ঢাকা, রোববার 18 December 2016 ৪ পৌষ ১৪২৩, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘বাংলাদেশে কী বিরোধী মত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে?’

স্টাফ রিপোর্টার : যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য সাময়িকী ‘ফরেন পলিসি’ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিরাপত্তা রাষ্ট্রের গহবরে তলিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী মতের মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে বলা হয়, গুম ও অপহরণের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, মানবাধিকার গ্রুপ ও গুম হওয়ার পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হতে পারে। কিন্তু তাদের পরিবার জানে না, তাদের অবস্থান কিংবা তারা জীবিত বা মৃত। গেলো ৫ বছরে শত শত বাংলাদেশী, বিশেষ করে বিরোধী মতের মানুষ আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে গুম হয়েছে বলে তাদের স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে। বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে যাদের মৃত্যু হয়েছে অথবা জেলে আছেন, তাদের পরিবার এখন নজরদারীতে রয়েছেন।
গত ১৬ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশে কী বিরোধী মত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যখন সাদা পোষাকধারী পুলিশ মীর আহমেদ বিন কাসেমের কাছে আসলো, তখন তাকে জুতা পড়ার সময়ও দেয়া হয়নি। তার স্ত্রীর ভাষ্যমতে, ৯ আগস্ট রাত ১১টায় ঢাকায় তাদের এপার্টম্যান্ট থেকে তুলে নেয়া হয়। এ সময় তাদের দুই মেয়ে চিৎকার করে দৌড়াচ্ছিল।
তার ৫ দিন আগে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে, তার মায়ের সাথে আদালতে শুনানিতে যাওয়ার সময় একদল মানুষ তাদের গাড়ি আটকে তুলে নিয়ে যায়। তারা তাকে অন্য একটি গাড়িতে করে নিয়ে যায়।
সমসাময়িক সময়েই অন্তত: ৩০ জন সাদা পোষাকধারী সাবেক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল আমান আযমীর বাসায় যায় এবং ওই দুইজনের মতোই তাকে গুম করে। তার ভাই সালমান আল আযমীর ভাষ্য মতে, অস্ত্রের মুখে তার ভাইকে একটি খালি এপার্টম্যান্ট থেকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, “এ সময় তারা জানিয়েছিল, তারা পুলিশের একটি বিভাগ থেকে এসেছে।”
এই তিন জন ব্যক্তিই বিরোধী দলের ৩ জন সিনিয়র নেতার সন্তান। তাদের ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে যায়। যদিও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করছে।
এটা তাদের কার্যক্রমের কারণে হোক বা না হোক, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিরাপত্তা রাষ্ট্রের গহবরে তলিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংগঠিত যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় যে ক’জন রাজনীতিবিদকে সাজা দেয়া হয়, তারা তাদেরই সন্তান। এর মধ্যে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমেদ বিন কাসেম, যাদের যুদ্ধাপরাধের ঘটনায় মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। আর আমান আযমী হচ্ছেন, প্রফেসর গোলাম আযমের সন্তান, যিনি ৯০ বছরের সাজা নিয়ে ২০১৪ সালে জেলে মারা যান।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, যার পিতা স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক, ২০০৯ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেন। সেই ট্রাইব্যুনালে সংসদ সদস্যসহ রাজনীতিবিদদেরই সাজা দেয়া হয়। তাদের আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, প্রসিকিউশন যেখানে ৩৫ জন সাক্ষী আনতে পারে, সেখানে ডিফেন্সকে মাত্র ৩ জন আনার সুযোগ দেয়া হয়।
বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে যাদের মৃত্যু হয়েছে অথবা জেলে আছেন, তাদের পরিবার এখন নজরদারীতে রয়েছেন। বিশেষ করে আযমী ও বিন কসেমের পরিবার তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্ধিগ্ন।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, মানবাধিকার গ্রুপ ও গুম হওয়ার পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হতে পারে। কিন্তু তাদের পরিবার জানে না, তাদের অবস্থান কিংবা তারা জীবিত বা মৃত।
তারা বাংলাদেশে ‘গুম’ এর মিছিলে শরিক হয়ে গেলো। গেলো ৫ বছরে এ রকম শত শত বাংলাদেশী, বিশেষ করে বিরোধী মতের মানুষ আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে গুম হয়েছে বলে তাদের স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এখন বাংলাদেশ শাসন করছে সেক্যুলার আওয়ামী লীগ সরকার, যার রাজনৈতিক বিরোধী দল হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী হচ্ছে সবচেয়ে বড় ইসলামী দল। বিরোধী দু’টি দলের মধ্যে জোট রয়েছে। তাদের দলের নেতারাই যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে এবং তাদের অনেক মানুষ নিখোঁজ হয়েছে।
হিউম্যান রাইট্স ওয়াচ ‘ফরেন পলিসি’ কে বলেছে, শুধুমাত্র ২০১৩ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বিএনপির ১৯ জন নিখোজ হয়ে যায়।
বিন কাসেমের বৃটিশ আইনজীবী মাইকেল পুলক বিশ্বাস করেন, তার ক্লায়েন্ট নিখোঁজ অন্য দুইজনের মতোই ঢাকার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত একটি বাহিনীর অফিসে ছিল। তার স্বাস্থ্য নিয়ে তার পরিবার খুবই উদ্বিগ্ন।
বিএনপির মুখপত্র সালাহউদ্দিন আহমদকেও সাদা পোষাকধারীরা তুলে নিয়ে অন্তত: দুই মাস গুম করে রাখে। বিডিনিউজ২৪ ডটকমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি জানিয়েছিলেন, অপরিচিত কিছু মানুষ ঢাকার উত্তরা থেকে তাকে অপহরণ করে। আমি কীভাবে এখানে (ভারতে) আসলাম জানি না। অপহরণের পর কী হয়েছে, আমার তা মনেও নেই।
যুক্তরাজ্য থেকে ফোনে আমান আযমীর ভাই সালমান আযমী জানান, সরকার তার ব্যাপারে পুরোপুরি নিরবতা অবলম্বন করছে। তাকে দীর্ঘদিন নজরদারীতে রাখা হয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাড়ির আশেপাশে সব সময়ই সাদা পোষাকধারী পুলিশ থাকতো। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেনা বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুতির চিঠি পান আমান আযমী। এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। দীর্ঘ ৩০ বছর তিনি সার্ভিসে ছিলেন। সবাই জানে তিনি ছিলেন ভালো আর্মি অফিসারদের মধ্যে অন্যতম।
ক্রাইসিস গ্রুপের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক শাহরিয়ার ফজল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি বিএনপিকেও রাজপথে সভা সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী মতের অনেকগুলো অনলাইন পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, অনেক সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। 
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ফোনে দেয়া সাক্ষাতকারে অপহরণ ও বিচারবহিভুত হত্যাকা-ের ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। তবে তিনি অভিযোগ করেন বিরোধী দল ‘সহিংস রাজনীতি’ করছে। তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমন করা বর্তমান সরকারের অন্যতম সফলতা। আপনারা আগে সন্ত্রাসী দেখেছেন, কিন্তু এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল। কোনো সমস্যা নেই। আর জঙ্গিবাদ হচ্ছে এখন বৈশ্বিক সমস্যা।
সালমান আযমী বলেন, আমরা সব সময় প্রত্যাশা করি, তিনি ফিরে আসবেন। তিনি বলেন, কেউ যদি মারা যায়, তাহলে সবাই জানলো সে মারা গেছে, কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে কী মনে করবো?
এক ই-মেইল বার্তায় বিন কাসেমের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার জানান, তাদের ৩/৪ বছর বয়সী মেয়ে সব সময় তাকে জিজ্ঞেস করে কেন তাদের পিতা তাকে ফোন করে না কিংবা বাড়িতে ফিরে আসে না। তিনি বলেন, আমরা এ ধরনের বিড়ম্বনা কেন ভোগ করবো? বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলের নেতার পরিবারের সদস্য হওয়াই কী বড় অপরাধ?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ