ঢাকা, শনিবার 24 December 2016 ১০ পৌষ ১৪২৩, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে

গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সিএইচটি রিসার্স ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘সংবিধানের আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী -সংগ্রাম
  • বাঙ্গালিদের সরানোর কোনো সুযোগ সংবিধানে নেই -বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম 
  • কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে -সৈয়দ ইবরাহিম 
  • সন্তু লারমা দেশের আনুগত্য স্বীকার করেন না -ড. তারেক শামসুর রহমান

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙ্গালিদের ভূমিহারা করার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করতে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। সেখানকার বাঙ্গালিরা ভূমিহারা হলে দেশের ওই অঞ্চলটির সার্বভৌমত্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলেন, বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই। উপজাতীয় নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামে আলাদা দুটি ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে ওই এলাকা থেকে বাঙ্গালি উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে সেখানে বাঙ্গালিদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত “সংবিধানের আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় আইনজ্ঞ, আইন প্রণেতা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকরা এসব কথা বলেন। বেসরকারি সংস্থা সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেন। আলোচনায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক। আয়োজক সংস্থার চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশের সভাপতিত্বে ও কোঅর্ডিনেটর আফরিনা হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার আলকাছ আল মামুন, সম-অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কামাল, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সহসভাপতি শহিদুর রহমান তামান্না প্রমুখ।

বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী ভূমি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, সঠিকভাবে ভূমি কমিশন বাস্তবায়িত হলে পাহাড়িরা লাভবান হবে তবে এর জন্য বাঙালিদের বঞ্চিত করার প্রয়োজন নেই। তার মেয়াদকালে পাহাড়ি নেতাদের নানা অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করে ভূমি কমিশনের এই সাবেক বিচারপতি আরো বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে এক কেন্দ্রিক রাষ্ট্র। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশেষ অঞ্চল বলার কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই। পার্বত্য এলাকায় ‘আদিবাসী’ সংক্রান্ত কোন সমস্যাও নেই। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পুনর্বাসিত পাহাড়িদের ভূমি সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এর বাইরে এ কমিশন আর কোন কাজ করতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব বাঙ্গালি আছেন তারা সেখানে বাংলাদেশী হিসেবে বসবাস করছেন। তাদেরকে সেখান থেকে সরানোর কোন সুযোগ সংবিধানে নেই। আমাদের সকল সমাধান সংবিধানের ভেতরেই অনুসন্ধান করতে হবে।

ফিরোজা বেগম চিনু এমপি বলেন, সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন চান না। তিনি যা বলেন তা বিশ্বাস করেন না। আর যা বিশ্বাস করেন তা বলেন না। পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সন্তু লারমা উপজাতি হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্তু লারমা এখন ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দাবি করে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে উপজাতীয়দের একটি অংশ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রখেছে। সেখানে উপজাতীয়রাও তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। 

তিনি আরো বলেন, উপজাতীয়দের চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অবস্থান করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের গণমাধ্যমগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়ে একপেশে লোকদের সাথে কথা বলেন। আড়ালে আরও মানুষের যে কষ্ট আছে তা প্রকাশ করা হয় না। 

 মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ ইবরাহিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা বিরাজ করছে তা কোন দলের বা পক্ষের নয়। এটি একটি জাতীয় সমস্যা। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তির সময় উপজাতীয়দের একটি গোষ্ঠী খুব চালাকি করে পার্বত্য ভূমি কমিশন গঠনের দাবি তোলে। এ কমিশনের মাধ্যমে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙ্গালিদের ভূমির অধিকার হারা করতে চায়। যা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অংশ বলে তিনি মন্তব্য করেন। 

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, সংশোধিত পার্বত্য ভূমি কমিশন আইনের সংশোধনীতে কমিশনের চেয়ারম্যানের ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে। এ ছাড়া কমিশনের অধিকাংশ সদস্য উপজাতীয় হওয়ায় এ কমিশন চাইলেও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না। কোনো উপজাতীয় সদস্য আন্তরিক হয়ে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে তাকে হত্যা করে পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা লাশ ঝুলিয়ে রাখবে দৃষ্টান্ত হিসেবে। 

সৈয়দ ইবরাহিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও উপজাতীয়রা নিজেদের মতো করে সমাধান করতে চান। উপজাতীয় নেতারা পার্বত্য চট্টগ্রামে আলাদা দুটি ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে ওই এলাকা থেকে বাঙ্গালিদের সরে আসার ব্যবস্থা করছেন। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রের স্বার্থে সমতলের বাঙ্গালিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে গেছেন। তাই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের স্বার্থে সেখানে বাঙ্গালিদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। 

ড. তারেক শামসুর রহমান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল সমস্যা হচ্ছে- সন্তু লারমা চান না বাঙ্গালিরা সেখানে বসবাস করুক। সন্তু লারমার জাতীয় পরিচয়পত্র নেই উল্লেখ করে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, সন্তু লারমা দেশের আনুগত্য স্বীকার করেন না, স্বাধীনতার সময় তার কী ভূমিকা ছিলো তা জাতি জানে না। তিনি কীভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বাঙ্গালিদের সরিয়ে নেয়ার দাবি তোলেন? পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৩টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করলেও চাকমা সম্প্রদায় সেখানে একক আধিপত্য বিস্তার করে বাকি সম্প্রদায়গুলোকে বঞ্চিত করছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন বলেন, আজকে যদি কোনো জাতীয় দুর্যোগ হয় তাহলে বিপুল সংখ্যক লোককে কোথায় সরানো হবে? কাজেই দেশের এক-দশমাংশ ভূ-খ- কোনো গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া ঠিক হবে না। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানে আরো বেশি করে বাঙালি পাঠানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো কোনো অঞ্চল সমতলের থেকেও বেশি উন্নত। সেখানে উন্নয়নের নামে যা কিছু হয়েছে তার শতকরা আশিভাগ চাকমারা ভোগ করায় বাঙালি ও অন্যান্য উপজাতিরা বঞ্চিত হয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ার আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানে দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষকে,দল মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ করে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করার দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ