ঢাকা, রোববার 18 December 2016 ৪ পৌষ ১৪২৩, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণতন্ত্র মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিতের তাগিদ সিপিডি’র

স্টাফ রিপোর্টার : আগামী ২০২৪ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বের হয়ে আসবে বাংলাদেশ। এরপরই শুরু হবে ‘উন্নয়নশীল’ দেশ হিসেবে নতুন লক্ষ্যমাত্রার যাত্রা।
এলডিসি অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘের ব্যবসা বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড এর বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক ইন মিলনায়তনে আঙ্কটাডের এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। ২০১৫ সালের এলডিসি রিপোর্টেও এ কথা বলেছিল আঙ্কটাড।
এ সময় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, সমতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, উন্নয়ন এখন আর প্রবৃদ্ধি নির্ভর নয়। যারা প্রবৃদ্ধির সূচকের ভিক্তিতে উন্নয়ন মাপেন তারা পিছিয়ে আছে। আবার যারা তথাকথিত গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন করে তারাও উন্নত হতে পারছে না।
অনুষ্ঠানে আঙ্কটাডের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। এতে পর্যালোচনামূলক বক্তব্য রাখেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে স্বল্পন্নোত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ বিবেচিত হবে। ২০২৪ সালে এই তালিকা থেকে বের হয়ে আসবে। আর ২০২৭ সালের পর এলডিসির কোনো সুযোগ সুবিধা পাবে না বাংলাদেশ। এতে আরো বলা হয়, ১৯৭১ সালে ২৫টি এলডিসিভুক্ত দেশ ছিল। এখন ৪৮টি এলডিসিভুক্ত দেশ রয়েছে। আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে এখান থেকে ১০টি দেশ বের হয়ে যাবে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৬টি দেশের উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসবের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও আছে আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, জিবুতি, গিনি, কিরিবাতি, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, সাওতুমে, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, পূর্ব তিমুর, টুভালু, ভানুয়াতু ও ইয়েমেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, জিবুতি, লাওস, মিয়ানমার ও ইয়েমেন ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। অন্যরা আরো আগেই এ মর্যাদা অর্জন করবে।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা পাওয়া আটটি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া স্বল্পোন্নত কয়েকটি দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ এলেও বাংলাদেশসহ আরো কয়েকটি দেশে কাক্সিক্ষত বৈদেশিক বিনিয়োগ আসছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭১ সালে বিশ্বের দেশগুলোকে উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে জাতিসংঘ। প্রতি তিন বছর অন্তর এলডিসি তালিকা পর্যালোচনা করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। যেসব দেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে, কমিটি সেসব দেশের নাম উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কাছে পাঠায়। পরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এর চূড়ান্ত অনুমোদন ও ঘোষণা দেয়া হয়।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা মধ্যম আয়ের দেশ। এটা ঘোষণার কিছু নেই। মাথাপিছু আয়ই বলে দেবে, আমরা ইতিমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে গেছি। কারণ, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে বিশ্বব্যাংকের হিসেবে অনুযায়ী, ১ হাজার ২৬ ডলার মাথাপিছু আয় প্রয়োজন। এটা আমরা ছাড়িয়ে গেছি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের কাছাকাছি গিয়েও পারেনি। কারণ, তাদের সামাজিক স্থিতিশীলতা ছিল না। আফ্রিকার কিছু দেশ ও ইথিওপিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ইথিওপিয়া প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি করছিল। তারপরও তারা উন্নত হতে পারেনি। কারণ, তারা তথাকথিত গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন করেছিল।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, উন্নয়ন হতে হবে সবার জন্য। যেখানে সবার অংশগ্রহণ থাকতে হবে। বঞ্চনা কমাতে হবে। আইনের শাসন ও সব মানুষের জন্য সমান সমৃদ্ধি আনতে হবে। একইসঙ্গে পরিবেশের সুরক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। যারা ‘গণতন্ত্র আগে না উন্নয়ন আগে’ বলে বিতর্ক করছেন তারা উন্নয়নের আধুনিক ধারা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। কেননা, সমতা যদি না থাকে তাহলে সেটা উন্নয়ন নয় বলে জানান তিনি।
সিপিডির এই গবেষক জানান, বিশ্বের বহু দেশ এখন এলডিসি থেকে বের হয়ে যেতে চাচ্ছে। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো এলডিসিভুক্ত দেশগুলো যে পরিমান সহয়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলো তা পায়নি, পেলেও ব্যবহার করতে পারেনি। এতে তারা হতাশ। অন্যদিকে, যেসব দেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, তাদের মধ্যেও অবসাদ (ফ্যাটিং) এসেছে। অন্যটি হলো এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অনেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা করছে। এদের মধ্যে বাংলাদেশও একটি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেবপ্রিয় বলেন, মাথাপিছু আয়ের হিসেবে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পৌছে গেছে। এর পরের স্তর হচ্ছে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। এই স্তরে পৌঁছাতে হলে মাথাপিছু আয়কে ৪ হাজার ডলারে নিয়ে যেতে হবে। অথচ বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশের কথা বলছে, তার আন্তর্জাতিক কোনো মানদন্ড নেই। এটা বাংলাদেশেরই তৈরি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে পুষ্টি, শিক্ষা, সাক্ষরতা বৃদ্ধি, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসে উন্নতি করতে হবে। প্রবৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে মানব সম্পদ উন্নয়নে জোর দিতে হবে। মানবসম্পদ উন্নত হলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে আর উৎপাদনশীলতা বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়বে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশের ভারসাম্যতা দেখতে হবে। কৃষি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ