ঢাকা, বুধবার 21 December 2016 ০৭ পৌষ ১৪২৩, ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ট্রাম্প কি যুদ্ধ বাধাবেন

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগেই সে দেশের রাজনীতি অর্থনীতি কূটনীতি সবকিছু নিয়ে একটা ঘোট পাকিয়ে ফেলেছেন। মার্কিন সমাজকে নানাভাবে বিভাজিত করে তিনি নির্বাচনে অবিশ্বাস্য বিজয় অর্জন করেছেন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি হিসেবে তিনি যেসব ঘোষণা দিয়েছেন, তার মধ্যে আছে তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে সকল অভিবাসীকে বিতাড়িত করবেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী নাগরিকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্প এমনই এক অভাবনীয় ব্যক্তিত্ব যে, তার সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার।

যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত এই জুয়াড়ি প্রেসিডেন্ট কী নিয়ে যে কী করতে চাইছেন সেটা বুঝে ওঠা দায় হয়ে পড়েছে। বিশ্বে আপাতত যেটুকু স্থিতিশীলতা রয়েছে, ট্রাম্পের পদক্ষেপে তার মারাত্মক ব্যত্যয় ঘটতে পারে। এমনকি তার ফলে পৃথিবীতে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হতে পারে। ট্রাম্প চীনকে বাগে আনতে প্রথমেই একটি আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বসেছেন। তিনি ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, ‘তাইওয়ান এক চীনের অংশ- এই মর্মে যুক্তরাষ্ট্র-চীন যে সমঝোতা রয়েছে ভবিষ্যতে তিনি তা নাও মানতে পারেন।’ তার এই বক্তব্যে চীন ক্রুদ্ধ হয়েছে এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাইওয়ান প্রণালীতে পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ যুদ্ধবিমানের মহড়া দিয়েছে। ট্রাম্প হয়তো ভুলেই বসে আছেন যে, চীন কোনো ব্যস্ত বাজারে ব্যাগ-হাতে ঘোরাফেরা করার মতো কোনো রাষ্ট্র নয়। আর ট্রাম্পের তাইওয়ান সম্পর্কে ঐ বেপরোয়া মন্তব্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

চীন-মার্কিন বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি যদি ট্রাম্পের জানা থেকে থাকে, তবে তিনি তাইওয়ান সম্পর্কে ওমন কথা বলতে পারতেন কিনা সন্দেহ। আর জানা থাকা সত্ত্বেও যদি তিনি ওমন কথা বলে থাকেন, তবে ধরে নিতে হবে যে, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে দিতে চাইছেন ট্রাম্প। যা যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে বাধ্য। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে তার টেলিফোনে কথা হয়েছে। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দেখাও হয়েছে। তবে আগামি ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি একজন সাধারণ মার্কিন নাগরিক ছাড়া আর কিছুই নন। এ সময় তাইওয়ানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট চাই ইং-ওয়েন ট্রাম্পকে ফোন করে জয়লাভের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আর সেই ফোনে সাড়া দিয়ে ট্রাম্প তার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথাও বলেছেন। পরে তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ফক্স টেলিভিশনকে। আর এই ঘটনা দাবানলের সূত্রপাত ঘটাতে যাচ্ছে।

১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং-এর কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর থেকে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈকিত সম্পর্ক ছিল না। এ ছাড়া জাতিসংঘে গণচীনের সদস্যপদও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের কারসাজিতে সে সময় তাইওয়ানকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দেয়া হয়েছিল। তখন ৮০ কোটি মানুষের দেশ মাও সেতুং-এর চীনের কোনো স্বীকৃতিই ছিল না। পুনর্গঠন কাজ সম্পন্ন করার পর বাণিজ্য ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রয়োজন দেখা দেয়। আর সে প্রয়োজনে প্রচ্ছন্নে সামনে আসে যুক্তরাষ্ট্র। তখন ছিল শীতল যুদ্ধের সময়। পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিভক্ত ছিল বিশ্ব। পুঁজিবাদীদের নেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সমাজতন্ত্রীদের ছিল দুই শিবির : সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। চীনের এই অগ্রযাত্রায় জাতিসংঘের স্বীকৃতি না থাকা কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। তাহলে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন একটা কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমঝোতায় পৌঁছবে? প্রকাশ্যে এ রকম একটা সমঝোতায় আসার আগে গোপনে পরস্পরের মনোভাব বোঝা ও কে কীভাবে সম্পর্কটা চায়, তা জানা জরুরি ছিল।

তখন চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গে আইউব খানের পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই পাকিস্তানের মাধ্যমে উভয় দেশ পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার ব্যাপারে সম্মত হয়। অতি সঙ্গোপনে এই আলোচনা ১৯৬৮ সাল থেকেই শুরু হয়। বেইজিং ও ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাস ছিল এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে এ আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। ১৯৭১ সালে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। চীনের সঙ্গে এ আলোচনা চূড়ান্ত করতে তিনি ১৯৭১ সালের ২১-২২ জুলাই চীন সফর করেন। সেখানেই তিনি মাও সেতুং-এর সঙ্গে দেখা করেন এবং চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে সকল বিষয় চূড়ান্ত করেন। তাতে চূড়ান্ত হয় যে, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করবেন। চীনের দিক থেকে প্রধান চাওয়া ছিল, ‘এক চীন’ নীতি, অর্থাৎ তাইওয়ান চীনের অংশ, যুক্তরাষ্ট্রকে এটা স্বীকার করে নিতে হবে। এই চুক্তি ‘সাংহাই কমুনিকে ১৯৭২’ নামে পরিচিত। নিক্সন এতে স্বাক্ষর করলেও একটি ফাঁক তাতে রেখে দেয়া হয়। আর তা হলো, কোনটা ‘এক চীনে’র সরকার- তাইপে সরকার, নাকি বেইজিং সরকার। ফলে চুক্তিটা স্থবিরই থেকে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র আপোস করতে রাজি হয়। আর এর ফলে আর এক কমুনিকে স্বাক্ষরিত হয়। যাকে বলা হয়, ‘উভয়ে উভয় রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার কমুনিকে ১৯৭৯’। এই চুক্তির বলে বেইজিং সরকারকে মেনে নিয়ে উভয়ে উভয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছিল। আর তখনই তাইওয়ানের রাজধানী তাইপে থেকে আমেরিকান দূতাবাস গুটিয়ে ফেলা হয়। কমিউনিস্ট চীনকে করা হয় জাতিসংঘের সদস্য। 

সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছিল- এখন থেকে তাইওয়ানের সাথে আমেরিকার সাংস্কৃতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকবে। তবে সেটা হবে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক। তাতে আরও বলা হয়েছিল, তাইওয়ানের সঙ্গে চীনের একত্রীকরণ করতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে, সামরিক বল প্রয়োগ করে নয়। আর যুক্তরাষ্ট্রের লাভ হয়েছিল, চীনের বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রেতার বাজারে প্রবেশ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় চীন এখন বাণিজ্যে পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনেতিক অবস্থা দিনকে দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখান থেকে উঠে দাঁড়ানো এক রকম অসম্ভব হয়ে দেখা দিয়েছে। সে রকম একটা পরিস্থিতিতে নীতি-নৈতিকতাহীন এক জুয়াড়ি ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, যার রাজনীতি বা কূটনীতিতে সামান্যতমও পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।

অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো অবস্থানে নেই। দুদেশের মধ্যে বাণিজ্যে পঞ্চান্ন হাজার আটশ’ কোটি ডলারের উপর। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি ট্রেজারি বন্ড রয়েছে চীনের কাছে। তাইওয়ানও চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাইওয়ানের রফতানি পাঁচ ভাগের দুই ভাগ যায় চীনে। সেটা ১৩০০০ হাজার কোটি ডলারের সমান। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রফতানি কমাতে চীনা পণ্যের উপর ৪৫ ভাগ শুল্ক আরোপ করার প্রস্তাব করেছেন। তার পরিণতি কি দাঁড়াবে সে সম্পর্কে ট্রাম্পের কি ধারণা আছে বলা যায় না। ‘এক চীন’ নীতি থেকে সরে যাওয়ার ভিত্তি হিসেবে ট্রাম্প বলেছেন, চীনের উচিত তার মুদ্রার পুনঃমূল্যায়ন করা, উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করা এবং দক্ষিণ চীন সাগরের উপর তার পুরোপুরি কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়া। এর কোনোটাই যে সম্ভব হবে না সেটা ট্রাম্পের জানার কথা। যুক্তরাষ্ট্র চীন সমঝোতা স্বাক্ষরের পর চীন এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তান দখল করে নেয় তখন চীন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। 

কিন্তু এ সমস্ত বিবেচনায়ই যুক্তরাষ্ট্র যদি তার ‘এক চীন’ নীতির পরিবর্তন করে, তবে চীন বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাইওয়ান দখল করে নেবে না বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেটি কিছুতেই রক্ষা করবে না। ফলে তাইওয়ানে একটা যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হবে। আর সে উত্তাপ শুধু তাইওয়ানে সীমাবদ্ধ থকবে এমন ধারণা করা যায় না। চীনকে শিক্ষা দেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্্র উত্তর কোরিয়ায়ও হানা দেবার চেষ্টা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পারমাণবিক রূপ নিলেও বিষ্ময়ের কিছু থাকবে না। ট্রাম্প যদি তার খামখেয়ালি নীতিতে অবিচল থাকেন তবে পৃথিবীতে আর একটি বড় ধরনের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ