ঢাকা, সোমবার 19 December 2016 ৫ পৌষ ১৪২৩, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আলেপ্পোর কান্না

ন্যায়ের পক্ষে থেকে অন্যায়ের প্রতিরোধ মানুষের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। এমন দায়িত্ব পালিত হলে মানুষের জীবন অর্থবহ হয়, সমাজ মানুষের বসবাসযোগ্য থাকে। তবে বর্তমান সভ্যতায় কাক্সিক্ষত ওই বিষয়ের অনুপস্থিতিতে মানুষের মধ্যে হতাশার মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন চিত্রের স্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ্য করা গেছে সিরিয়ান এক তরুণীর চিঠিতে।
সিরিয়ার আলেপ্পো নগরীর এক তরুণী মুসলিম বিশ্বের নেতাদের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চিঠিটি প্রকাশ করেছে। ওই চিঠির একটি অংশে বলা হয়েছে-
“বিশ্বের সকল ধর্মীয় নেতা এবং মুসলিম উম্মাহর প্রতি, যাদেরকে দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হয় তাদের জন্য, আমি আলেপ্পোর সেইসব মেয়েদের একজন বলছি- যারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। আমাদের আশপাশে কোন পুরুষ মানুষ বা কোন অস্ত্র নেই যা আমাদের এবং সিরীয় সেনাবাহিনী নামক জানোয়ারদের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমি আত্মহত্যা করছি এই কারণে যে, আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে দুঃখে আমার বাবা মারা গেছেন। আমি আত্মহত্যা করছি যাতে আমার দেহ তাদের জন্য কোন ধরনের আনন্দের কারণ হতে না পারে, যারা কয়েক দিন আগেও আলেপ্পোর নাম মুখে নেয়ার সাহস করতে পারেনি। আমি আলেপ্পোতে আত্মহত্যা করছি কারণ শেষ বিচারের দিন এসে গেছে। আমরা যেখানে বাস করছি তার চেয়ে জাহান্নাম আরও ভয়াবহ আমি তা মনে করি না।”
মুসলিম বিশ্বের নেতাদের উদ্দেশে সিরিয়ার এই তরুণীর চিঠিটি প্রকাশ করেছে ডেইলি মেইল। তরুণীটি আলেপ্পোতে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আলেপ্পোকে সে তুলনা করেছে জাহান্নামের সাথে। কিন্তু সমৃদ্ধ এই শহরটিকে জাহান্নামে পরিণত করলো কারা? স্বৈরাচারী শাসক আসাদ তো গণবিক্ষোভের মুখে পতনের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। কিন্তু তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলো রাশিয়ার পুতিন সরকার। যোগ দিলো ইরানও। রাশিয়ার উপর্যুপরি বিমান হামলা এবং ইরানের শিয়া মিলিশিয়াদের নৃশংস তা-ব মুক্তিকামী আলেপ্পোবাসীর জীবনে নিয়ে এলো বিপর্যয়। সিরিয়ার গণধিকৃত আসাদের সামরিক বাহিনী এবং রাশিয়া ও ইরানের সামরিক আগ্রাসন আলেপ্পোয় উদযাপন করলো গণহত্যার উৎসব। মুক্তিকামী আলেপ্পোবাসীর ওপর আগ্রাসন এই ডিসেম্বরে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছে আরো বেশি আগেই। কিন্তু তখন থেকে এ পর্যন্ত জাতিসংঘসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বড় শক্তিগুলো কার্যকর কোন মানবিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেনি। মাঝে মাঝে তারা আলেপ্পোবাসীর ওপর জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপারে কিছু কথা বলেছে, মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে- এ সবই প্রাণহীন কাগুজে আহ্বান। পাশ্চাত্যের বিদগ্ধজনরাও শঠতাপূর্ণ ওইসব আহ্বানের সমালোচনা করেছেন। কারণ ওদের ভাবখানা এমন ছিল যে, তোমরা তোমাদের কাজ চালিয়ে যাও, আমরা তো কিছু কথা বলবোই। নীরব অনুমোদন ছাড়া তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বিশ্ব সভ্যতার চোখের সামনে আলেপ্পোকে জাহান্নামে পরিণত করা যায় কি? এমন প্রশ্নের কোন জবাব নেই ইউরোপ, আমেরিকা ও জাতিসংঘসহ বর্তমান নেকী সভ্যতার কাছে। আলেপ্পোর জনগণের প্রতি যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে তার দায় এড়াতে পারে না বর্তমান সভ্যতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিছুটা হলেও সেই দায় স্বীকার করে নিয়েছেন। গত ১৬ ডিসেম্বর চলতি বছরের শেষ সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেছেন, আলেপ্পোতে যে নৃশংসতা চলছে তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমারও নৈতিক দায় রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে  ওবামা আরো বলেন, আলেপ্পোতে সিরিয়া সরকার, রাশিয়া ও ইরানের অনুগতরা যে নৃশংস অভিযান চালিয়েছে তাতে বিশ্ব আমাদের সঙ্গে এক হয়ে বিরোধিতা করছে। পুরো এলাকা ধূলোবালিতে পরিণত হয়েছে। বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার খবর প্রতিনিয়ত আসছে। এগুলো আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। ওবামা দৃঢ়তার সাথে বলেন, এ নৃশংসতার দায় একমাত্র আসাদ সরকারের এবং তার মিত্র রাশিয়া আর ইরানের। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণ করার কোন কারণ নেই। তবে তিনি পুরো সত্য উচ্চারণ করেননি। সত্যের অপর পিঠে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো সভ্যতার সঙ্গত দায়িত্ব পালনে অনীহা। তাই আলেপ্পোকে যারা জাহান্নামে পরিণত করলো তাদের সাথে ইতিহাসের কাঠগড়ায় এদেরও দাঁড়াতে হবে। ইতিহাস হয়তো কাউকে গুরুদণ্ড দেবে এবং কাউকে দেবে লঘুদণ্ড।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ