ঢাকা, সোমবার 19 December 2016 ৫ পৌষ ১৪২৩, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নারায়ণগঞ্জবাসীকে অতীতের ঘটনাগুলো মনে রাখতে হবে

জিবলু রহমান : নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, ফেনীর জয়নাল হাজারী ও লক্ষ্মীপুরের আবু তাহের, নারায়ণগঞ্জের সাবেক সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও ফেনীর এমপি নিজামউদ্দিন হাজারীর নামকে ঘিরে সবসময় আলোচনার ঝড় বয়। তাদের পরস্পরবিরোধী দোষারোপ আর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে অনেক খুনোখুনির প্রকৃত রহস্য আড়াল হয়ে যাচ্ছে, চাপা পড়ছে ঘটনার নেপথ্য কাহিনী। ফলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে বারবার। কোনো ঘটনা ঘটলেই এসব নেতার পরস্পরবিরোধী অভিযোগ উত্থাপনের ঘটনায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতি মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায়ই বিব্রত হচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতারাও। এসব নিয়ে উচ্চ পর্যায়েও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। আর রাজনীতির মাঠের ফসল চলে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের ঘরে।
আতংকের জনপদ নারায়ণগঞ্জে এখন প্রতিদিনই অপহরণের ঘটনা, শুধু গুম আর লাশের খবর। নদী-নালা, খাল-বিল, ডোবা-নালায়, হাটে-বাজারে শুধু লাশ আর লাশ। প্রায়ই উদ্ধার হচ্ছে বস্তাবন্দী লাশ, গলাকাটা লাশ, মাথা বিচ্ছিন্ন লাশ। নারায়ণগঞ্জ যেন আজ এক বধ্যভূমি। খুন করে লাশ গুমের জন্য অনেক আগে থেকে নারায়ণগঞ্জকে ব্যবহার করা হচ্ছিল। মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী খুন থেকে শুরু করে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে ১২ শিশু। অপহরণের ঘটনা বেড়েই চলেছে।
নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুরের ঘটনাগুলো চারদিক থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, ডেকে এনেছে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি। নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুরের ঘটনাগুলোতে রীতিমতো কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের নেতা-কর্মীরাও পড়েছেন চরম অস্বস্তিতে। এত দ্রুত একের পর এক বিতর্কের মধ্যে পড়ে যাবে তা কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও টের পাননি। শুধু নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, লক্ষ্মীপুরের রক্তাক্ত ঘটনাবলিই নয়, সরকারের ভেতরে-বাইরেও চলছে নানা রকম জটিলতা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ববান কেউ কেউ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, দল ও সরকারের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে চলছেন।
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের প্রায় পণে ২ বছর হয়ে গেলেও এর বিচার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। নারায়ণগঞ্জের হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। অথচ ২৭ এপ্রিল ২০১৪ আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাত খুনের পর দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই সহায়তা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ২৭ এপ্রিল ২০১৫)
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত গুম-খুনের ঘটনাটির সঙ্গে র‌্যাব সদস্যদের সম্পৃক্ততার কথা প্রথম থেকেই জানতো পুলিশ। অপহরণের আগে আদালত চত্বরে র‌্যাব সদস্যকে আটক করার পর সেখানে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা ধরে নিয়ে ছিলেন র‌্যাব কোন অপারেশন চালাতে সেখানে অবস্থান নিয়েছে। এ জন্য পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আটক র‌্যাব সদস্যকে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্য অপহরণ ঘটনার পরপরই জেলা পুলিশ জানতে পারে প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাদের পাঁচ সহযোগীকে র‌্যাব হেফাজতে নিয়ে গেছে। এ জন্য প্রথম দু’দিন পুলিশ নজরুলসহ অন্যদের উদ্ধারে তেমন কোন তৎপরতা দেখায়নি। তবে ঘটনার দু’দিন পেরিয়ে গেলেও র‌্যাব যখন বিষয়টি অস্বীকার করতে থাকে তখন টনক নড়ে পুলিশের। তখনই তারা বুঝতে পারে এই সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করা আর সম্ভব নয়। এ জন্য নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি উপজেলায় টহল পুলিশদের সতর্ক করে দেয়া হয়। অপরদিকে অপহরণের ঘণ্টা দুয়েক আগে আদালত চত্বরে নজরুলকে অনুসরণকারী সাদা পোশাকের র‌্যাবের এক সদস্যের বিষয়ে খোঁজ করতে থাকে পুলিশ। অস্ত্রসহ সাদা পোশাকে আটক হওয়া ওই র‌্যাব সদস্য সম্পর্কে জানতে পুলিশের দুই কনস্টেবল ওমর হাওলাদার ও রফিক ইসলামকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। দুই কনস্টেবল র‌্যাব সদস্যকে আটকের পুরো কাহিনী কর্মকর্তাদের কাছে খুলে বলেন।
নজরুল যে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তা তারা আগে থেকেই জানতেন। গোয়েন্দা তথ্য ছিল নজরুলকে গ্রেফতারের জন্য র‌্যাব মরিয়া হয়ে খুঁজছে। কিন্তু নজরুল আত্মগোপনে থাকায় তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে র‌্যাব সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারে ২৭ এপ্রিল ২০১৪ নজরুল আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে আসবেন। এর আগে তিনি উচ্চ আদালত থেকে নেয়া জামিনে ছিলেন। আদালতে নজরুলের উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের জেলা বিশেষ শাখা একটি বার্তা পান যে আদালত থেকে বেরোনোর পথে নজরুলকে র‌্যাব আটক করতে পারে। আদালত চত্বরে র‌্যাবের একাধিক সদস্যের উপস্থিতির কথাও জানানো হয়। পরে এক পর্যায়ে আদালত চত্বর থেকেই র‌্যাবের সাদা পোশাকের এক সদস্যকে অস্ত্রসহ আটক করে নজরুলের অনুসারীরা। তাকে কোর্ট পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলে জানা যায় সে র‌্যাব সদস্য। কিন্তু তার সঙ্গে কোন পরিচয়পত্র ছিল না। কোমরে শুধু সরকারি পিস্তলটি ছিল। পরে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাকা হয় র‌্যাবের আরেক সদস্যকে। তিনি আদালত প্রাঙ্গণের সামনে র‌্যাব লেখা জ্যাকেট পরা ছিলেন। তার নাম মোস্তফা কামাল। দাড়িওয়ালা এই র‌্যাব সদস্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্য। পরে তাকে ডেকে নিয়ে সাদা পোশাকের ওই র‌্যাব সদস্যের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর ছেড়ে দেয়া হয়।
ঘটনার পরপরই এই সাতজনকে যে র‌্যাব তুলে নিয়েছে এটা নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখে। এ কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে যে নূর হোসেনের প্রতি অভিযোগ করা হচ্ছিল তাতে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কারণ তারা তখন পর্যন্ত জানতেন র‌্যাব যেহেতু তুলে নিয়েছে সেহেতু নূর হোসেনকে গ্রেফতার করা উচিত হবে না। দু’একদিনের মধ্যে হয়তো র‌্যাব তাদের কোন মামলায় গ্রেফতার বা কোন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে হস্তান্তর করবে। এ জন্যই প্রথম দিকে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু যখন প্রথম দিন গাজীপুরে নজরুলের গাড়ি ও গুলশানের নিকেতনে চন্দন সরকারের গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তখন শঙ্কা নিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে নামে পুলিশ।
৭ অপহরণ সম্পর্কে তদন্ত কমিটির কাছে প্রত্যক্ষদর্শী বন্দর থানার জাঙ্গইল এলাকার আবদুল ক্বারী মজিদ মিয়ার ছেলে শহীদুল ইসলাম খোকন সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। চাঞ্চল্যকর এ সাত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আগে অপহরণ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। সিদ্ধিরগঞ্জের পাওয়ার স্টেশনের গেস্ট হাউসে তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত গণশুনানির দিনে তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিয়ে দুপুরে তিনি সাংবাদিকদের কাছে সেদিনের ঘটনার বিবরণ দেন।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় একজন ব্যবসায়ী ও তাঁর কলেজপড়ুয়া মেয়ে সাতজনকে অপহরণের ঘটনা হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি এবং পুলিশের তদন্ত কমিটির কাছে বর্ণনা করেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের চোখের সামনেই র‌্যাব কয়েকজনকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। তবে যাঁদের তুলে নেয়া হয়েছে, তাঁদের কাউকেই তাঁরা চেনেন না। তুলে নেয়ার সময় একজনের ঘাড়ে পিস্তল নিয়ে আঘাত করতে দেখেন। যাঁকে আঘাত করা হচ্ছিল, তাঁর মুখে দাড়ি ছিল। আর যিনি আঘাত করছিলেন, তিনি সাদা গেঞ্জি ও সাদা রঙের প্যান্ট পরা ছিলেন। ঘটনার সময় একটি হাইয়েস মাইক্রোবাস, দুটি র‌্যাবের পিকআপ ও দুটি প্রাইভেট কার ওই স্থানে ছিল বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তাঁরা।
সাক্ষ্য দেয়া ব্যক্তি নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা এলাকার বাসিন্দা। তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেয়ার পর তিনি পুলিশের কাছেও জবানবন্দী দিয়েছেন। তাঁর মেয়ে জবানবন্দী দিয়েছেন।
ঘটনার এতদিন পর সাক্ষ্য দেয়া প্রসঙ্গে ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি মনে করেছিলেন, র‌্যাব কোনো আসামী ধরছে। যাঁদের গাড়িতে তুলেছে, তাঁরা হয়তো মাদক বা অন্য কিছু নিয়ে ধরা পড়েছেন। ওই দিনের বিষয়টি তিনি ও তাঁর মেয়ে বাসায় গিয়ে সবাইকে বলেছেন। কিন্তু পরে টেলিভিশনে সাতজনকে ধরে নিয়ে হত্যার খবর এবং অপহরণের সম্ভাব্য যে জায়গার কথা বলা হয়েছে, তা দেখে তাঁদের ধারণা হয়েছে, তাঁদের দেখা ঘটনার সঙ্গে এটা মিলতে পারে। এর পর থেকে তাঁরা বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেছেন। প্রথম দিকে ভয়ের কারণে বলতে পারেননি। পরে গণশুনানির কথা শুনে সেখানে গিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর পুলিশও তা জানতে চেয়েছে। পরে তিনি ও তাঁর মেয়ে পুলিশের কাছে জবানবন্দী দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ওই ব্যক্তির দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী, বেলা সোয়া একটার পরে তিনি মেয়েকে নিয়ে কলেজ থেকে বের হন। মেয়ের পরীক্ষা ছিল একটা পর্যন্ত। ঘটনাস্থল নারায়ণগঞ্জ স্টেডিয়াম ও ময়লা ফেলার স্থান পার হওয়ার কিছু পরে র‌্যাবের কয়েকটি গাঁড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। দুজন র‌্যাবের পোশাক পরা ব্যক্তি অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেল থামিয়ে ওদের একজনকে আমি জিজ্ঞেস করি, ভাই, কোনো সমস্যা? একজন র‌্যাব সদস্য ধমক দিয়ে বলেন, “ওই মিয়া, ভাগেন আপনি, যান এখান থেকে।” র‌্যাবের এমন আচরণে ভয় পেয়ে আমার মেয়ে বলে, আব্বা চলো।’
প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘ওই জায়গাটা পার হওয়ার সময় দেখেছি, একটি সাদা হাইয়েস মাইক্রোবাসে কয়েকজনকে তোলা হচ্ছে। বাইরে তিনি দু’জন পোশাকধারী ও একজন সাদা পোশাকধারীকে দেখেছেন। পোশাকধারীদের হাতে থাকা অস্ত্রের তুলনায় সাদা পোশাকে থাকা ব্যক্তির অস্ত্রটি অনেক ছোট ছিল। অন্য র‌্যাব সদস্যরা দুটি র‌্যাব লেখা পিকআপে ছিলেন। এ ছাড়া দুটি প্রাইভেট কারও সেখানে ছিল।’ (সূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো ১৯ মে ২০১৪)
১ মে ২০১৪ গাজীপুরের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, হত্যা ও গুমের সঙ্গে বিএনপি জড়িত। নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর তা প্রমাণিত হয়নি। আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন একাই সাত খুনের ঘটনা ঘটিয়েছেন বলে আলামত পাওয়া গেছে। এটাই হলো আওয়ামী লীগের বিএনপি ও জামায়াতমুক্ত শাসনের নমুনা।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী যে দেশের ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বেড়াচ্ছে, সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতারা হরহামেশা জনগণকে সজাগ থাকতে বলছেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের সঙ্গে বিএনপির কারও নাম আসেনি। সব নামই আওয়ামী লীগের, যুবলীগের ও ছাত্রলীগের। তাহলে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আসল ষড়যন্ত্র কারা করছেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
কেবল নারায়ণগঞ্জ বা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশের যেখানেই হত্যা, গুম, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে, সেখানে অনিবার্যভাবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের নাম আসছে। তাঁরা নিজেরা মারামারি-হানাহানিতে লিপ্ত। নিজের ক্ষমতায় না কুলালে টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে আনছে। এভাবে চলতে থাকলে বিএনপি বা অন্য কোনো বিরোধী দলের প্রয়োজন হবে না, আওয়ামী লীগ নিজের ভারেই ভেঙে পড়বে।
আগে যেকোনো ঘটনায় আওয়ামী লীগের নেতাদের অতি মাত্রায় সরব দেখা যেত। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় আওয়ামী লীগের বাকপটু নেতা-মন্ত্রীরাও নিশ্চুপ। এত বড় হত্যাকা-ের পরও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটি মানববন্ধন বা শোকসভাও করা হয়নি। না নারায়ণগঞ্জে, না ঢাকায়। তাদের এ নীরবতা কিসের ইঙ্গিত দেয়?
১ মে ২০১৪ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ-বিষয়ক এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুলসহ সাতজনকে অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত নূর হোসেনের সঙ্গে যদি কোনো গডফাদার থাকে, তাদেরও ধরা হবে। অপরাধীদের গ্রেফতার করতে যা করতে হবে তাই করা হবে।’
নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে, এ অবস্থায় র‌্যাবের প্রত্যেককে প্রত্যাহার করা হবে কিনা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটি তদন্তের ব্যাপার। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে প্রধানমন্ত্রী কাউকে ছাড় দেবেন না।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, র‌্যাবের কমান্ডিং কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রয়োজনে আরও যাদের দরকার, তাদেরও প্রত্যাহার করা হবে।’
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েনি। সে ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়লে রাস্তায় কোনো মানুষ বের হতে পারত না। অপহরণের পর সাইফুল ইসলামকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় ও তৎপর। তারা বসে নেই, কাজ করছে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নূর হোসেনসহ সন্দেহভাজন সব অপরাধীকে ধরতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচেষ্ট রয়েছে। এর জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নূর হোসেনের বাড়িতে অভিযান দেরিতে করার অভিযোগ ঠিক নয় উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নূর হোসেন গোয়েন্দাদের নজরদারিতে ছিলেন।
নারায়ণগঞ্জ যুবলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ক্যাঙারু পারভেজ ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল নিহত ত্বকীর বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রাফিউর রাব্বীর ওপর প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে গুলি চালাতে এলে গ্রেফতার হয়। পরে তাকে কেন্দ্রীয় যুবলীগ সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে।
১২ এপ্রিল সিলেটের ওসমানীনগরে নিজ কক্ষে ব্রাহ্মণশাসন উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জবেদ আলী খুন হন। উপজেলা পরিষদ নির্বাচন চলাকালে ২৩ মার্চ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় বালুয়াকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুদ্দিন প্রধান খুন হন।  [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ