ঢাকা, মঙ্গলবার 27 December 2016 ১৩ পৌষ ১৪২৩, ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একটি পিকনিক

সুমাইয়্যা সিদ্দীকা : ‘ধরণীর বুকে যত কিছু আছে সব কিছু হবে লয়
রহিবে তোমার প্রভুর আনন সর্ব মহিমাময়,
বিকার বিহীন অপার অসীম দীপ্তগরব যার
বলত প্রভুর কোন নেয়ামত করিবে অস্বীকার?’
(আর রাহমান: ২৬-২৮, অনু: মো. আব্দুল হাকিম তরফদার)
আমাদের মহান রবের নিয়ামতরাজিকে কেবল তারাই অস্বীকার করতে পারেন- যারা নিজেদের দৃশ্যমান অস্তিত্বকেই মনে করতে পারেন? মানবের জীবন ও কর্মের মাধ্যমেই রয়েছে বস্তুতান্ত্রিকতা-বহুত্ববাদিতা এবং একক স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রতি আস্থাশীলতার প্রকাশ। যে মহান সত্বা তাঁর অপ্রতিরুদ্ধ একত্ববাদের প্রমাণ এবং তথ্য সম্বলিত বাণীতে মানবম-লীকে এই আহ্বান জানিয়েছেন যে, তোমরা ভ্রমণ কর এবং পৃথিবীতে যেসব জাতি ধ্বংস হয়েছে তাদের পরিণাম প্রত্যক্ষ করো। এ বিশ্বলোকের প্রতিটি বস্তুর সৃজন ও লয়ের মাধ্যমে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু তায়ারা স্বীয়সত্বাকে দৃশ্যমান করে তুলে ধরেছেন। পবিত্র আর কুরআনে এ জন্যই তিনি বারবার মানব জাতিকে ভ্রমণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করে এই চির সত্যের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন যোগাবে।
আমরা দেখি বহুস্রষ্টায় বিশ্বাসী মানবকূলতাদের কল্পনার কাব্যিকতার মাধ্যমে একটি রূপকল্প তৈরি করে তাদেরই হাতের মাল-মশলা দ্বারা রংতুলির আঁচড়ের ব্যঞ্জনময়তায় স্রষ্টাকে দৃশ্যমান করে তুলে ধরেন। একত্ববাদীরা আসমানী তথ্যের মাধ্যমে নির্ভলশীল হয়ে থাকেন, যে স্রষ্টা বহু নন এক। অতঃপর বস্তুতান্ত্রিকরা ভাবেন এই বিশ্বপ্রকৃতিই তাদের স্রষ্টা। তারা নিজেরা প্রকৃতির দান!!স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসের এই বিভাজনের ঘাত-প্রতিঘাতে মানবজাতির ধ্বংসের গতিধারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসছে। আসুন আমরা এই বিভাজন তুরে ক্ষণিকের তরে হারিয়ে যাই প্রকৃতির মাঝে, যে প্রকৃতি স্রষ্টা নয় বরং নিজেই সৃষ্ট বস্তু। অজানাকে জানা আর অচেনাকে চেনার প্রবল আগ্রহই আমাকে নিয়ে যায় বিভিন্ন পিকনিক স্পটে।
সৌন্দর্যপ্রিয়তা মানবজাতির একটি সহজাত প্রবৃত্তি। প্রবৃত্তির এই চাহিদার অনেকটাই পূরণ করে প্রকৃতি। প্রকৃতির যেদিকে মানুষ তাকায় সেদিকেই আছে আমার মহান রবের উপস্থিতির প্রমাণ। সবুজপত্র পল্লবে ফুলের সৌন্দর্য-সৌরভে তার রং রূপের বিচিত্র সুষমায় ফলের স্বাদ-গন্ধের এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ মাধুর্যময়তায় তারই অস্তিত্বের সাক্ষ্য বহন করছে যিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি রাত ও দিনের পালাক্রমে যাওয়া আসার মধ্যে তাদের জন্য রয়েছে বহুতর নিদর্শন যারা জ্ঞানী। তারা দাঁড়িয়ে বসে শয়নে সর্বদা আল্লাহ্কে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর গঠন আকৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে (তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠে ‘হে আমাদের পালনকর্তা। এসবকিছু তুমি অনর্থক-উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করোনি।’
আকাশ রাজ্যের কথা জ্ঞানীরাই ভাবুন (আমরা যে একেবারেই ভাবিনা তা কিন্তু নয়) অনেক বড় বিষয় কিনা। এমন বড় বিষয় ছোট মাথায় আসবে কিভাবে? আমাদের মতো যৎসামান্যজ্ঞান ধারী অতি সাধারণদের জন্য এ রহস্যময় পৃথিবীতেই রয়েছে বহুতর নিদর্শন। প্রকৃতির এই নিদর্শন দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশের কিছু মানুষ ঋতুরাজ বসন্তের আগমনের পর তোরজোর শুরু করেন কোন পিকনিক স্পট থেকে ঘুরে আসার।
চলমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জনজীবন যেন স্থবির হয়ে পড়েছে। অপরদিকে ধর্মহীন সমাজব্যবস্থার চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে নীতি-নৈতিকতা-মানবিকতা। সামাজিক অবক্ষয়ের অন্ধকার গলিপথের বাঁকে বাঁকে মৃত্যুর হাতছানি। এর মাঝে শান্তিহীন নিস্তরঙ্গ মানবজীবনে একটুখানি শান্তির পরশ নিয়ে আসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক বনভোজন। এই বনভোজনকে এখন আর বনভোজন বলার কোন মানে হয় না। বনই তো নেই। বনে ভোজন হয় কিভাবে? বনভোজন শব্দটির তাৎপর্যও এখন উপেক্ষিত। তবে শহুরে বোদ্ধা মানুষেরা শহুরে ধাঁচের শব্দ তৈরি করে বাৎসরিক পিকনিক নাম দিয়ে বিভিন্ন পিকনিক স্পটে আসেন একটি দিনের জন্য শহুরে নাগরিক জীবনের জীবন যন্ত্রণাকে তুরি মেরে উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে। যাই হোক, এমনি একটি পিকনিক হয়ে গেল বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নিয়ে। বিআরটিসির তিনটি এসি বাস গাজীপুর পূবাইল সোসিও কালচারাল সেন্টারের উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের গাড়িতে আসেন। আমি বাসের জানালার পাশে বসে গ্রাম বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দৃষ্টিকে ছুটি দিলাম। অপূর্ব সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে।
ফাল্গুনের পরন্তবেলায় ঋতুরাজ বসন্তের মধ্যাহ্ন প্রকৃতি যেন অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়ে পথ শ্রান্ত-পথিকদের আহ্বান করছে প্রকৃতির মাঝে একটুখানি বিশ্রাম নিতে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট ঝোপঝাড়। লাল মাটিতে নাম না জানা সাদা সাদা বনফুলের সমারোহ। রাস্তার পাশে শিমুল ফুলের গাছে লাল শিমুল ফুল ফুটে আছে। কি ভালোই না লাগছে। মন হারিয়ে গেল সেই ছোট বেলার সোনালী দিনগুলোর মাঝে। যখন আমরা ভাই-বোনরা বাড়ির পাশের বেড়ের পাড়ের শিমুলতলা থেকে শিমুল ফুল কুড়িয়ে আনতাম। বলাই গাছে সোনালী পোকা খুঁজতাম। দাদাবাড়ির পুকুর পাড়ে কত ফুল ফুটে থাকতে দেখেছি। (এ ফুলগুলো এখন ঢাকার রাস্তার পাশে কত যত্ন করে ফোটানো হচ্ছে।) আমরা ছোট বেলায় আমাদের বাগানে দাদাবাড়ির বড় পুকুরপাড়, ব্যাপারীদের পুকুর পাড় থেকে কত ফুল তুলে আনতাম। থরে থরে কত নাম না জানা বন ফুল, লাল লাল রক্ত জবা দাদাবাড়ির মসজিদের সামনে ফুটে থাকতো। ফুল আর সবুজের সমারোহে প্রকৃতির এক অনবদ্য সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল ভোলা জেলার বুরহানুদ্দিন থানার সৈয়দ আওলিয়া গ্রাম। ধরৈ ধীরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে সৈয়দ আওলিয়া গ্রামের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হায়! সেই সৈয়দ আওলিয়া গ্রাম আজ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে তুলে দাও আকাশের চাঁদ কবিতার এ ক’টি চরণ যেন আমার ছোটবেলার হারানো দিনের প্রতিধ্বনি।
দেখে বহুদূরে ছায়া পুরি সম অতীত জীবন রেখা/অন্তরবির সোনার কিরণে নতুন বরণে লেখা/যাহাদের পানে নয়ন তুলিয়া চাহেনি কখনো ফিরে/নবীবন আভায় দেখা দেয় তারা স্মৃতি সাগরের তীরে/ সোনার তরী)
ফিরে যাচ্ছি পিকনিক স্পটের পথে। গাড়ি ছুটে চলছে পূবাইল সোসিওকালচারাল সেন্টারের উদ্দেশ্যে। গত ২৯/০২/২০১৬ সকাল ৭.৩০ মিনিটে যাত্রা শুরু হয়েছে। জীবনের পড়ন্তবেলায় আমার সোনালী অতীত যেন স্মৃতির এ্যালবামে ভর করে জীবন্ত হয়ে উঠেছে সোসিওকালচারাল সেন্টারের পথে।
মাঝে মাঝে সফর সঙ্গীদের টুকরো টুকরো কথা কানে আসছে। সাত আট বছরের মালিহার আনন্দ উল্লাস দেখে কে? ও বলছে, ‘আমি গ্রামে নানুবাড়িতে বেড়াতে গেলে নানুবাড়ি পৌঁছে আগে এক ঘণ্টা নেচে নেই।’ ছোট্ট সোনা নাদরা আর ওর আম্মু বমি করতে করতে কাহিল। গাড়ি পিকনিক স্পটে পৌঁছে গেছে। যার যার টিকিট নিয়ে আমরা পিকনিক স্পটে ঢুকে পড়লাম। সকালের নাস্তার জন্য সবাই লাইনে দাঁড়ালেন, আমার ছোট বোনের ছেলে নাঈম আহমদ এগিয়ে এসে আমার প্লেটে নাস্তা তুলে দিয়ে টেবিলে নিয়ে এলো।
 মেইনটেন্সের দায়িত্ব থাকায় নাীম তার স্ত্রী এবং দু’সন্তানকেসহ রাতেই পিকনিক স্পটে এসেছিল। দুপুরের খাবার একই পদ্ধতিতে যার যার প্লেটে তুলে নিয়ে টেবিলে বসতে হয়েছে। বিস্মিত হলাম। বলেই ফেললাম, এতো দেখছি ফাইভস্টার হোটেলের সংস্করণ। আশা করেছিলাম পিকনিক স্পটে থাকবে ফল পাখি আর সবুজের মেলা। আশাহত হতে হলো। এখানে আছে বিলাসী মানুষের বিলাসিতার প্রাচুর্য। লেক আছে, লেকের পানিতে ভাসছে পায়ে চালানো বোট। নিঃসর্গ প্রকৃতির রহস্যময়তা এখানে অনুপস্থিত।
সবাই ঘুরে ফিরে পিকনিক স্পট দেখছেন। আমি ভার্সিটির ফিমেল সেকশনের সহকারী রেজিস্টার গুলশান আরা ম্যাডামের সাথে লেকের পাড়ে ঘাটলায় বসে আছি। একে একে অনেকেই এখানে এসে বসলেন, এখানে বসে ভাবছিলাম, কবি গোলাম মোস্তফার মনে প্রকৃতির রহস্যময়তার পানে তাকিয়ে হয়তোবা এ প্রশ্ন উদয় হয়েছিল:
সকলি নিষ্ফল হবে সলি কি হবে ভুল দেখা/সকলি কি স্বপ্নময় মায়াময় ছায়া দিয়ে লেখা/সকলি ছাড়িয়ে যাব এ জগৎ পরে রবে পিছু/আর আমি দু’নয়নে এ বিশ্বের হেরিব না কিছু/মরণ কি টেনে দেবে আঁখি কোন অন্ধ আবরণ/এপার ওপার মাঝে রবে নাকো কোনই বন্ধন/
আসলে বিশ্বের চিরায়ত অধীন হয়ে একদিন আমরা সবাই চলে যাবো সেই না ফেরার দেশে। এ পৃথিবীর সকল ধ্বংসশীল বস্তুর মতো একদিন আমাদের অস্তিত্বও কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। যেমন: কুমিল্লা কোটবাড়ী-ঈসা খাঁর রাজধানী সোনারগাঁ বেড়াতে এসে এমনি ভাবনা আমাকে পেয়ে বসত। একদিন যাদের পদচারণায় মুখর ছিল এই এলাকা অথচ আজ তারা প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে নিজেরাই জাদুঘরে আটক হয়ে আছেন। যেমন: বুলবুল পাখি সারাদিন মালির বাগানে অবস্থান করে সন্ধ্যাবেলায় মালিকে ডেকে বলছে,
‘নে নে মালি তোর বাগান তুই নিয়ে নে
আমি আমার নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাচ্ছি’
(আল্লামা ইকবাল)
ফিমেল টিচারদের কেউ কেউ বোটে চড়ে লেকের পানিতে ভাসছেন। এখানে একজন ফিমেল টিচারের কথা উল্লেখ না করলে মনে হবে অনেক কিছুই বাদ পড়ে গেল। সে আমাদের বিজনেস ম্যাডাম মেহনাজ হক। প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা ম্যাডাম মেহনাজ হক স্টুডেন্ট ট্যুরেও তার দক্ষতা-যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এখানেও তাই। দেখলাম ভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান স্যার তার অনেক প্রশংসা করলেন। এবারই প্রথম তিনি এমনি ধরনের প্রোগ্রামে এসেছেন। বিকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরে পুরস্কার বিতরণ করলেন বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান স্যার ও ভাইস চ্যান্সেলর স্যার। বৈকালিক নাস্তায় নতুনত্বের ছোঁয়া ছিল। চিতই পিঠা ভাপা পিঠা আর চা। বেশ ভালো লাগলো। শীত শেষ হলেও শীতের আমেজ যেন ধরে রেখেছে এই বৈকালিক নাশতার আয়োজন। এবার ফেরার পালা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ