ঢাকা, বুধবার 28 December 2016 ১৪ পৌষ ১৪২৩, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজনৈতিক ভূমিকম্পের বছরের কয়েকটি চিত্র

২৭ ডিসেম্বর, গার্ডিয়ান : আলেপ্পোর পাঁচবছরের শিশু ওমরান দাকনিশের ছবি বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিলেও সিরিয়া সঙ্কট তাতে থামেনি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আইএসের বিস্তার সঙ্কুচিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, তারপরও বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ঘটছে জঙ্গি হামলার ঘটনা।
২০১৬ সালে এই সব কিছু ছাপিয়ে গণমানুষের রাজনৈতিক ভাবনায় বড় পরিবর্তনের ইংগিত দিচ্ছে ব্রেক্সিট ও কলম্বিয়ার গণভোট, ইউরোপে উগ্র ডানের অব্যাহত উত্থান আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
এই প্রবণতাকে ‘আম জনতার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামো প্রত্যাখ্যানের প্রকাশ’ চিহ্নিত করেছেন কেউ কেউ। বার্লিন প্রাচীরের পতনের বছর ১৯৮৯ কে ‘মুক্ত গণতন্ত্রের বিকাশের বছর’ হিসেবে ধরে ২০১৬ সালের পৃথিবীকে ঠিক তার উল্টো অবস্থানে দেখতে পাচ্ছেন ব্রিটিশ রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার টিমোথি গার্ডন অ্যাশ।
যুক্তরাজ্যের ইংরেজি দৈনিক গার্ডিয়ান ২০১৬ সালকে চিহ্নিত করেছে ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্পের বছর’ হিসেবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমার পাশাপাশি এ বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনকে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে দেখেছে বিশ্ব। অন্যদিকে এশিয়ায় চীনের প্রভাব অব্যাহতভাবে বাড়ছে।
ফাঁস হওয়া হাজারও দলিলপত্রে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের করফাঁকির যে খবর ২০১৬ সালে মানুষ পেয়েছে, তার মাত্রা ভূমিকম্পের চেয়ে কম ছিল না। মাদক কেলেঙ্কারির কারণে রাশিয়ার ক্রীড়াবিদদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল এ বছর ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ঘূর্ণিঝড়-বন্যা-ভূমিকম্পের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বিভিন্ন ঘটনা এ বছরও সংবাদ শিরোনামে এসেছে। বিভিন্ন দেশে সংঘাতে প্রাণ গেছে বহু মানুষের। বছরের শুরুতে জিকা ভাইরাস চোখ রাঙালেও বছরের শেষ প্রান্তে এসে প্রকোপ কমেছে তার। বছরের শেষ দিকে এসে ডলারের অবস্থান শক্তিশালী হতে শুরু করেছে; জ্বালানি তেলের দামও একটু একটু করে বাড়ছে, তেলনির্ভর ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির দেশগুলোকে দেখাচ্ছে আশার আলো।
এ বছরই একজন নতুন মহাসচিব পেয়েছে জাতিসংঘ। পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘ প্রধান হিসেবে বিশ্বকে শান্তির পথে এগিয়ে নিতে কতোটা সাফল্য পাবেন- তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী পাঁচটি বছর।
ট্রাম্প চমক : এ বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন নিউ ইয়র্কের ধনকুবের ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি রীতিমত ভূমিকম্প ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচনের আগে অভিবাসী ও নারীদের নিয়ে নানান মন্তব্যের জন্য সমালোচিত ট্রাম্পের পরাজয়ের ইঙ্গিত ছিল গণমাধ্যমগুলোর সব জরিপে। ডেমোক্রেটিক প্রার্থী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি তাকে সহজেই হারাবেন বলে ধারণা করা হলেও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য ফিরিয়ে আনার জিগির তুলে পাশার দান উল্টে দিয়েছেন এ রিয়েল এস্টেট মোগলই।
পপুলার ভোটে হিলারির চেয়ে ২৮ লাখ ভোট কম পেলেও হোয়াইট হাউজে যেতে প্রয়োজনীয় ইলেকটোরাল ভোট ঠিকই জিতে নেন ট্রাম্প।
যুক্তরাজ্যর লেবার নেতা জেরেমি করবিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটের ফলকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যানের প্রতীক হিসেবে।
ট্রাম্পের জয় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প তার পরবর্তী প্রশাসনের জন্য দলের মধ্যেও কট্টরপন্থি হিসেবে পরিচিতদের বেছে নিয়ে সেই ধারণার পালে আরও হাওয়া দিয়েছেন।
ক্ষমতায় গেলে ট্রাম্প প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সমর্থন তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন; তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রক্রিয়া কঠোর করা, মুসলিম অভিবাসীদের প্রবেশে বাধা দেয়া। আছে মেক্সিকোর সঙ্গে দেয়াল নির্মাণেরও ঘোষণা। তবে নির্বাচনে জেতার পর এসব বিষয়ে ‘নরম সুর’ শোনা গেছে তার কণ্ঠে।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও এবার আরও কয়েকটি দেশের প্রেসিডেন্টরা খবরের পাতায় জায়গা করে নিয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রৌসেফ ও দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক জিউন হাই। দুজনকেই দুর্নীতির অভিযোগে অভিশংসিত হতে হয়েছে।
বিচ্ছেদের ইশতেহার : প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাখ্যানের আরেকটি বড় নজির ছিল এবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে যুক্তরাজ্যের গণভোটের ফল। সব প্রচারমাধ্যমের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণ করে, শক্তিশালী বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর আহ্বান উপেক্ষা করে যুক্তরাজ্যের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার (ব্রেক্সিট) পক্ষে রায় দেয়।
ভোটের মানচিত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের উত্তর অংশ ইইউতে থাকার পক্ষে থাকলেও দক্ষিণের প্রায় পুরো অংশ ছিল জোট ছাড়ার পক্ষে। এজন্য ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বিচ্ছেদপন্থিরা জয়ী হলেও স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে দেখা গেছে উল্টো চিত্র।
ভোটের আগে বেক্সিটপন্থিরা বলছিল, অভিবাসীদের ব্রিটেনে আসা বন্ধ করতেই মনোযোগ তাদের। বিশেষ করে ইউরোপ থেকে কেউ যাতে অবাধে যুক্তরাজ্যে এসে বসবাস করতে না পারে। আর ‘রিমেইন গ্রুপ’ এর ভাষ্য ছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে এলে ৫০ কোটি মানুষের বাজার হারাবে বিটেন। তাতে অর্থনীতিতে আবার ‘ধস’ নামবে, যা এক যুগেও কাটিয়ে ওঠা যাবে না।
ব্রেক্সিটের পর পাউন্ডের দর ১০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়, যা ১৯৮৫ সালের পর ছিল সর্বনিম্ন। শেয়ার বাজারের সূচকও কমে যায়, কমে যায় জ্বালানি তেলের দামও।
 ভোটের পর টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যান ডেভিড ক্যামেরন, দায়িত্বে আসেন টেরিজা মে।
গণভোটে অপ্রত্যাশিত ফল দেখা যায় ফার্ক গেরিলাদের সঙ্গে কলম্বিয়া সরকারের বহু প্রত্যাশিত শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রেও। পাঁচ দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানে ওই চুক্তিও গণভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে নতুন এক শান্তিচুক্তি অনুমোদন করে দেশটির সিনেট।
কিউবার মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তিটি আন্তর্জাতিক মহলেও সাড়া ফেলে। চুক্তির জন্য এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারেভূষিত হন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল সান্তোস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ