ঢাকা, সোমবার 19 December 2016 ৫ পৌষ ১৪২৩, ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গারা এখন কোথায় যাবে!

মুহাম্মাদ আলী আকবর : গত ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের সামরিক চৌকিতে বিচ্ছিন্নবাদিদের হামলাকে কেন্দ্র করেই মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সে দেশের আরাকান ও মংডু প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের উপর অবর্ণনীয় দমন নিপীড়ন চালাচ্ছে। তারা চাইছে রোহিঙ্গাদেরকে সমূলে উৎপাটন করতে, মুসলমানদের শিকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলতে- যাতে তারা সে দেশে আর থাকতে না পারে। এমন নির্যাতন চালানো হচ্ছে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে। জবাই করে হত্যা করছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। যারা বেঁচে আছে তারা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেকে অনাহারে অর্ধাহারে মারা যাচ্ছে। মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে কোলের শিশু পর্যন্ত মারা যাচ্ছে। পালিয়ে আসা কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অনেকের সাথে সাংবাদিকদের কথা হয়েছে। তাদের কথা মরলেও এদেশে মরবো। তার মানে সে দেশের সামরিক জান্তারা তাদেরকে শান্তিতে মরতেও দিচ্ছে না। একটা কথা আছে জঙ্গলে বাঘের ভয় পানিতে কুমিরের ভয়। তাই মানুষ জঙ্গলে আর পানিতে বসবাস করতে নিরাপদ বোধ করে না। বাঘ আর কুমিরের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে বর্তমান মিয়ানমারের সামরিক জান্তারা। তাদের নির্যাতনের ভয়ে তারা এখন বনে-জঙ্গলে আর সাগরে আশ্রয় নিচ্ছে। এ অবস্থায় অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা আমাদের দেশে আসতে চাইছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ মিয়ানমান সীমান্তে বিজিবির সতর্ক প্রহরা বসিয়েছে। পুশব্যাক করছে অনেককে। এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করেছে বিজিবি। যারা নৌকায় করে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে এদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে তাদেরকে এদেশে ঢুকতে দিচ্ছে না কোস্টগার্ড আর বিজিবি। তারা না পারছে সে দেশে ফিরে যেতে না পারছে এদেশে আসতে। শুধুমাত্র প্রাণে বাঁচার জন্যই তারা এ দেশে পালিয়ে আসছে। তারা এখন নদীতেই ভাসছে। নদীর পানির মতই তাদের জীবনের গতিপথ। কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। এভাবে দশ পনেরদিন থাকতে থাকতে অনেকে নৌকায় মারা যাচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে এ পর্যন্ত দশ হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।  
জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা বললেও বাংলাদেশ সেদিকে কর্ণপাত করছে না। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ  খোলেনি তাদের সীমান্ত। কারণ জাতিসংঘ বর্তমানে অকার্যকর একটা সংগঠন। জাতিসংঘ আছে শুধু নামে। জাতিসংঘের মানবাধিকারের ধারাগুলো শুনতে যত ভালো লাগে মানতে ততই অপারগ হয় অনেক রাষ্ট্র। ক্ষমতাধর কোনো রাষ্ট্র তাদের এসব বিবৃতিতে কর্ণপাত করে না। আমার মনে আছে ইরাক যখন আক্রমণ করে তখন এ জাতিসংঘই আমেরিকাকে নিষেধ করেছিল তারা তাদের কথা শুনেনি। লিবিয়ার বেলায়ও তাই। মুসলমানদের সংগঠন ‘আরব লীগ’, ‘ওআইসি’ তো তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি নিয়েই ব্যস্ত। তারা নিজেদের ঘর সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে অপরের কথা ভাববার তাদের এত সময় কই। প্রথম শ্রেণীর মুসলমান হিসেবে আমরা সৌদি আরব আর আরব দেশগুলোকেই জানি। তারা আছে  বিবাহ-শাদী আর ভোগ-বিলাস নিয়ে। আর আমাদের মত তৃতীয় শ্রেণীর মুসলমানরা ব্যস্ত আছি পশ্চিমাদের জীবনাচার আর প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতি অনুসরণ নিয়ে। সঠিকভাবে চিন্তা করার সময়টুকু আমাদের নেই। দিনে ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি আর বাসায় ফিরে ইন্টারনেটে ফেসবুকিং, পর্ণগ্রাফী, নাটক, মুভি এসব দেখে আমাদের সময় কাটছে বেশ আমোদ ফূর্তিতে। এ অবস্থায় অন্যদেশের জাতি ভাইবোনদের কথা ভাবার সময় কই। গোল্লায় যাক তারা আমরাতো বেশ আরামেই আছি। তবে আমি গড়ে সবার কথা বলছি না। অনেক শিক্ষিত ভাইবোনকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে চিন্তা করতে দেখেছি। তারা চাইছে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে একটা সমাধান বের করতে।
প্রদেশ দুটি মূল ভূখন্ড থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। মিয়ানমারে বসবাস করেও তারা ভিন দেশের মতই সেদেশে বসবাস করে। তাদের অধিকাংশই শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, চাকরি সব ক্ষেত্রেই তারা যুযোগ সুবিধা বঞ্ছিত। এক কথায় তাদের দেশে সভ্যতার আলো পৌঁছেনি। তাইতো তারা বেশি অপরাধ প্রবণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার পেছনে রোহিঙ্গারাই অকেকাংশেই দায়ী। একথার সাথে আমার দ্বিমত নেই। কথা হলো শিক্ষায় আলো বঞ্ছিত অবস্থায় বেড়ে উঠে যারা, তারা আর কতটুকুইবা সভ্য হতে পারবে। তারাতো শুধু বাঁচার জন্যই এসব করছে। যার ফলে রোহিঙ্গাদের অনেকেই কক্সবাজার,্ উখিয়া, টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসা সহ নানাবিধ অপরাধমূলক কাজে জড়িত । তাদেরকে ব্যবহার করেই তৈরী হচ্ছে ‘ইয়াবা সম্রাট’। এখন কথা হলো রোহিঙ্গারা বেশি অপরাধ প্রবণ জাতি নাকি আমরা? একথার কি উত্তর হবে জানিনা। তবে আমার উত্তর হলো- মিয়ানারের রোহিঙ্গারাতো পড়ালেখা না জেনে অন্ধকারে বেড়ে উঠেছে। তাদের জীবন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়নি। আমরাতো শিক্ষিত মানুষ। স্কুল, কলেজ, মাদরাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার তো সুযোগ আমাদের হয়েছে, আমরা কতটুকুই বা সভ্য হতে পেরেছি। আমাদের দ্বারা কি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে না? রাজনকে পিটিয়ে হত্যা করা, খাদিজাকে কুপিয়ে জখম করা, সেভেন মার্ডার, বিশ্বজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা এসব তো আমাদের মতো সভ্য দেশের নাগরিকদের দ্বারাই হয়েছে। সবাই গণহারে শুধু সমালোচনা করে যাচ্ছে। কেউ সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করছে না। এসব তর্কের কোনো সমাধান হয় না। এখন সমাধানের পথে আসতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে রোহিঙ্গারাই হলো সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত মুসলিম সম্প্রদায়। মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা একটু বেশিই বলা যায়। যদিও কোনো দেশের কোনো ধর্মের জাতিগোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের আমি কখনোই সাপোর্ট করি না। আমি শুধু মুসলান হওয়াতেই একথাটুকু বলছি না। ন্যুনতম মানবাধিকারের প্রশ্নতো থেকেই যায়। মানবাধিকার হলো সার্বজনীন। এর ব্যাপক পরিধী রয়েছে: সব দেশের, সব কালের, সব বর্ণের, সব দেশের, সব ধর্মের মানুষের জন্যই মানবাধিকার। শুধুমাত্র মানুষ হওয়ার কারণেই একজন মানুষ কিছু অধিকার নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে থাকে। এখানেই অন্যান্য প্রাণী থেকে মানুষের মর্যাদা আলাদা। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস একটা গোষ্ঠীকে নিশ্চিন্ন করার অভিযানতো সমর্থন করা যায় না। বিশ্বের বিবেকবান নেতৃবৃন্দ আর দায়িত্বশীলদের কাঁধে এর দায়ভার পড়ে বলে আমার বিশ্বাস। এভাবেতো চলতে দেয়া যায় না। এ অন্যায়-অবিচারে বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো প্রয়োজন। অন্যায়কারী যে ধর্মেরই হোক না কেন তাকে প্রতিরোধ করতেই হবে। তা না হলে বিবেকের কাছে দায়ী থেকে যাব আমরা। মিয়ানমারের হাজার হাজার নির্যাতিত, নারী, শিশু চেয়ে আছে বিশ্বের ক্ষমতাধরদের রাষ্ট্রগুলোর দিকে। এ সমস্যার সমাধানের জন্য প্রথমত মিয়ানমারকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এ সমস্যাটি তাদের দেশের সমস্যা। সে কারণে সে দেশের সরকার প্রধান, সামরিক জান্তা-আরাকানের মুসলিম সম্প্রদায় মিলে বৈঠক করলে একটা সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে আমার বিশ্বাস। দ্বিতীয়ত জাতিসংঘকে প্রদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্যই হলো নির্যাতিত মানবতার জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। তৃতীয়ত ওআইসি। চতুর্থত আরবলীগ। পঞ্চমত মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে এ সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। যে কোনো মাধ্যমেই সামরিক জান্তা সরকারকে থামাতেই হবে। সেটা হতে পারে আলোচনার মাধ্যমে, কূটনৈতিক মাধ্যমে, ক্ষমতার মাধ্যমে। “২০১২ সালেও দেশটির রাখাইন বৌদ্ধরা মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালিয়ে প্রায় এক হাজার মুসলিমকে হত্যা করেছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর হতেই বার্মিজ সরকার রাখাইন (আরাকান) রাজ্য থেকে মুসলিম বিতাড়ন অভিযান শুরু করেছে। এতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকাসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বাস্তু জীবনযাপন করছেন।” (সূত্র: ২৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক ইনকিলাব)। মিয়ানমার জান্তাকে থামানো না গেলে শত শত রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হবেÑহাজার হাজার রোহিঙ্গাদের ভিটেবাড়ি ছাড়তে হবে একথা ঠিক। আর এতে পরাজয় হবে গোটা মানব সভ্যতার।
-লেখক : সংবাদকর্মী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ