন আমরা সকলে নেতিবাচক আচরণ দূর করে ইতিবাচক মনোভাবের ভিত্তিতে মানুষ হয়ে মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই। তবে মানবতার পরিচয় ফুটে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ