ঢাকা, সোমবার 26 December 2016 ১২ পৌষ ১৪২৩, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার দাবী সোনারগাঁয়ে তাঁতশিল্পে সংকট

সোনারগাঁয়ে তাঁতের কাজ করছেন একজন কারিগর

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ): “তাঁত, তাঁতী ব্যবসা এই তিনে সোনারগাঁ” এমন প্রতিপাদ্যই এক সময় আকৃষ্ট করতো নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ দর্শনে আসা দেশী-বিদেশী পর্যটকদের। উৎসুক পর্যটকরা জানতে চাইতেন এই তাঁতের ইতিহাস। কালের বিবর্তনে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির অভাবে ইতিহাসে সোনারগাঁ থেকে ঐতিহাসিক মসলিন ও জামদানি তাঁত বিলুপ্ত হয়ে গেছে বহুদিন আগেই। সোনারগাঁয়ে মসলিন তৈরির তাঁত এখন শুধু ইতিহাসের পাতায়ই সিমাবদ্ধ। মসলিন ও জামদানির তাঁত সোনারগাঁ থেকে বিলুপ্ত হলেও সেই তাঁতের আদলেই তৈরিকৃত আকারে একটু বড় তাঁতেই বর্তমানে তৈরি হচ্ছে গুনার (তারের) তৈরি জাল। দৃষ্টি নন্দিত সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠা পরিবেশ বান্ধব এই তারের তাঁত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ না করলেও আপন মনেই জীবিকার তাগিদে জাল বুনে যাচ্ছেন কারিগরেরা। ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে পরিচিত এ ব্যবসায় চাহিদা ও লাভ বেশি থাকায় সোনারগাঁয়ের প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই কম বেশি গড়ে উঠেছে এসব তাঁত কারখানা। তারের তাঁত দিয়েই সচ্ছল হয়েছেন অনেকে। মজুরী খুব একটা বেশি না পেলেও তারের জাল বুনেই খেয়ে-পড়ে সন্তুষ্ট সংশ্লিষ্ট কারিগর। তবে চাহিদা মতো সহজ শর্তে ঋণ পেলে এ শিল্পে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার মোগরাপাড়া, সাদীপুর, জামপুর, নোয়াগাঁও, কাঁচপুর, বারদী, বৈদ্যেরবাজারসহ প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন এবং সোনারগাঁ পৌরসভার অধিকাংশ এলাকায় গুনার (তার) তাঁত চালিয়ে সচ্ছল হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পৌরসভার উত্তর ষোল্লপাড়া গ্রামের তাঁত ব্যবসায়ী মোঃ আলমগীর হোসেন, মোগরাপাড়ার ভাগলপুর গ্রামের মামুন, পিরোজপুরের ভবনাথপুর গ্রামের মোশারফ মেম্বারাসহ আরো অনেক গুনার তাঁত মালিক জানান, দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে তারা এ ব্যবসার সাথে জড়িত। কেউ দাদার সুবাদে কেউ বাবার, আবার অনেকে নিজের ইচ্ছায়ই এ ব্যবসায় মনোনিবেশ করেছেন। কেন এ পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন জানতে চাইলে তারা বলেন, অন্যান্য ব্যবসা করতে গেলে মোটা অংকের অর্থ ও লোকবলের প্রয়োজন। তাছাড়া লোকসানের সম্ভাবনাও থাকে। আর এই গুনা’র তাঁতে তেমন একটা অর্থ ও লোকবলের প্রয়োজন হয় না। মাত্র দু’জন কারিগরেই সপ্তাহে ৫০ ফুটের ৮-১২টি রোল নামাতে পারে। এ ব্যবসায় লোকসানের সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। তারের জাল তৈরির কারিগর হাশমত আলী (২২), আজিজুল (২৫), শাহ্ আলীসহ আরো অনেকে জানান, বেশ কয়েক বছর যাবত কারিগর হিসেবে কাজ করছেন তারা। একটি ১শ’ ফুটের জাল (নেট) তৈরি করতে সময় লাগে শ্রেণীভেদে এক থেকে তিন দিন। প্রতি সপ্তাহে ১০-১২টি করে রোল (৫০ ফুটে এক রোল) নামানো যায়। কারিগররা মজুরী পান জাল তৈরি হিসেবে। সর্বনিম্ন ৩৫০ থেকে ১ হাজার ৩শ’ টাকা পর্যন্ত রয়েছে প্রতিটি জাল তৈরির কারিগর মজুরি। এর মধ্যে আবার কারিগরদেরই যোগালির মজুরি দিতে হয়। গড় হিসেবে সব মিলিয়ে প্রতি সপ্তাহে একজন কারিগর শ্রমের মজুরি পেয়ে থাকেন ২১শ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। সে টাকা থেকেই বেতন দিয়ে রাখতে হয় যোগালিদের। যদি কারিগরদের সাথে যোগালি থাকে তাহলে দ্রুত জাল বোনা সম্ভব। আর একা করলে সময় লাগে দ্বিগুণ। যোগালিরা কোলের রোলার থেকে মাথার (অপর প্রান্তের) রোলার পর্যন্ত গুনা (তার) টেনে সংযোগ করে, চড়কি থেকে মাক্কুতে গুনা (তার) ভরে দেয় ও ঝাঁপ (পায়ের নীচের দু’টো বাঁশ উঁচু-নীচু করে) মারে। আর কারিগররা মাক্কু মেরে নিপুণ হাতে সূক্ষভাবে জাল তৈরি করেন। যোগালি রফিক জানায়, প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কাজ করে প্রতি সপ্তাহে সে ১১শ টাকা পায়। তবে যারা নতুন তারা প্রথমে প্রতি সপ্তায় ৭শ টাকা বেতনে কাজ করে। কর্ম দক্ষতানুযায়ী বেতন বেড়ে ১২-১৩শ’ টাকা পর্যন্ত হয়। পরে আবার তারাই কারিগর হিসেবে কাজ করতে পারে। এই তাঁত কারিগরেরা আরো জানান, কাজের টাকা দিয়ে খুব বেশি কিছু করতে না পারলেও খেয়ে-পড়েই সন্তুষ্ট তারা। তাঁত মালিক আলী-আকবর নিজের তাঁতে কাজ করতে করতে জানান, প্রায় ১০-১২ বছর যাবত এ পেশায় নিয়োজিত তিনি। তাঁত বসানোর জন্য বাড়ির পাশেই একজনের জমি বাৎসরিক হিসেবে ভাড়া নিয়ে গুনার তাঁত চালিয়ে আসছেন। তার দু’টি তাঁত রয়েছে। নিজেই তার ছোট ভাই ওমর ফারুককে সাথে নিয়ে একটি ও কারিগর দিয়ে আরেকটি তাঁত চালিয়ে আসছেন।
স্থানীয় বাজার থেকে গুনা (তার) কিনে জাল বুনছেন তারা। যখন যেমন অর্ডার পান সে হিসেবে বিভিন্ন মাপের তার কিনে বিভিন্ন মাপের জাল বুনে বিক্রি করেন। গুনার (তারের) জাল বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হয় বিধায় এর চাহিদা অনেক। ঘরের জানালা, খাবার রাখার সেলফ, কন্সট্রাকশনের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার, মাছের খাঁচাসহ অনেক কাজে লাগে এই জাল। আগে এই জাল তৈরির পর বিভিন্ন রকমের রং করে বিক্রি করা হতো। বর্তমানে আর হাতে রং করতে হয় না। চাহিদা মতো দানা (প্লাস্টিক)’র লেমিনেশন করা তার কিনতে পাওয়া যায় বিধায় সহজেই তা এনে জাল বোনা যায়। ঢাকা, নরসিংদী, কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা সোনারগাঁ থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছেন এই জাল।
অনেক ব্যবসায়ী এসে মাল নিয়ে যায় আবার অনেকের কাছে মাল পৌঁছে দিয়ে টাকা আনতে হয়। ৮ মেস থেকে ১৫ মেস (৮ মেস ফাঁকা বেশি আর ১৫ মেস ঘন) প্রতি রোল বিক্রি হয় ৮শ’ থেকে ৩ হাজার ২শ’ টাকা পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাহে ৮-১২ রোল জাল বিক্রি করা যায়। এ তাঁত ব্যবসা করে সোনারগাঁয়ের প্রায় ২-৩ হাজার ব্যবসায়ী সচ্ছল হয়েছেন বলে জানিয়েছেন, উত্তর ষোল্লপাড়া গ্রামের আলমগীর হোসেনু। তিনি আরো জানান, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৫০-৬০ হাজার তাঁত রয়েছে। যদি সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাওয়া যেত তাহলে পরিবেশ বান্ধব এ ব্যবসায় বিপ্লব ঘটানো সম্ভব ছিল সোনারগাঁয়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ