ঢাকা, সোমবার 26 December 2016 ১২ পৌষ ১৪২৩, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কপোতাক্ষ পাড়ের বানভাসী মানুষের নতুন করে বাঁচার স্বপ্নের বাস্তবায়নে আর কত অপেক্ষা?

কপোতাক্ষ খনন কাজ চলছে কচ্ছপ গতিতে -সংগ্রাম

এম এ ফয়সাল তালা (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা : বছরের পর বছর ঘর-বাড়ি, ফসলি জমি, মৎস্য ঘের, পুকুর, রাস্তা-ঘাট তলিয়ে আছে পানিতে। সারা বছরে একটি ফসলও ঘরে তুলতে পরছে না কপোতাক্ষ পাড়ের কৃষকরা। ফলে এলাকার খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিগত ১ যুগের বেশি সময় ধরে ভয়াবহ বন্যা আর স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে কপোতাক্ষ পাড়ের লাখ লাখ মানুষের সর্বসান্ত হয়েছে।
জানা যায়, দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের আশীর্বাদের কপোতাক্ষ নদ আজ মানুষের অভিশাপে পরিণত হয়েছে। কপোতাক্ষ নদের নাব্যতা হারানোর ফলে দেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের ৩ টি জেলার ৯ টি উপজেলার প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভুক্তভোগী জনগণের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে সরকার কপোতাক্ষ পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করে। এ অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মুক্তির স্বার্থে ২০১১ সালের অক্টোবরে ২৬১ কোটি ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টাকা ব্যয় সাপেক্ষে “কপোতাক্ষ নদ’র জলাবদ্ধতা দূরীকরণে খনন প্রকল্প (১ম পর্যায়)” অনুমোদিত হয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রকল্পটির মূল কাজ তালা উপজেলার পাখিমারা বিলে জোয়ারাধারা (বিলের মধ্যে জোয়ার ভাটার ব্যবস্থা) বাস্তবায়ন এবং ৯০ কিঃমিঃ কপোতাক্ষ নদ খনন। চার বছর মেয়াদি প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাল ধরা হয় ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত। প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার চালুর পর নদী খনন কার্যক্রম শুরু করা হবে। কিন্তু আইনী জটিলতায় ৫ম বছরের শেষ মুহূর্তে টিআরএম চালু করতে সক্ষম হয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে প্রকল্পের শেষ মুহূর্তে খননের কাজ অনেকটা এগিয়ে চললেও তা বর্তমানে আবার স্থগিত রয়েছে। প্রকল্পের ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্নের দাবি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের। তবে এলাকার ভুক্তভোগী মানুষের দাবি মেয়াদ দুবছর বৃদ্ধি করলেও ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়নি। আর এ কারণেই জলাবদ্ধতার পরিধি বাড়ছে। ভোগান্তি ও বাড়ছে তীরবর্তী মানুষের।
সরকার কপোতাক্ষ পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নেওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ আবারও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিল! কৃষক আবারও জমিতে সোনালী ফসল ফলাতে পারবে, ধান কাটার মৌসুমে কৃষকের আঙ্গিনায় ধানে ধানে পূর্ণ হবে, আবারও ঘরে সুখ ফিরবে এমনই আশায় বুক বেঁধেছিল কপোতাক্ষ পাড়ের লাখ লাখ কৃষক। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন যেন আর শেষ হতে চাইছে না!
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, নতুন করে ৬ কোটি ৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রতিরক্ষা বাঁধেও চলছে গোজামিল। সেটিও কতদিন টিকবে তা নিয়ে এলাকার মানুষের মাঝে রয়েছে নানা সংশয়!
খেশরা ইউনিয়নের পাখিমারা বিলে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ শত ৬৬ একর জমিতে টি.আর.এম প্রকল্প বাস্তবায়ন এ লিংক চ্যানেল খনন সহ জমি অধিগ্রহণ ও বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে যেনতেনভাবে শেষ করা হয় টিআরএম প্রকল্প। এরপর আইনি জটিলতার অজুহাতে নির্ধারিত সময়ের ৪ বছর পর প্রকল্প চালু হয়। ৪ বছর মেয়াদী প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে পর পর আরও দু বছর মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপরেও শেষ হচ্ছে না কপোতাক্ষ খনন প্রকল্প!
সরেজমিন কপোতাক্ষ নদ খনন এলাকা ঘুরে দেখাগেছে, তালা উপজেলা জেঠুয়া পর্যন্ত ১৪ কিঃ মিঃ খনন কাজ বাস্তবায়ন করছে বিনিময় কন্সট্রাকশন,এস এস কন্সট্রাকশন ও এম টি এন্ড এমটি নামে ৩ টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান । খনন কাজে নিয়োজিত ১০টি স্কেভেটর ও দুটি ড্রোজারে মধ্যে ৫/৬ টি বিকল হয়ে পড়ে আছে। তবে চলতি অর্থবছরেও এর সুফল পাবে কিনা তা নিয়ে কপোতাক্ষ পাড়ের মানুষ মাঝে সংশয় রয়েছে।
ইতঃপূর্বে খুলনা জেলার কপিলমুনি বাজার হতে তালা- পাটকেলঘাটা হয়ে কেশবপুরের কোমলপুর পর্যন্ত ৩২ কি.মি. নদ খনন কাজও নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। নানা অনিয়ম-দুনীতির কারণে মেয়াদ উত্তীর্ণের ২ বছর পরেও ৫০ ভাগ কাজ করতে পারেনি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। তবে খনন কাজ ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের।
কথা হয় জালালপুর ইউপি চেয়ারম্যান লিটুর সহিত, তিনি জানান, দ্রুত গতিতে কাজ চলছে, খুব শীগ্রই জলাবদ্ধতা দূর হবে।
সরেজমিন গিয়ে কথা হয়, তালার ইসলামকাটি গণডাঙ্গা গ্রামের বিকাাশ হালদার (৬০), বাপ্পী মল্লিক (৪০), প্রভাষ সরকার(৫০), বারাত গ্রামের হাসেম আলী সরদার (৪৬), ইউছুপ আলী সরদার (৫৩) খেশরা ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের আঃ লতিফ (৪৫), জামাল উদ্দিন (৪৪), আঃ ওয়াজেদ (৪০), জালালপুর ইউনিয়নের জেঠুয়া গ্রামের ওলিয়ার শেখ (৪৮) মাগুরা ইউনিয়নের বারুইপাড়া গ্রামের আশুতোষ বিশ্বাস (৫৫) সহ ভুক্তোভোগী শত শত এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, নদ খনন কাজ এগিয়ে চলায় বিগত বছর গুলোর বন্যা ও জলাবদ্ধতায় নিঃস্ব হওয়া সেই বেদনার কথা অনেকটাই ভুলে পরিবার পরিজন নিয়ে আবারও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে তারা।
যশোর পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত কাজের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি দক্ষিণ-পশ্চিাঞ্চলের অভিষাপ্ত কপোতাক্ষ নদ আবারও আশির্বাদের নদে পরিণত করার জন্য এলাকাবাসীর সহযোগীতা চান তিনি।
 উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ হোসেন জানান, বর্তমানে ১৪ কিঃ মিঃ খনন কাজ চলছে। কোন অনিয়ম- দুনীতি ছাড়াই আগামী বছরের জুনেই ৫ টি লটের কাজ হবে বলে আশা করছি।
খনন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারের ম্যানেজার
যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বন্যা কবলিত ৯টি উপজেলার প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ বর্ষা মৌসুমের বন্যা ও জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবে। তাই ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর দাবি সুষ্ঠু খননের মাধ্যমে আবারও পুনঃজীবন ফিরে আসুক কপোতাক্ষের সাথে তীরবর্তী মানুষের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ