ঢাকা, সোমবার 19 December 2016 ৫ পৌষ ১৪২৩, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী : আমাদের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশের পুরুষ-শাসিত সমাজে নারীরা কোন না কোন ক্ষেত্রে নির্যাতিতা বা নিগৃহিতা হচ্ছে, এটা অস্বীকার করার কথা নয়। নারী ও পুরুষ উভয়েই স্রষ্টার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ প্রাণী বা ‘আশরাফুল সাকলুকাত’। সেই শ্রেষ্ঠ প্রাণী আজ আধুনিক সভ্যতার যুগেও চরমভাবে নির্যাতনের শিকার হবে তা ভাবতেও চিন্তাশক্তি আড়ষ্ট হয়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষে নারীরা আজ গৃহাভ্যন্তরেও নিরাপদ নয়। এক শ্রেণির পুরুষ মেয়েদের অসহায়ত্বের সুযোগে তাদেরকে ভোগের সামগ্রী বা পণ্য হিসেবে গণ্য করে ভোগের লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে মানব সভ্যতার উতিহাসে কলঙ্কের অধ্যায় সূচনা করেছে। ফলে নারী নির্যাতন বন্ধে বা প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে সরকার হতে আরম্ভ করে নারী সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন সকলেই কম বেশি এ ব্যাপারে সোচ্চার। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নারী নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে ক্ষত-বিক্ষত করছে। নারী সমাজ তাদের অধিকার সংরক্ষণ করার জন্য পথে নেমেছে। বর্তমান সদাশয় সরকার নারী নির্যাতন বন্ধের ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে কঠোর আইনও প্রণয়ন করেছে, সেই সমস্ত আইন কম বেশি দ্রুত প্রয়োগও হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থাও হচ্ছে। তথাপি কি নারী নির্যাতন বন্ধ হচ্ছে? না, কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। বরঞ্চ যৌতুকের অভিশাপে বলি দিতে হচ্ছে অসংখ্যা অসহায় নারীকে। তার কারণ কি? প্রতিকারই বা কি? তা প্রত্যেক সচেতন ব্যক্তিকে গভীরভাবে ও সুক্ষ্মভাবে চিন্তা করতে হবে। নারী মাতা, নারী ভগ্নি, নারী কন্যা, জায়া- এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাই কবির ভাষায় বলতে হয় ‘এ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্দেক তার নর। কোন কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারী, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে বিজয়ীলক্ষ্মী নারী। এই নারী আমাদের সমাজের অর্ধেক, তাদেরকে পশ্চাতে রেখে, হেয় প্রতিপন্ন করে সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। আমরা ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই আরব দেশে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে যখন নারীদের জীবন্তাবস্থায় কবর দেয়া হতো, নারীদের অভিশাপ মনে করা হতো, মনুষ্যত্ব পশুশক্তির বেদীমূলে আবদ্ধ ছিল, সেই ঘোর অমানিষার অন্ধকার হতে মানব সমাজকে রক্ষার জন্য পরিত্রাণ কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের, সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি (সঃ) মানব সমাজকে কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ঘোষণা করেছিলেন- ‘প্রত্যেক নর-নারী উভয়েই আল্লাহর সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব, অর্থাৎ আশরাফুল মাকলুকাত; নারীদের ওপর যেমন পুরুষের অধিকার রয়েছে, তেমনি পুরুষের ওপরও নারীদের সমঅধিকার রয়েছে।” নারী নির্যাতন প্রতিরোধে করণীয় :
১। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণীকেই আল্লাহ জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন, তৎমধ্যে একজনকে স্ত্রী জাতীয় অন্যজনকে পুরুষ জাতীয় করে; এবং স্বামী ও স্ত্রী সম্পর্কে ইরশাদ করা হয়েছে- স্ত্রীরা তোমাদের পোষাক-পরিচ্ছেদ এবং তোমরাও তাদের পোষাক স্বরূপ”। কাজেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সৃষ্টি জগৎকে বিস্তৃত করার জন্য মানুষের মধ্যেও নারী পুরুষকে স্বতন্ত্র গঠনে সৃষ্টি করেছেন এবং উভয়ের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন। তাই নবী করীম (সঃ) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম; আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীর নিকট উত্তম”। নারীদের নির্যাতিত হওয়ার কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম হল অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার অভাব এবং আত্মসচেতনতার অভাব। তাই নারীদেরকে অধিক হারে শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। শুধু আইন করেই নারী নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না। তাই সরকার একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে যা প্রশংসার দাবিদার।
২। পাশ্চাত্য শিক্ষা-সংস্কৃতি আমাদেরকে যেমন উন্নত  ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছে, অপরদিকে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধকে সংকুচিত করেছে। যেমনÑ মদ, জুয়া, যৌনাচার, ব্যাভিচার, অশালিন পোষাক ইত্যাদির প্রতি মানুষের আকর্ষণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার একমাত্র কারণ সঠিক ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। ক্ষেত্র বিশেষে কোন কোন নারীর অশালীন পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান ও বেপরোয়া চলা-ফেরাও দায়ী বটে। সাধারণ যুবক ছেলেরা নারীদের প্রতি তার রূপ লাবণ্য ও সৌন্দর্য চর্চায় ও অবাধ মেলামেশায় পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাই ধর্মীয় ও নৈতিক বিধি-বিধানসমূহ মেনে চললে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন হ্রাস পাবে কারণ পবিত্র ঐশি গ্রন্থ কুরআনে ইরশাদ করা হয়েছে- “তোমরা যিনার ধারে-কাছেও যেও না, কেননা এটি একটি অত্যন্ত অশ্লীল ও মন্দ পথ।” নারী ও পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত যৌন মিলনকেই যৌনাচার বা যিনা বলা হয়। অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেন- “হে রাসূল! আপনি মুমিনদেরকে বলুন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জা স্থান হেফাযত করে, এটিই তাদের জন্য পবিত্রতর।”
৩। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বর্তমান বিশ্বের আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করতে হবে।
৪। নারী নির্যাতন শুধু আইনের দৃষ্টিতেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ তা নয়, ধর্মীয় দৃষ্টিতেও ইহা মহা পাপ এই ধারনা সৃষ্টি করতে হবে সকলের মনে।
৫। নারী নির্যাতন অর্ডিন্যান্স এর মামলাগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি ও সফল তদন্তের জন্য প্রত্যেক থানায় একজন বিশেষ অফিসারকে নিয়োগ করে ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, কেননা ২/৩ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত থানায় একজন ও.সি’র পক্ষে থানার যাবতীয় কাজ-কর্ম সুষ্ঠুভাবে দেখাশুনা করার পর বাড়তি কাজের ঝামেলায় সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না।
৬। নারী নির্যাতনের মামলাসমূহের বিচারের ফলাফল বিশেষ করে সাজার ফলাফল পত্র-পত্রিকা ছাড়াও সরকারি প্রচার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে অপরাধীদের মনে ভয়-ভীতির সঞ্চার হয় ও সংশোধনের সুযোগ পায়।
৭। নারী নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে নারী সমাজকে যত্নবান ও সংযত হয়ে চলাফেরা করতে হবে। মা-বোনদের উগ্র ব্যবহার, উগ্র প্রসাধনী ব্যবহার ও বেপরোয়া চলাফেরার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে।
৮। নারী নির্যাতনকারীদের সংশ্লিষ্ট মামলায় সাজা প্রাপ্তির পর তাদের নাম-ঠিকানা থানায় তালিকাভুক্ত করলেও কিছুটা সুফল পাওয়া যেতে পারে।
৯। রুজুকৃত মামলায় আইনের মারপ্যাঁচে যাতে অপরাধীরা জামিন কিংবা অব্যাহতি না পায় তজ্জন্য প্রসিকিউশনকে অধিক সর্তক থাকতে হবে ও তথ্য উদাও সুচারুভাবে ত্রুটিহীনভাবে পরিচালনা করতে হবে।
১০। মহিলাদের জন্য কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ সুগম করতে হবে এবং সে সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে উপসংহারে বলতে হয় নারীও মানুষ, তাদেরকে মানুষ হিসেবে দেখলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। পুরুষ নিজেকে শক্তিশালী ও নারীকে দুর্বল ভাবলে চলবে না। কেননা উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজকের এই আধুনিক সভ্যতা। কাজেই আসুন নারী সমাজকে তার অধিকার সচেতন করে ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে উন্নয়ণমূলক কাজে সম্পৃক্ত করে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলি, সকল কুসংস্কার ও হীনমন্যতা পরিহার করে নারী বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করি। নারী পুরুষের সমন্বিত প্রচেষ্টায় কল্যাণকর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ব্রতী হই।
লেখক : কবি ও সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও মুক্তিযোদ্ধা, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (অব.), মোবাইল : ০১৮১৪-১১৪৭৬৭

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ