ঢাকা, সোমবার 26 December 2016 ১২ পৌষ ১৪২৩, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ব্যবসার পরিবেশ বিবেচনায় সূচকের তলানিতে বাংলাদেশ

এইচ এম আকতার : নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নিয়মিত হচ্ছে। সকল বিতর্ক পেছনে ফেলে গত অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ব্যাংকঋণের সুদহারও অনেক কমেছে। কর কাঠামো সহজ করার চেষ্টাও চলছে। দেশের রাজনৈতিক অবস্থাও স্থিতিশীল রয়েছে। এরপরও দেশের ব্যবসার পরিবেশ উন্নত হচ্ছে না। ফলে ব্যবসার জন্য বাংলাদেশ আদর্শ স্থান নয় বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী বাণিজ্য সাময়িকী ফোর্বস। ব্যবসার পরিবেশের দিক থেকে ১৩৯ দেশের মধ্যে ১১৭তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

সংস্থাটির মতে, ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগ সুরক্ষা, পরিবেশের স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব করকাঠামো। এছাড়া ঋণের সহজপ্রাপ্তি, সম্পত্তির মালিকানা লাভের প্রক্রিয়া, আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন উদ্ভাবন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অনুপস্থিতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এসব মানদণ্ডের কোনোটিতেই ভালো অবস্থানে নেই বাংলাদেশ।

গত বুধবার প্রকাশিত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘দ্য বেস্ট কান্ট্রিজ ফর বিজনেস ২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসার পরিবেশের দিক থেকে ১৩৯ দেশের মধ্যে ১১৭তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর গত বছর ১৪৪ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২১তম। অর্থাৎ চার ধাপ এগোলেও এবার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে পাঁচটি দেশ। ফলে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থানের উন্নতি হয়নি।

তথ্যমতে, টানা ১১ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসার পরিবেশ তুলে ধরছে ফোর্বস। পরবর্তী বছরের জন্য প্রতি ডিসেম্বরে এ সূচক প্রকাশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। এক্ষেত্রে ১১টি উপাদানের ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের ব্যবসার পরিবেশ বিশ্লেষণ করা হয়। এগুলো হলো: সম্পত্তি অর্জনের অধিকার, উদ্ভাবন, করের বোঝা, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, দুর্নীতির চিত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাণিজ্যস্বাধীনতা, আর্থিকস্বাধীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা ও শেয়ারবাজারের অবস্থা। আর এ উপাদানগুলো বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয় বিশ্বের খ্যাতনামা কিছু গবেষণার তথ্য।

সূচকগুলো বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ফোর্বস বলছে, বিশ্বে ব্যবসা করার জন্য উৎকৃষ্ট দেশ সুইডেন। শীর্ষ পাঁচে এরপর রয়েছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, হংকং, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য। আর তালিকার শেষের পাঁচটি দেশ হলো যথাক্রমে ভেনিজুয়েলা, ইয়েমেন, হাইতি, জাম্বিয়া ও চাদ। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার অবস্থান ৮৩, ভারত ৮৫, ভুটান ৯৪, পাকিস্তান ১০৪ ও নেপাল ১১৮।

জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সদ্য বিদায়ী সভাপতি হোসেন খালেদ বলেন, ব্যবসার জন্য বাংলাদেশের পরিবেশ খুব বেশি উন্নত নয়, এটা বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ ও বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচক’-এ উঠে এসেছে। এবার ফোর্বসের প্রতিবেদনেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। এর মূল কারণ অত্যধিক করের হার, ঋণের উচ্চ সুদ, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি। এছাড়া বিনিয়োগকারীর সুরক্ষার অভাব, ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা, দুর্নীতিও বাধা হিসেবে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, ফোর্বসের প্রতিবেদনে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো ব্যবসা করার জন্য আদর্শ নয় এমন দেশগুলোর বেশিরভাগই যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত। আর কিছু দেশ খুবই দরিদ্র। তবে বাংলাদেশ এ ধরনের ক্যাটাগরির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত না হলেও তলানির দিকেই অবস্থান করছে। এর মূল কারণ সরকারি বিভিন্ন নীতি ও প্রতিষ্ঠান। তাই এগুলোর পরিবর্তন ছাড়া বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশে উন্নতির খুব বেশি সুযোগ নেই।

 ফোর্বসের তথ্যমতে, ‘দ্য বেস্ট কান্ট্রি ফর বিজনেস ২০১৬’ সূচকটি প্রণয়নে ব্যবহৃত দুটি মানদণ্ড বাণিজ্যস্বাধীনতা ও আর্থিক স্বাধীনতা পরিমাপে ব্যবহার করা হয়েছে হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ইনডেক্স অব ইকোনমিক ফ্রিডমের তথ্য। এটি ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। দুই মানদণ্ডেই বাংলাদেশের অবস্থান বেশ দুর্বল। বাণিজ্যস্বাধীনতায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯ দেশের মধ্যে ১২৪ ও আর্থিকস্বাধীনতায় ১২২। মানদণ্ড দুটির আওতায় আইনের শাসন, সীমাবদ্ধ সরকারি কার্যক্রম, নিয়ন্ত্রণমূলক দক্ষতা ও উন্মুক্ত বাজার বিবেচনা করা হয়েছে। এগুলোর কোনো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ খুব বেশি শক্তিশালী অবস্থানে নেই।

বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ২০১৬’র তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে করের বোঝা, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিমাপে। এ তিন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ১১১, ৬৭ ও ১০০। এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে ব্যবসায় শুরু, অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি, বিদ্যুতের প্রাপ্যতা, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণ প্রাপ্যতা, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর পরিশোধ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণ।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নিয়ে গবেষণাকারী যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ফ্রিডম হাউসের তথ্যের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯ দেশের মধ্যে ৯০। এজন্য বিবেচিত রাজনৈতিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকরা আংশিক স্বাধীনতা ভোগ করে বলে মনে করে ফ্রিডম হাউস।

উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অবস্থান পরিমাপে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন’। এ দুই মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থান যথাক্রমে ১২০ ও ১২১। এক্ষেত্রে উদ্ভাবনী ক্ষমতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মান, গবেষণা ও উন্নয়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ, গবেষণা ও উন্নয়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সংযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি পণ্য ক্রমে সরকারি ব্যয়, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী প্রাপ্যপতা এবং প্যাটেন্ট স্বত্ব নিবন্ধনের হার বিবেচনা করা হয়েছে।

দুর্নীতির মাত্রা পরিমাপে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক’ ও সম্পদ অর্জনের অধিকার পরিমাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপার্টি রাইটস এলায়েন্সের ‘দ্য প্রোপার্টি রাইটস ইনডেক্স’-এর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এ দুই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৯ দেশের মধ্যে যথাক্রমে ১২৭ ও ১২৫। আর শেয়ারবাজারের অবস্থা পর্যালোচনায় ব্যবহার করা হয়েছে সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের গত ১২ মাসের তথ্য। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৬।

 বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশ সংক্রান্ত কিছু মানদণ্ডে বাংলাদেশ ভালো অবস্থায় থাকলেও মৌলিক বিষয়গুলোয় দুর্বলতা রয়ে গেছে। ফলে গত দুই দশক আগে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে যে বড় ধরনের আশা সঞ্চার হয়েছিল সে তুলনায় অগ্রগতি সামান্য। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় যখন ছয়-সাত বিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ যাচ্ছে তখন আমাদের দেশে মাত্র দুই বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার দিক থেকে আমরা এখন হাঁটছি, অন্যরা তখন দৌড়াচ্ছে। আর এ পিছিয়ে পড়া রোধে সরকারে উচিত বিভিন্ন মৌলিক খাতে দ্রত সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া। তা না-হলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন সম্ভব নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ