ঢাকা, মঙ্গলবার 27 December 2016 ১৩ পৌষ ১৪২৩, ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কবি আল্লামা ইকবাল

ইব্রাহিম রহমান : ওঠো দুনিয়ার গরীব ভুখারে জাগিয়ে দাও।
ধনিকের দ্বারে ত্রাসের কাঁপন লাগিয়ে দাও॥
কিষাণ-মজুর পায়না যে মাঠে শ্রমের ফল।
সে মাঠের সব শস্যে আগুন লাগিয়ে দাও॥
একজন পাঠকের ধারণা কবিতার উপরোক্ত চারটি লাইন হয়তো আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের অথবা তরুণ বিপ্লবী কবি সুকান্তের কবিতা থেকে উদ্ধৃত। প্রকৃত পক্ষে ঐ চার লাইন কবিতা মানবতাবাদের কবি আল্লামা ইকবালের। ইকবালকে নিয়ে যারা চর্চা করে কিংবা ইকবালের। উপর যারা গবেষণা করেন তারা ঠিকই জানেন যে, উপরোক্ত লাইনক’টি ইকবালের কবিতা থেকে উদ্ধৃত। ইকবাল যে প্রকৃতই নিপীড়িত মানুষের কবি তার কবিতা না পড়লে বোঝা যায় না। ইসলামী আদর্শের অমলিন রূপকার এবং স্বদেশ ও স্বজাতির জাগরণের বাণী-বাহক আল্লামা ইকবাল মূলত মানবতাবাদী কবি। তার কবিতার আবেদন ও সৃষ্টিশীল বার্তাও তাই বিশ্বমানবতার কাছেই। আল্লামা ইকবালের কবিতার এই বিশ্বজনীন আবেদনের জন্য তো বটেই পাশাপাশি মুসলিম জাগরণ ও ইসলামী আদর্শের বাণীবাহক বলেও তার কবিতাও কালজয়ী রচনার আবেদন বিশ্বব্যাপী উপমহাদেশ এবং সারা বিশ্বের পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী বিদ্বজন মহলে এবং সকল শ্রেণীর পাঠক মহলে ব্যাপকতর ও গভীরতর মূর্ছনা নিয়ে উপস্থিত। আশ্চর্যের বিষয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সমাদৃত হলেও বাংলাদেশে ইকবাল যেন অপাঙ্ক্তেয়।
ভারতের জাতীয় কবি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যে পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া হয় তার পাশাপাশি আল্লামা ইকবালকে নিয়ে সে পরিমাণ আলোচনা দূরে থাক, আল্লামা ইকবালের নাম উচ্চারণ করাও যেন একটা অপরাধ। গত ৯ নভেম্বর ছিল আল্লামা ইকবালের জন্মদিন। কোন সংবাদপত্রে ঐদিন এ সম্পর্কে কোন সংবাদ বা লেখা ছাপা কী পরিমাণ দেউলিয়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজ এমনকি মিডিয়া। যদিও আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি আল্লামা ইকবালও এক সময় বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে একভাবে সমাদৃত ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই আল্লামা ইকবাল যেন আমাদের কাছ থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছে। যদিও আল্লামা ইকবাল পাকিস্তান বা উপমহাদেশের কবি নন, আল্লামা ইকবাল সারা বিশ্বের কবি। তার বিচরণও আবেদন বিশ্বব্যাপী। পাকিস্তান-ভারতের চরম শত্রুতার সম্পর্ক হলেও আল্লামা ইকবাল ভারতে পাকিস্তানের চেয়ে কম সমাদৃত নয়। পাকিস্তানের নাম উচ্চারণ ভারতে অপাঙ্ক্তেয় হলেও আল্লামা ইকবালের ক্ষেত্রে তা মোটেও প্রযোজ্য নয়। ভারতের সুধী সমাজে এবং মিডিয়ায় আল্লামা ইকবাল ব্যাপক আলোচিত ও শ্রদ্ধার পাত্র।
যাহোক, বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে আল্লামা ইকবাল মোটেও অপরিচিত নন। বিশের দশকেই তার জীবনবাদী ও মানবতাবাদী কবিতা বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এরপরেও হয়েছে। আল্লামা ইকবালের বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষায় বিভিন্ন সময়ে অনূদিত হয়েছে। দার্শনিক ও কালজয়ী তথ্য ও আদর্শ সমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘Reconstruction of Religions Thought in Islam’ ও ‘প্রজ্ঞান চর্চায় ইরান’ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এছাড়াও আল্লামা ইকবালের আরও বহু গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিশ্ব মানবতাকে ধ্বংসের গভীর আবর্ত থেকে উদ্ধার করার যে আর্তি আল্লামা ইকবালের কবিতায় ফুটে উঠেছে, তার অন্তরঙ্গ সুর বাংলার মানসকে আচ্ছন্ন করছে। বিশেষ করে বাংলার মুসলিম মানস তার কবিতার মধ্যে আত্ম আবিষ্কারের সন্ধান পেয়েছে।
সমগ্র উপমহাদেশের ন্যায় বাংলায়ও তিনি একজন জনপ্রিয় জীবনধর্মী কবি ও দার্শনিক। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় আল্লামা ইকবাল অনূদিত হয়েছে। মানবতাবাদী কবি হিসেবে তিনি বিশ্বের সর্বত্র সমাদৃত হয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আল্লামা ইকবালের ওপর গবেষণা অব্যাহত আছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববরেণ্য কবি আল্লামা ইকবালের জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী ব্যাপকভাবে পালিত হচ্ছে। বিভিন্ন ভাষায় তার গ্রন্থসমূহ ভাষান্তর হচ্ছে। তাঁর উপর স্বতন্ত্র পুস্তকাদি রচিত হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও সংকলন ও ক্রোড়পত্র বের হচ্ছে- এটা সত্যিই অনন্য। দেশ-বিদেশে ইকবালের উপর যেসব পুস্তক রচিত হয়েছে, এক হিসেব অনুযায়ী তার সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি। মনে হয়, বিশ্বব্যাপী এক মহা প্রতিযোগিতা চলছে। ইকবালের জীবন ও কাব্যের এমন কোন দিক নেই, যার উপর গবেষণা হয়নি। তাঁর কবিতা, গজল, মর্সিয়া এবং গান হতাশাগ্রস্ত মানুষের মনে আশা ও আকাক্সক্ষার জন্ম দিয়েছে।
ইতিহাসের এক অশান্ত পরিবেশে ১৮৭৭ খৃস্টাব্দের ৯ নভেম্বর শুক্রবার ৩রা জিলক্বদ ১২৯৪ হিজরি ফজরের আযানের সময় বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট নগরীতে এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। একতলা একটি জীর্ণ বাড়ির যে প্রকোষ্ঠে তার জন্ম তা এখনও পাকিস্তান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষতি। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য এটি একটি দর্শনীয় বাড়ি।
ইকবালের পূর্ব-পুরুষগণ কাশ্মীর থেকে হিজরত করে শিয়ালকোটে বসতি স্থাপন করেন। গবেষণায় পাওয়া যায়, ইকবালের আদি পিতা ছিলেন বাবা লোলহাজরা বা লোলহাজী। স্বয়ং ইকবালই এই তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ নূর মুহাম্মদ। তিনি ছিলেন শিয়ালকোটের অন্যতম টুপি ব্যবসায়ী। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশু ইকবাল মাওলানা গুলাম হাসান ও সৈয়দ মীর হাসানের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। স্কচ মিশন স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মীর হাসান মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষা প্রবর্তনে খুব আগ্রহী ছিলেন। পিতা শেখ নূর মুহাম্মদের অনুমতিক্রমে ইকবালকে তিনি স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করেছেন। প্রাথমিক স্তর থেকে এফএ পর্যন্ত দশ বছরকাল তিনি সৈয়দ মীর হাসানের তত্ত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহণ করেন। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৈয়দ মীর হাসান অভিনব পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণ ইকবালের মানে ঐকান্তিক পিপাসা জাগিয়ে তোলেন। ১৮৮৮ সালে প্রাথমিক, ১৮৯১ সালে মিডল এবং ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি ও মেডেলসহ উত্তীর্ণ হন। ১৮৯৫ সালে ইকবাল ঐ কলেজ থেকে এফএ পাস করেন এবং একই বছর ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে লাহোর গমন করেন। লাহোর সরকারি কলেজ থেকে ১৮৯৭ সালে স্নাতক ও ১৮৯৯ সালে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
একই বছর তিনি লাহোরের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শন শাস্ত্রে অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯০১ সালে লাহের সরকারি কলেজে ইংরেজি ও দর্শন শাস্ত্রে সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ইংরেজি, আরবি ও দর্শনে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী ইকবালের শিক্ষা জীবনে দ্বিতীয় শিক্ষক মীর হাসানের গভীর জ্ঞান এবং কলেজ জীবনে দর্শনের শিক্ষক টমাস আরনল্ড তার জীবনে প্রবল প্রভাব প্রতিফলিত করেন। টমাস আরনল্ডের উৎসাহে ১৯০৮ সালে যুক্তরাজ্যের Lincoln’s Inn থেকে ব্যারিস্টারী ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি পাশাপাশি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। জার্মানী থেকে ১৯০৭ সালে দর্শনে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯১২ সালে এক নতুন ইকবাল স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। তদানীন্তন বিশ্বপরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বের অধঃপতনে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। মুসলমানদের এই দুঃসময়ে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করেন যে, তুর্কী সাম্রাজ্য তখন নামেমাত্র ইসলামী রাষ্ট্র। পূর্ব ইউরোপ থেকে ইসলাম ধীরে ধীরে নির্বাসিত হচ্ছিল। দক্ষিণ রাশিয়ার মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে রুশ স¤্রাট একে একে গ্রাস করছিল। চীনের মুসলমানরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছিল। বৃটিশ করায়ত্ত করে নিয়েছিল মিসর। ফ্রান্স মরক্কো দখলের ফন্দি করছিল। ইরানের অবস্থা ছিল মুমূর্ষু। ওলন্দাজ উৎপীড়নে ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছিল না।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর থেকে ভারতীয় মুসলমানদের ভাগ্যেও নেমে এসেছিল চরম দুর্দিন। এমনি পরাজয় ও নিঃসহায় অবস্থায় ভারতীয় মুসলমানদের আশা-ভরসার উৎস ছিল ওসমানীয় খেলাফত। তুর্কীরাই তখন সীমিত পরিসরে হলেও কিছুটা স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছিল। তুর্কীদের দিকেও হায়েনার লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। মুসলমানদের এই শেষ সম্বল তুরস্ককেও তারা গ্রাস করতে থাবা বিস্তার করছিল। ওদিকে বৃটিশরা তুর্কীদের বিরুদ্ধে গ্রীসকে লেলিয়ে দেয়। এতে ভারতীয় মুসলমানরা বৃটিশের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। সেই যুগসন্ধিক্ষণে যেসব তরুণ মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তাদের সম্মুখ ভাগে ছিলেন আধুনিক বিশ্বে ইসলামের সময়োপযোগী ব্যাখ্যাকার, ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের অগ্রসেনা, মানবতার মুক্তিকামী বিদ্রোহী কলম যুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক মহাকবি ইকবাল।
ইকবাল তন্দ্রাচ্ছন্ন মুসলিম জাতিকে আমৃত্যু কাব্যের চাবুক মেরে জাগ্রত করার প্রয়াস পান। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এমন কোন দিক ছিল না, যে বিষয়ে তিনি তার মেধাকে ব্যবহার করেননি। কাশ্মীর, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, স্পেন, ইন্দোনেশিয়াসহ প্রতিটি রাষ্ট্রের সমস্যা নিয়েই তিনি দিক-নির্দেশনা সম্বলিত দরদমাখা কাব্য রচনা করেন। মুসলিম জাতি তাঁর কাব্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হৃত গৌরবের কথা স্মরণ করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে। তাদের সম্বিৎ ফিরে আসতে শুরু করে।
ইকবাল নিছক কবি বা দার্শনিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন দূরদর্শী রজনীতিকও। সবচেয়ে বড় কথা, ইকবাল ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী কবি, ভাবুক ও রাজনীতিক। গতানুগতিকতার সোজাপথ ছেড়ে যে কবি-দার্শনিক সম্পূর্ণ এক নতুন পথে এগিয়ে গেছেন, তিনিই হলেন মহাকবি আল্লামা ইকবাল। তিনি কাব্যকে করেছেন জাতি গঠনের হাতিয়ার। এই বিশাল ব্যক্তি উর্দু, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষায় মুসলিম উম্মাহ্কে যে পথের দিশা দিয়ে গেছেন, তা সম্পূর্ণ কুরআন, হাদিস, ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্যের নির্যাস। তার রচনা সমগ্রে মিশে আছে ইসলাম।
ইকবাল ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’-এ বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্প জীবনের জন্য। আর সেজন্যই তিনি নির্জীব জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবিতাকে ব্যবহার করেন। তাঁর পদ্য গদ্য যেকোন রচনার উদ্দেশ্য ছিল শুধুমাত্র মুসলিম মিল্লাত, মুসলিম জাতির ঐক্য ও সংহতি। তিনি মুসলিম বিশ্বকে এক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আমৃত্যু কলম সৈনিক হিসেবে সংস্কার আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। ইকবালের প্রত্যাশা ছিল, ইসলাম একদিন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই।
আল্লামা ইকবাল একটি যুগের স্রষ্টা, একটা নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্নদৃষ্টা, রুফকার। পাক ভারতীয় মুসলমানদের নিদমহলার মুয়াজ্জিন। তাঁর জ্যোতির্ময় বাণী মুসলিম জাহানে এনেছে নতুন জীবন, নব জাগরণ। তিনি তাঁর স্বপ্নের রাষ্ট্রের কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে এলাহাবাদে মুসলিম লীগের বার্ষিক সম্মেলনে ভারতে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমি ভারত ও ইসলাম দুয়েরই বৃহত্তর স্বার্থে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানাচ্ছি।’
ইকবাল খ্যাতিমান কবি, উদারপন্থী সংস্কারক। তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে তাঁর সৃষ্ট কর্মের অন্তর্নিহিত বাণী বিশ্বমানবের হৃদয়ে জন্ম দিয়েছে আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন। ইকবালের কাব্যের সার্বজনীন আবেদন মানুষের চিরায়ত স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষাকেই শুধু জাগ্রত করেনি, দুনিয়ার পিছিয়ে পড়া মানুষের নির্জীব হৃদয়েও প্রচ- আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ধুলায় পতিত মানুষের হাত ধরে তিনি যেমন তাকে তুলে এনেছেন নীলিমার কাছাকাছি। তেমনি জড় পৃথিবীর হলুদ বিবর্ণ চোখে এঁকে দিয়েছেন বিরাট স্বপ্ন।
একজন মহৎ মানবতাবাদী কবি হিসেবে যেমন রয়েছে তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তেমনি ইসলামের অতি আধুনিক ব্যাখ্যাদাতা হিসেবেও তিনি সমান গৌরবের অধিকারী। পরাধীনতার শিকলে আটকেপড়া জাতির বুকফাটা কান্না তাঁকে বিচলিত করেছিল। তুরখাম থেকে আরাকান পর্যন্ত তিনি অভিনন্দিত হলেন গণমানুষের কবি হিসেবে। জনতার ভাষায় তিনি কবিতা লিখতেন, জনতার ভাবনা ও বেদনাকে তিনি স্থান দিতেন তার কবিতায়, আর সেই জনতাকে মুক্তির মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছানোর নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন আমৃত্যু। কুরআনুল করীমের বিশাল প্রাঙ্গণ, হাদীস শরীফ এবং ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য ছিল ইকবাল কাব্যের সারবস্তু। ইসলামকে তিনি একটি গতিহীন ধর্মের কতকগুলো সূত্র সর্বস্ব ব্যবস্থা পত্র মনে করতেন না। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল এক প্রাণপ্রাচুর্য্য উন্নত জীবনের প্রতীক। তাঁর প্রত্যয় ছিল কুরআনের আদর্শের সুষ্ঠু অনুসরণ ও অনুশীলনই বিপর্যস্ত মুসলিম প্রাণে নয়া জিন্দেগীর তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। আল্লামা ইকবাল এক আদর্শ ব্যক্তিত্ব, কেবল মুসলিম জাহানের জন্যই নয়, সমগ্র মানবতার জন্য তিনি সম্মানিত এক মহান সৃষ্টি।
ইকবালের রচনা: ইকবালকে উর্দু ভাষার কবি বলা হলেও একই সঙ্গে তিনি উর্দু ও ফার্সি ভাষার কবি। ইকবালের ১১টি কাব্য গ্রন্থের মধ্যে ৮টি ফার্সি ভাষায় ও ৩টি উর্দু ভাষায় লিখিত। তাঁর কবিতা লেখার সময়কাল ১৯০৮ থেকে ১৯২৪ খৃস্টাব্দ। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগন্থ ‘শিকওয়া’ এবং ‘জবাব-ই-শিকওয়া’। ১৯১৫ সালে আসরারে-ই-খুদী এবং ১৯১৮ সালে রমুয-ই-বেখুদী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩২ সালে ইকবালের ‘জাবিদলামা’  প্রকাশিত হয়। ফার্সি ভাষায় রচিত এই কাব্যগ্রন্থ কনিষ্ঠপুত্র জাবিদের নামে নামকরণ করেন তিনি।
আল্লামা ইকবালের জীবন ও কাব্যে জালাল উদ্দিন রুমির প্রভাব অত্যধিক। মিরাজ এ রসুল (সাঃ)-এর সঙ্গী ছিলেন জিবরাইল (আ:), আর ইকবালের ঊর্ধ্বলোকের সফরসঙ্গী মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমী। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ইকবাল কেবলমাত্র কবিতা বা কাব্য লেখকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অতিউচ্চ মানের চিন্তাশীল প্রবন্ধ লেখকও।
আল্লামা ইকবালের চিন্তার গভীরতার জন্যই ইকবালের কবিতা শুধু মুসলমানের জন্য নয়, গোটা বিশ্বমানব সমাজের জন্য হয়ে ওঠে নতুন চিন্তার দিকদর্শন। কেননা তিনি যে সংকট ও সমস্যার কথা চিন্তা করেছিলেন তা শুধু মুসলিম সমাজের নয়, বিশ্বসমাজের সমস্যা। ইকবালের অসংখ্য কাব্য, প্রবন্ধের মধ্যে ‘আসরার-ই-খুদী’কে বলা হয় ইকবালের শ্রেষ্ঠ রচনা ‘Masterpiece’। মহাকবি ফেরদৌসীর যেমন শাহ্নামা, রুমীর যেমন মসনবী, মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, রবীন্দ্রনাথের বলাকা, নজরুলের বিদ্রোহী, হাফিজের দিওয়ানা, মিল্টনের প্যারাডাইস লস্ট, হুইটম্যানের সং অফ মাইসেলফ, ইকবালের তেমনি আসরার-ই-খূদী।
রাজনৈতিক জীবন: ইকবাল ১৯০৮ সালে All India Muslim League-এর সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। ১৯১৯ এর ৩০ ডিসেম্বর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর মিত্র শক্তি কর্তৃক তুর্কীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অবরোধের প্রতিবাদে লাহোরের মুচিছোটে অনুষ্ঠিত জনসভায় ভাষণ দেন ও প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯২৬ সালে পাঞ্জাবের লেজিসলেটিব কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৭-২৮ সালের ৫ মার্চ পাঞ্জাব আইনসভার বাজেট অধিবেশনে ভাষণ দেন। ১৯২৮ সালে ২৩ ফেব্রুয়ারী ভূমি রাজস্বের উপর আয়কর উসুল করার প্রস্তাবের উপর পাঞ্জাব আইন সভায় ভাষণ দেন। ২৯ ডিসেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত All Party Muslim Confeence-এ ভাষণ এবং মুসলমানদের স্বতন্ত্র কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। ১৯৫০ এর ২ মে প্রথম নির্বাচনের দাবিতে লাহের মুচি গেটে এক জনসভায় সভাপতিত্ব করেন। ২৯ ডিসেম্বর এলাকাবাদে মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক বার্ষিক সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি স্বতন্ত্র ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রস্তাব পেশ করেন।
বৈবাহিক জীবন: ১৮৯৩ সালে ১৬ বছর বয়সে গুজরাটের সিভিল সার্জন খান বাহাদুর আতা মুহম্মদের ১৯ বছর বয়স্কা কন্যার সাথে ১৬ বছর বয়স্ক ইকবালের বিয়ে হয়। উল্লেখযোগ্য, পিতার ইচ্ছায় এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এই স্ত্রীর গর্ভে এক কন্যা ও এক পুত্রের জন্ম হয়। ১৯১৯ সালে এই বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটে।
১৯০৯ সালে লাহোরের মুচি গেটের এক কাশ্মীরী পরিবারের সরদার বেগমের সাথে ইকবালের দ্বিতীয় বিয়ে হলেও ১৯১৩ সালে এই স্ত্রীকে গৃহে তুলে আনেন। ১৯২৪ সালে এই স্ত্রীর গর্ভে জাবিদ ইকবাল জন্মগ্রহণ করেন।
১৯১২ সালে লুধিয়ানাবাসী মওলানা পরিবারের কন্যা মোখতার বিবির সাথে ইকবালের তৃতীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৪ সালে সন্তান প্রসবকালে এই স্ত্রীর মৃত্যু হয়।
১৯১০ সালে ইকবালের মাতা ও ১৯৩০ সালে তাঁর পিতা ইনতিকাল করেন। আল্লামা ইকবালের সুযোগ্য পুত্র বিচারপতি ড. জাবেদ ইকবাল ‘যিন্দারোদ’ নামে তার উর্দু জীবনী গ্রন্থ ১৯৭৯ সালে প্রকাশ করেন যা সকল মহলে সমাদৃত হয়।
মৃত্যু : ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টা ১৪ মিনিটে চতুর্দিকে ফজরের আযান ধ্বনির মধ্যে ৬০ বছরের কিছু ঊর্ধ্বে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বহু জানাযার পর হাজার হাজার ভক্ত অনুরক্তকে কাঁদিয়ে রাত পৌনে দশটার দিকে রাসূল প্রেমে বিভোর ইসলামের পুনরুজ্জাজীবনের একজন নিরাপোষ প্রবক্তার লাশ মাহী মসজিদ চত্বরে তাঁবুরে ভরে কবরে রাখা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ