ঢাকা, মঙ্গলবার 27 December 2016 ১৩ পৌষ ১৪২৩, ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কুমারখালীর অধিকাংশ সড়কের বেহালদশায় যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ-ভোগান্তি

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) : ভাঙ্গা রাস্তার ছবিটি উপজেলার জোতমোড়া গ্রাম থেকে তোলা -সংগ্রাম

মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা : কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার অধিকাংশ সড়ক জরাজীর্ণ ও বেহালদশা হওয়ায় যানবাহন চলাচলে চরম ভোগান্তি আর দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ভাঙ্গাচোরা এসব সড়কে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা । অন্যদিকে ইচ্ছেমত বাড়ানো হচ্ছে যানবাহনের ভাড়া।
প্রথম শ্রেণির খেতাব পাওয়া প্রাচীন পৌর শহরের বেশ কিছু সড়কসহ উপজেলার প্রত্যেকটি ইউনিয়নের প্রধান সড়কগুলোর অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে চলাচল অসম্ভব হয়ে উঠেছে। গত বর্ষার পর থেকে কোন কোন সড়কে যান চলাচল অনেকটা বন্দ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। মূলত দীর্ঘদিন যাবত সংস্কারের অভাব আর নামমাত্র সংস্কারের কারণে সড়কগুলোর বেহালদশা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিগত ৫ থেকে ১০ বছরে কোথাও কোথাও একেবারে সংস্কার না হওয়ায় রাস্তাগুলোতে চলাচল করাই দায় হয়েছে স্থানীয় এলাকাবাসীর।
কুমারখালী পৌরসভার তরুণ মোড় হতে খোকন মোড় ভায়া ঝাউতলা হয়ে ফুলতলা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তিনটির অবস্থা খুবই খারাপ। অন্যদিকে গণমোড় থেকে তমিজ মোড়, কালীবাড়ী হতে কাজীপাড়া প্রধান সড়ক, জে এন স্কুলের পাশের সড়ক, বড় মসজিদ হতে ষ্টেশন হয়ে কলেজ পর্যন্ত, পৌর বাস টার্মিনাল হতে ষ্টেশন মসজিদ সড়ক এবং উপজেলা সড়কের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।
 পৌর এলাকার বাইরে নন্দলালপুর, কয়া, চাঁদপুর, চাপড়া, সদকী, যদুবয়রা ও বাগুলাট ইউনিয়নগুলোর অধিকাংশ সড়ক বর্তমানে এতটাই শোচনীয় যে চলাচল অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইউনিয়নগুলোর মধ্যে নন্দলালপুর, চাপড়া ও কয়া ইউপির অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। নন্দলালপুরের আলাউদ্দিন নগর হতে নন্দলালপুর বাজার, ক্লিক মোড় হতে রেলগেট, আলাউদ্দিন নগর হতে সদরপুর ও শিলাইদহ সড়ক বর্তমানে বড় বড় গর্তে পরিনত হয়েছে। গড়াই তীরবর্তী যদুবয়রা ইউনিয়নের মধুপুর-চাঁদপুর সড়ক, এনায়েতপুর বাজার থেকে চাপড়া পর্যন্ত জিকে ক্যানেল সড়কে শত শত খানাখন্দ প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠেছে। চৌরঙ্গী বাজার হতে নাতুড়িয়া ও এনায়েতপুর পর্যন্ত সড়ক দুইটিও চলাচলে প্রায় অনুপোযোগী হয়ে উঠেছে। কয়া ইউপির গট্টিয়া গড়াই নদীর ঘাট হতে শিলাইদহ কুঠিবাড়ী এবং কয়া মোড় হতে হাতি সাঁকো পর্যন্ত সড়ক ও পাশর্^ সড়কগুলো বর্তমানে বেহালদশায় পরিনত হয়েছে। সদকী ইউনিয়নের অধিকাংশ সড়কই খানাখন্দে ভরপুর। বিশেষ করে জিলাপীতলা-সদকী, বাটিকামারা-মহিষাখোলা, আমতলা-মূলগ্রাম-পাথরবাড়ীয়া সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় দূর্ঘটনা বাড়ছে। শিলাইদহ ইউনিয়নের খোরশেদপুর বাজার থেকে মাঝগ্রাম-বেলঘোরিয়া সড়কগুলো জরাজীর্ণ ও বেহালদশা হওয়ায় যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে ।
গড়াই নদীর ওপারের দক্ষিণ এলাকার ইউনিয়নগুলো সব সময়ই অবহেলিত হওয়ায় সড়কগুলোর অবস্থা দীর্ঘদিন যাবত শোচনীয় হয়ে আছে। বিশেষ করে বাগুলাট, চাপড়া, চাঁদপুর ও পান্টি ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তাঘাটগুলোতে ভারী যানবাহন তো দুরের কথা মটর সাইকেলও ঠিকমত চলাচল করতে পারছেনা। পদ্মা পারের পাবনা শহর লাগোয়া বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন চরসাদীপুরেরও একই অবস্থা বিরাজমান।
বর্তমান সরকারের গত শাসনামলে কিছু কিছু সড়কে কার্পেটিং ও পাকাকরণ করা হলেও নতুন করে গত কয়ে বছরে ২/৪ ছাড় তেমন কোন সড়ক উন্নয়নের কাজ কিংবা উদ্বোধন দেখা যাচ্ছেনা। পাকা সড়কের পাশাপাশি বহু কাঁচা সড়কের অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। সামান্য বৃষ্টিতেই উপজেলার সর্বত্র কাঁচা-পাকা সড়কের বেহাল অবস্থার কারনে সাধারণ জনগনের ভোগান্তি আর দূর্ভোগের শেষ নেই। প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনা ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। রাস্তার মাঝে যানবাহন বিকল হয়ে চলাচলে হচ্ছে বিঘ্ন। এদিকে যানবাহন ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া এবং রাস্তা খারাপের অজুহাতে ভ্যান-রিকসা, নসিমন, করিমন, অটোবাইক, সিএনজির চালকেরা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে ১বছর আগে যেখানে ২০ টাকা ভাড়া ছিল, সেখানে এখন অতিরিক্ত ৫/১০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে যাত্রী সাধারণের। উপজেলার মাঝগ্রামের বাসিন্দা তাঁতবস্ত্র শ্রমিক আরমান আলী জানান, ১৪ বছর যাবত শহরে যেয়ে কাজ করি, গত ২/৪ বছর রাস্তার অবস্থা এত খারাপ যে ভ্যানে উঠলে বার বার নামতে হয়, ভোগান্তির শেষ নেই। ভাড়াও বেড়েছে ১বছরে দ্বিগুণ।
সমগ্র কুমারখালী উপজেলায় পাকা ও কাচা সড়ক কত কিলোমিটার আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল দপÍরে নেই। অসংখ্য ভাঙ্গাচোরা, খানাখন্দ-গর্তে ভরা সড়কগুলোর এমন বেহালদশা বিরাজ করার ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুস সামাদ জানান, উপজেলার বিভিন্ন রাস্তার উন্নয়নের জন্য ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে বৃহত্তর কুষ্টিয়া উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার বিভিন্ন রাস্তায় পাকাকরণ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রতি সংসদ সদস্যদের জন্য বিশেষ ভাবে বরাদ্ধ ২০ কোটি টাকার আই আর আই ডি পি-২ প্রকল্পে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ২৪টি রাস্তায় ১৯ কিলোমিটার পাকাকরনের কাজ বাস্তবায়নাধীন, যার ব্যয় হচ্ছে ১২ কোটি টাকা। এছাড়াও একই প্রকল্পে আরো ৮টি রাস্তার টেন্ডারের প্রস্তুতি চলছে। বরাদ্ধ ও টেন্ডার হলেই অনেক রাস্তার কাজ শুরু হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আফজাল হুসাইন এব্যাপারে বলেন, রাস্তাঘাটের সমস্যা অনেক, সে তুলনায় বরাদ্ধ খুবই নগন্য, তারপরও কিছু কিছু কাজ করা হচ্ছে। কুমারখালী পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী শামসুজ্জামান অরুন জানান, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও নিজস্ব আয় খুবই কম, আয় থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাসই ঠিকমত দেওয়া সম্ভব হয়না, প্রায় ২বছর কর্মচারীদের বেতন বকেয়া পড়ে রয়েছে, সেক্ষেত্রে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন করা অত্যন্ত দূরহ। সরকার প্রতি বছর সড়ক উন্নয়নের জন্য যে বরাদ্ধ দেয় তা দিয়ে ২৫% রাস্তাও মেরামত সম্ভব হয়না বলে তিনি জানান।
সম্প্রতি কুমারখালীতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ি থামিয়ে অনতিবিলম্বে কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী সড়কসহ সব সড়কের প্রয়োজনীয় উন্নয়নের দাবী জানানো হয়েছে। কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় তাঁর গাড়ি বহরের সামনে গিয়ে অবস্থান নিয়ে গাড়ি থামানোর সংকেত দেন কুমারখালী পৌর মেয়র সামছুজ্জামান অরুন। সে সময় প্রধান প্রকৌশলীর গাড়ি বহরে থাকা নিরাপত্তাকর্মীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা দ্রুত সড়কের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা পৌর মেয়রের সাথে কথা বলেন। পরে গাড়ি থেকে নেমে আসেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী শাহ্ ইবনে আলম হাসান। এ সময় পৌর মেয়র সামছুজ্জামান অরুন প্রধান প্রকৌশলীকে কুমারখালীর সমস্ত সড়কের দৈন্যদশার করুন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে সব সড়কের উন্নয়নের দাবি জানান। সমগ্র উপজেলার রাস্তায় চলাচলে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি আর দুর্ভোগের শিকার সাধারণ জনগণ জরুরী ভিত্তিতে সড়কগুলোর সংস্কার-মেরামত ও উন্নয়নের আশা করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ