ঢাকা, সোমবার 19 December 2016 ৫ পৌষ ১৪২৩, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক প্রেরণে কমছে রেমিটেন্স প্রবাহ

ইবরাহীম খলিল : এবছর বিদেশে জনশক্তি রফতানি বাড়লেও তুলনামূলকভাবে আয় বাড়ছে না বরং কমছে। কারণ অধিকাংশ অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে যেয়ে থ্রি ডি অর্থাৎ ডার্টি, ডেঞ্জারাস, ডিফিকাল্ট বা পরিষ্কার পরিছন্নতা, বিপদজনক ও কঠিন ধরনের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। লাখ লাখ টাকা খরচ করেও তাদের বিদেশে গিয়ে এধরনের কাজ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেলের দর কমে যাওয়ায় এধরনের কাজের পারিশ্রামিকও কমেছে। ফলে এ বছর রেকর্ডসংখ্যক সাড়ে সাত লাখ শ্রমিক রফতানি করেও বাংলাদেশকে অনেক কম বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে সন্তষ্ট থাকতে হচ্ছে। আর এদের ভাষাজ্ঞান কম থাকে বলে কোনো ধরনের পাকাপোক্ত চুক্তি না থাকলেও বাধ্য হয়ে কোনো প্রকার কাজ পেলেই তারা সন্তষ্ট থাকেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। ২০১৫ সালে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ৫২৭ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইতে ১০০ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স আসে যা গত প্রায় ৩ বছরের মধ্যে ছিল সর্বনিম্ন। এরপর আগস্ট মাসে ১১৮ কোটি ৩৬ লাখ, সেপ্টেম্বরে ১০৫ কোটি ৬৬ লাখ এবং অক্টোবরে ১০১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স দেশে আসে। আর নবেম্বরে এসেছে মাত্র ৯৫ কোটি ১৪ লাখ ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে ৫২১ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। অথচ আগের অর্থবছরে একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৬১৮ কোটি ডলার। সে হিসেবে অর্থবছরের ৫ মাসেই প্রবাসী আয় কমেছে ৯৭ কোটি ডলার বা ১৬ শতাংশ। গত অর্থবছরেও আগের অর্থবছরের তুলনায় অনেক কম রেমিট্যান্স এসেছিল। সেই কম পরিমাণের রেমিট্যান্সের চেয়েও আরও কম রেমিট্যান্স এসেছে এ অর্থবছরে।

বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার গত বছরের তুলনায় বাড়লেও প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহ কমার পেছনে বেশ কিছু কারণ দেখছেন বিশ্লেকরা। এর মধ্যে অদক্ষ শ্রমিক বেশী পাঠানো, নির্যাতিত হয়ে বা নানা কারণে কর্মীর দেশে ফিরে আসা বা বেতন না পাওয়া অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কর্মী পাঠানোর হিসেব থাকলেও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিদেশ থেকে কী পরিমাণ কর্মী ফেরত আসছে এ তথ্য নেই। অথচ নির্যাতিত হয়ে বা প্রতারিত হয়ে প্রতিনিয়ত কর্মীরা দেশে ফিরে আসছেন। রেমিটেন্স প্রবাহ কমার এটাও একটা বড় কারণ।

এ বিষয়ে আলাপকালে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ এ প্রতিবেদককে জানান, কয়েকটি কারণে রেমিটেন্স কমেছে। এর প্রধান কারণ অদক্ষতা। এছাড়া বিদেশে এখন জীবন যাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর কারণ হলো- আগে বিদেশে পরিবার নিয়ে থাকার সুযোগ ছিল না। এখন তা পারছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে এই সুযোগটা ছিল না। এখন সুযোগ দেয়ায় অনেকেই পরিবার নিয়ে সেদেশে থাকছে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে এই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম কমেছে। একারণে সেদেশের লোকজন শ্রমিকের বেতন কমিয়ে দিয়েছে। আর রেমিটেন্স কমে যাওয়ার জন্য হুন্ডিকেও দায়ী করেন জাবেদ আহমেদ। 

গতকাল অভিবাসী দিবসের আলোচনায় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৫ বছরে আরো বিশ লাখ অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে যাবে। কিন্তু তাদের দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা শুধু কাগজ কলম ও জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। দক্ষ শ্রমিক গড়ে তোলার জন্যে কি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা নানা ধরনের প্রশিক্ষণের কথা বলেন, কিন্তু তা কার্যত কতটা শ্রমিককে দক্ষ করে তুলছে এবং এধরনের জনশক্তি রফতানির পরিমাণ ও আয় কি পরিমাণ বাড়ছে তার কোনো হিসেব নেই।

জনশক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, বিদেশ যেতে অভিবাসীদের যে বেশি খরচ যোগাতে হয় তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিদেশগামীদের দক্ষতা বাড়াতে ২০১১ সালে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি করার পর তার বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ নেই। ফলে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে শ্রমিকদের পাড়ি জমানোর পরিমাণ ক্রমাগত বাড়লেও এসব শ্রমিকের অর্ধেকই অদক্ষ থেকে যাচ্ছে।

এদিকে নতুন শ্রমবাজার খুঁজে না পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই অভিবাসীদের গমন প্রক্রিয়া ঘুরপাক খাচ্ছে। এর উপর তেলের দাম কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক মন্দায় পড়েছে আরব দেশগুলো। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে অদক্ষ শ্রমিকদের। এজন্যেই গত আট বছরের মধ্যে ২০১৬ সালে প্রবাসী আয় কমেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে জেলা ছাড়াও উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তার ধারাবাহিকতায় ৪০টি কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হবে শীঘ্রই। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশই অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে যাওয়ার পর কাজ করেও যে আধা দক্ষ থেকে দক্ষ হয়ে উঠছেন এবং দেশে ফেরার পর তার দক্ষতা কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ না থাকায় তাদের অভিজ্ঞতা কোনো কাজে আসছে না। 

বিএমইটি’র হিসেবে বিদেশগামীদের মধ্যে মাত্র আড়াই শতাংশ আছেন যারা পেশাদার। ২০১৫ সালে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জনের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৮২৮ জন পেশাদার ছিলেন। মোটামুটি দক্ষ ছিলেন ২ লাখ ১৪ হাজার ৩২৮ জন। আর ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯২৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৪৩ শতাংশই অদক্ষ। এখন যারা সৌদি আরবে যাচ্ছেন, তাদের ৭০ শতাংশই নারী। তারা সবাই যাচ্ছেন গৃহকর্মী হিসেবে। সামাজিক নিরাপত্তা পেলে ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ থাকলে এধরনের জনশক্তি আরো বৃদ্ধি পেত। কিন্তু বিদেশে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, বেতন, সুরক্ষাসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে, তা দূর করতে হলে যে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বিদেশে বাংলাদেশী মিশনগুলোকে তৎপর করা প্রয়োজন তা উপলব্ধিতেও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ