ঢাকা, রোববার 18 December 2016 ৪ পৌষ ১৪২৩, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

এক ক্ষুধার্ত বালকের আর্তি

ইকবাল কবীর মোহন : মহানবী (সা)-এর মন ছিল সীমাহীন দরদে পরিপূর্ণ। মানুষের দুঃখ দেখলে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। তাঁর মন কষ্টে ভারি হয়ে উঠতো। এমনই এক দুঃখজনক ঘটনা ঘটলো একদিন। এক বালক খিদের জ্বালায় আর চলতে পারছিল না। অগত্যা বালকটি একটি ফলের বাগানে ঢুকে পড়লো। বাগানটি ছিল সুমিষ্ট ফলে ভরপুর। বালকটি তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য কয়েকটা ফল কুড়িয়ে নিলো। তারপর পেট ভর্তি করে খেল সেসব ফল। কিছু ফল সে পকেটেও ভরে নিলো। বালকটি ভাবলো, পরে খিদে পেলে এসব ফল খেয়ে  সে খিদে নিবারণ করবে।
খেয়ে-দেয়ে বালকটি আরও ক্লান্ত হয়ে পড়লো। তাই সে গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এমন সময় বাগানের মালিক সেখানে এসে হাজির হলো। বালকটির পকেটে বাগানের ফল দেখতে পেয়ে মালিক খুব রেগে গেল। তাই সে ক্ষুব্ধ হয়ে বালকটিকে বেদম প্রহার করলো। বালকটির কাছ থেকে ফলগুলোও কেড়ে নিলো। শুধু তাই নয়। বাগানের মালিক বালকটির পরনের কাপড়- চোপড়ও খুলে নিলো।
গরিব বালক আর কী করবে! সে গিয়ে মহানবী (সা)-এর নিকট মালিকের বিরুদ্ধে নালিশ জানালো এবং তার ওপর জুলুমের জন্য বিচার চাইলো। সে জানালো, হজরত! আমি একাধারে তিনদিন না খেয়ে অনেক কষ্টে ছিলাম। কেউ আমাকে একমুঠো খাবার পর্যন্ত দেয়নি। খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে বাগানে ঢুকেছি। সেখানে গাছের তলায় পড়েছিল প্রচুর ফল। এর কয়েকটা ফল কুড়িয়ে খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছি। পরে খাবো বলে কিছু ফল পকেটে পুরে রেখেছিলাম। এ জন্য আমি বাগানের মালিকের হাতে ধরা পড়ি। এ কারণে তিনি আমাকে ইচ্ছেমতো মারধর করেছেন। মারের চোটে আমি বেহুঁশ হয়ে পড়েছিলাম। হুঁশ ফিরে এলে দেখলাম আমার পরনে কাপড় নেই। বাগানের মালিক আমার সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার কাছে নালিশ জানাচ্ছি। আমি এর বিচার চাই।
মহানবী (সা) অসহায় বালকটির দুঃখের কথা শুনে মনে প্রচ- কষ্ট পেলেন। তিনি বাগানের মালিককে ডেকে পাঠালেন। মালিক যথারীতি এসে মহানবী (সা)-এর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ।
মহানবী (সা) লোকটিকে উদ্দেশ করে বললেন, তুমি তো দেখছো ছেলেটা খুবই ছোট। ক্ষুধার তাড়নায় সে তোমার বাগানে ঢুকেছে। কয়েকটা ফলও কুড়িয়ে নিয়ে খেয়েছে। এতে কি-ই-বা দোষ হয়েছে? সে তো বিপদে পড়েই এ কাজ করেছে। আর আলাহতায়ালা তো তোমার বাগানে প্রচুর ফল দান করেছেন। তুমি কি বালকটিকে মাফ করতে পারতে না ?
মহানবী (সা)-এর কথা শুনে বাগান মালিক খুব লজ্জা পেল। সে অনুভব করলো যে, কাজটি সে ঠিক করেনি। এটা তার অন্যায় হয়েছে। তাই সে মাফ চাইলো। বালকটির কাপড়-চোপড় সব ফেরত দিলো। শুধু তাই নয়। বাগানের মালিক বালকটিকে তার বাড়িতে নিয়ে গেল এবং তাকে আশ্রয় দিলো।
মহানবী (সা)-এর দরদপূর্ণ মন ও ন্যায়বোধ দেখে বাগানের মালিক আজ অনন্য এক শিক্ষা পেল। এতে তার জীবনধারাও বদলে গেল। আল্লাহর নবী (সা)-এর কথা শুনে সে একজন বিবেকবান মানুষে পরিণত হলো।
পুত্রের খুনিকেও ক্ষমা করলেন পিতা
ইউরোপের স্পেনের কথা আমরা সবাই জানি। এক সময় স্পেনে ছিল মুসলিম শাসন। এই স্পেন শাসন করছেন আমীর আবদরি রহমান। স্পেনের রাজধানী তখন কর্ডোভায়। এখানে বাস করতেন এক আরব শেখ। তিনি  বিপুল ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন। প্রাসাদতুল্য বাড়ি ছিল তার। সুরম্য অট্টালিকা। সামনে নয়নাভিরাম বাগান। সবমিলে শেখের বাড়িটি ছিল অনিন্দ্যসুন্দর। একদিন তিনি বাগানে হাঁটছিলেন। এমন সময় হঠাৎ এক যুবক হম্বদম্ভ হয়ে এসে শেখের বাগানে ঢুকে পড়লো। ভয়ে সে কাঁপছে। যুবকটি শেখের পা জড়িয়ে ধরে তার কাছে জীবনের নিরাপত্তা চাইলো। সে বললো,
‘আমাকে বাঁচান হুজুর, আমাকে রক্ষা করুন। ঐ যে ওরা আসছে। আমাকে ধরতে পারলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি আমাকে বাঁচান।’
ঘটনার আকস্মিকতায় শেখ চমকে উঠলেন। তিনি যুবকটির অবস্থা দেখে অবাক হলেন। তাই যুবটিকে টেনে তুলে তার নিরাপত্তা চাওয়ার কারণ জানতে চাইলেন। যুবক বললো,
‘জনাব! আপনাকে সব খুলে বলছি। পথিমধ্যে আমার সাথে এক যুবকের কথা কাটাকাটি হয়েছে। এক পর্যায়ে আমি তার কথায় উত্তেজিত হয়ে পড়ি। রাগ সামলাতে না পেরে আমি তার মাথায় জোরে এক আঘাত করেছি। এতে যুবকটি সাথে সাথে মারা গেছে। এখন তার সঙ্গীরা আমাকে তাড়া করছে। আমি নিরাপত্তার আশায় আপনার এখানে এসেছি। আপনি আমাকে রক্ষা করুন। ঐ যে ওরা আসছে। ওদের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দোহাই হুজুর, আপনি আমাকে বাঁচান।’ এ কথা বলেই যুবকটি আবারও শেখের পা চেপে ধরলো। শেখ আর কি করবেন। যুবকটিকে টেনে তুলে বললেন,
 ‘তোমার ভয় নেই। আমি কথা দিচ্ছি। তোমার কোনো ক্ষতি হতে আমি দেব না। কেউ তোমাকে কিছু করতে পারবে না। এসো আমার সঙ্গে।’
শেখ যুবকটিকে তার প্রাসাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। তারপর সবার অলক্ষ্যে যুবকটিকে একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখলেন। ফিরে এসে বাগানের দিকে তাকাতেই দেখলেন এক অবাক দৃশ্য। অনেক লোক এখানে জড়ো হয়েছে। সবাই উত্তেজিত। হইচই চিৎকার করছে লোকজন। কয়েকজন লোক এক যুবককে ধরাধরি করে নিয়ে এসেছে। লাশ মনে হলো। খানিকটা এগিয়ে গেলেন শেখ। তার চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। যুবকটির প্রতি চোখ পড়তেই শেখ চিৎকার করে উঠলেন এবং সাথে সাথে হুঁশ হারিয়ে ফেললেন। কারণ, যুবকটি ছিল তারই একমাত্র পুত্র সন্তান।
খানিক পরে শেখ সম্বিত ফিরে পেলেন। তখন একজন উত্তেজিত যুবক বললো,
‘মান্যবর শেখ, একটা বখাটে স্পেনীয় যুবক এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে। তাকে আমরা ধরার চেষ্টা করেছি। সে দৌড়ে এই দিকটায় ছুটে এসেছে। হঠাৎ কোথায় যেন সে উধাও হয়ে গেল। তাই আমরা তাকে ধরতে পারিনি।’
শেখ এবার সবই বুঝতে পারলেন। যে যুবকটি তার আশ্রয়ে আছে সেই যে তার পুত্রকে হত্যা করেছে তা আর বুঝতে বাকি রইলো না। তাই শেখ আর কিছুই বলতে পারলেন না। যুবকের কথা শুনে তিনি চুপ করে রইলেন। এদিকে উত্তেজিত যুবকরা শেখের বাগানে তন্ন তন্ন করে খুঁজলো। কোথাও যুবককে খুঁজে পেল না। তাই তারা হতাশ হলো এবং শেখকে সান্ত¡না দিয়ে চলে গেল।
এদিকে আশ্রিত যুবকটি এসব ঘটনার সবই এতক্ষণ দেখছিল। আর প্রচ- ভয়ের মধ্যে সে সময় কাটালো। সে তার পরিণতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে পড়লো। এখন সে শেখের হাতের মুঠোয়। সে তালাবদ্ধ। পালাবে এমন সুযোগও তার নেই। তাই অবধারিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া যুবকের সামনে আর কিছুই রইলো না।
এরি মধ্যে শেখ তার ছেলের দাফন সম্পন্ন করলেন। শেখের বাড়িতে আজ এক অভাবিত ও মর্মস্পর্শী দৃশ্য। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই এসেছেন। মানুষের পদভারে বাড়ি গমগম করছে। তার বাড়িতে দিনভর চলছে কান্নার রোল। কান্না ও আহাজারির মধ্য দিয়ে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেল তা কেউ টের পেল না।
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগলো। আত্মীয়-স্বজনরা কেউ কেউ যার যার গন্তব্যে ফিরে গেল। বাড়ির লোকজনও অনেকে ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু শেখের চোখে ঘুম নেই। তিনি জেগে রইলেন। পুত্রশোকে কাতর শেখ এক সময় তার বিছানা ছেড়ে উঠলেন আর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন যুবকের কক্ষের সামনে। তিনি কক্ষের তালা খুলে দিলেন। অপরাধী যুবক তো ভয়ে কম্পমান। কিন্তু শেখ ধীর কণ্ঠে যুবককে বললেন,
‘না, যুবক! তোমার ভয়ের কোনো কারণ নেই। আজ তুমি আমার মেহমান। বিপদের সময় আমি তোমাকে আশ্রয় দিয়েছি। তোমার নিরাপত্তা বিধানের নিশ্চয়তা দিয়েছি। কোনো মুসলমান তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারেনা। তাই আমি তোমার কোনো ক্ষতি করবো না। এই পোটলাটা গ্রহণ করো। এখানে কিছু খাবার আছে। খিদে লাগলে তুমি তা খাবে। আমার আস্তাবলে ঘোড়া আছে। এখান থেকে তুমি একটা নিয়ে নাও। তারপর এক্ষুণি এখান থেকে বিদায় হও। না জানি শয়তান আমাকে কুমন্ত্রণা দেয়। আমার মনকে বিষিয়ে তুলে। আর এরপর আমি তোমার কোনো ক্ষতি করে বসি। তার চেয়ে বরং তুমি দূরে চলে যাও। আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করো না। যাও, এক্ষুণি। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।’
এতক্ষণ যে যুবক মৃত্যুর ভয়ে অস্থির ছিল, সে এক্ষণে শেখের কথা শুনে থ হয়ে গেল। এমনও কি মানুষ হতে পারে। তাই সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় যুবকের দু’চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। কিছুক্ষণ সে শেখের মাযাবি মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। অতঃপর সালাম জানিয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলো। দ্রুত ঘোড়া হাঁকিয়ে সে রাতের অন্ধকারে আপন ঠিকানার উদ্দেশ্যে মিলিয়ে গেল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ