ঢাকা, রোববার 25 December 2016 ১১ পৌষ ১৪২৩, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অদক্ষতার কারণে ইউরিয়া উৎপাদনে ২৬ বছরে গ্যাসের অপচয় ৮১ হাজার কোটি ঘনফুট

এইচ এম আকতার : নানা অজুহাতে প্রতিনিয়ত গ্যাসের অপচয় বাড়ছেই। গ্রাসের অপচয় কোনভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানের প্রতি টন ইউরিয়া সার উৎপাদনে গ্যাসের প্রয়োজন ২৫ হাজার ঘনফুট। অথচ বাংলাদেশে একই পরিমাণ সার উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে গড়ে ৪৪ হাজার ঘনফুট। গত ২৬ বছরে শুধু সার কারখানায় গ্যাসের অপচয় হয়েছে ৮১ হাজার কোটি ঘনফুটের বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশে সার উৎপাদনে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে ৭৬ শতাংশ। গ্যাসের এ অপচয় বন্ধ করা গেলে তা দিয়ে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে সম্প্রতি মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করেছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। ‘বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা ২০১৬’ শীর্ষক খসড়াটি এরই মধ্যে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমাও দিয়েছে সংস্থাটি। ওই খসড়ায় সার উৎপাদনে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সার উৎপাদনে অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণ করে জাইকা দেখিয়েছে, গ্যাসের এ অপচয় বন্ধ করা গেলে তা দিয়ে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।
পুরনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও নিয়মিত তা মেরামত না করায় সার কারখানায় গ্যাসের এ অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতারও অভাব রয়েছে। সার কারখানায় গ্যাসের এ অপচয় নিয়ে উদ্বিগ্ন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও।
জাইকা ও সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অদক্ষতার কারণে গত ২৬ বছরে শুধু সার কারখানায় গ্যাসের অপচয় হয়েছে ৮১ হাজার কোটি ঘনফুটের বেশি। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০-৯১ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে সার কারখানায় গ্যাস ব্যবহার হয়েছে মোট ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৯ কোটি ঘনফুট। জাইকার হিসাবে, প্রতি টন সার উৎপাদনে ব্যবহূত ৪৪ হাজার ঘনফুট গ্যাসের মধ্যে অপচয় হয়েছে ১৯ হাজার ঘনফুট। এ হিসাবে গত ২৬ বছরে সার উৎপাদনে গ্যাস অপচয়ের পরিমাণ ৮১ হাজার ৫৫৯ কোটি ঘনফুট।
তবে এ অপচয় কমানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি দক্ষতা-বিষয়ক গবেষক ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসাইন। তিনি বলেন, জ্বালানি দক্ষতা (এনার্জি এফিসিয়েন্সি) না থাকার কারণে গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। অপচয় রোধে কারখানার কোনো যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে ফেলে না রেখে তাৎক্ষণিক তা মেরামত করা। পরিহার করতে হবে কারখানা স্থাপনে কম বিনিয়োগের অভ্যাসও। পাশাপাশি কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা দক্ষভাবে গ্যাস ব্যবহার করতে পারেন।
দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সার উৎপাদনে গ্যাসের অপচয় বন্ধের নজিরও আছে দেশে। বহুজাতিক সার কারখানা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো) প্রতি টন সার উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার করছে মাত্র ২৪ হাজার ঘনফুট, আন্তর্জাতিক মানের চেয়েও গ্যাসের ব্যবহার কম। যন্ত্রপাতির নিয়মিত মেরামত ও দক্ষ জনবলের কারণে কাফকোর পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে।
গ্যাসের অপচয় বেশি হওয়া সার কারখানাগুলোর মধ্যে অন্যতম চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। প্রতি টন সার উৎপাদনে সিইউএফএলে গ্যাসের প্রয়োজন হয় ৪০ হাজার ঘনফুটের বেশি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে ৬০ শতাংশ বেশি গ্যাস ব্যবহার করে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাটি।
সিইউএফএল সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যেকোনো সার কারখানা বছরে একবার ওভারহোলিং (বড় ধরনের মেরামত) করার কথা। অথচ ১৯৮৭ সালে চালু হওয়ার পর চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা লিমিটেডের ওভারহোলিং হয়েছে হাতেগোনা কয়েকবার। এসব কারণেই মূলত সার উৎপাদনে গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীরও অভাব রয়েছে।
বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় হয় নরসিংদীর পলাশ ও ঘোড়াশাল সার কারখানায়ও। ঘোড়াশাল সার কারখানার একটি সূত্র জানায়, কারখানাটির যন্ত্রপাতি অনেক পুরনো হওয়ায় প্রায় সময়ই বিকল হয়ে পড়ে। পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে সার উৎপাদনে গ্যাসের অপচয়ও তাই বেশি হয়।
এছাড়া আশুগঞ্জের সার কারখানায় প্রতি টন সার উৎপাদনে গ্যাস লাগে ৭৩ হাজার ঘনফুট। অত্যধিক গ্যাসের অপচয় হতো সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায়। বর্তমানে এটি বন্ধ করে শাহজালাল সার কারখানা নির্মাণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যতে সস্তায় গ্যাসের প্রাপ্তিতা কঠিন হয়ে পড়বে। এ বিবেচনায় গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখন থেকেই দক্ষতা বাড়ানো উচিত।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, অপচয় যে শুধু সার কারখানায় হচ্ছে তা নয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রেও হচ্ছে। সরকার গ্যাসের অপচয় কমিয়ে আনার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সার কারখানাসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক করা। এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরো পদক্ষেপ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, দেশে মোট গ্যাসের প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এছাড়া শিল্প-কারখানায় ১৬ শতাংশ, গৃহস্থালিতে ১২ দশমিক ২৬, সার কারখানায় ৫ দশমিক ৩৮ ও সিএনজিতে ব্যবহার হয় ৫ শতাংশ গ্যাস। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩২০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে দৈনিক ২২০ কোটি ঘনফুট। প্রতিদিন গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি রযৈছে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। প্রতিনিয়ত অপচয়ের কারনে গ্যাসের এ ঘাটতি বাড়ছেই। গ্যাসের অপচয়রোধ করা না গেলে বড় ধরনের সংকটে পড়বে দেশের শিল্প কারখানা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ