ঢাকা, রোববার 01 January 2017, ১৮ পৌষ ১৪২৩, ২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণতন্ত্র শিকলেই বাঁধা ছিল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতা শিকলে বাঁধা অবস্থায় আরও একটি বছর পার করলো দেশের মানুষ। স্বাধীনতার প্রায় তিন যুগ পরও সর্বত্র বাকশালের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টাও চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের প্রতিটি সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকার দেশে পাঁচ বছর শাসন করতে পারবে, দেশ পরিচালনা করতে পারবে, আর সেই সরকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কোনো নির্বাচন দিতেপারবেনা-এটা রাজনীতিবিদদেরদেউলিয়াপনা। তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে বিকশিত করার জন্য গণতান্ত্রিক সরকারের প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সরকারের স্থলে অগণতান্ত্রিক সরকার সমাধান নয়। এটি রাজনীতিবিদদের দেউলিয়াপনা’। এদিকে অবৈধ ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে গেল বছরও বিরোধী নেতাকর্মীদের উপর চালানো হয় নির্যাতনের স্টীমরোলার।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে আছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ।  আমাদের নেতা-নেত্রীরা বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সভা-সমাবেশে প্রায়ই বাক্যটি আওড়ালেও তারা সেটি ঘূর্ণাক্ষরেও মান্য করেন না। সংবিধানে সবারই সভা-সমাবেশ করার অধিকারের কথা বলা আছে। বাক স্বাধীনতার কথা বলা আছে। কিন্তু সেগুলো কি এখন কার্যকর আছে? গত কয়েক বছরের সার্বিক অবস্থা দেখলে মনে হবে, দেশে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার নেই। নির্বাচন মানেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’। প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই দলীয়করণ। দেশে শুধু গণতন্ত্রই অনুপস্থিত নয়, কোথাও কারো কোনো নিরাপত্তা নেই। যেখানে সেখানে পড়ে আছে লাশ। প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে নতুন কেউ। এসবের বিচারও হচ্ছেনা। এক কথায় ক্ষমতার নিষ্ঠুর আচরণে জর্জরিত দেশ। তাইতো সর্বশেষ মহান বিজয় দিবস পালনকালে জাতীয় স্মৃতিসৌধে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতাই বলেছেন, দীর্ঘ প্রায় চার যুগ পরেও স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারিনি। যে উদ্দেশ্যে দেশের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধ করেছেন সেটি আজ অনুপস্থিত। দেশে আজ বাকশালী শাসন চলছে। 
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অনির্বাচিত ও অবৈধ সরকার বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত করছে। আজ গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।  গত ২৫ ডিসেম্বর খেলাফত মজলিশের এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।  মির্জা ফখরুল বলেন, এই সরকার রাষ্ট্রের সব স্তম্ভ বা পিলারগুলোকে শেষ করে ফেলেছে। কথাটা আমার একার না। প্রধান বিচারপতিও বলেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করছে। যেটাকে বলা হয়- কে কার থেকে বড় সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ক্ষমতাকে অবৈধভাবে কুক্ষিতগত করে রাখার জন্যে বিভিন্ন কলাকৌশল করে বিরোধী দলকে দমন করে, নির্মূল করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। আমাদেরকে এটা রুখে দিতে হবে। তিনি বলেন, জাতি আরো একটি শ্বাসরুদ্ধকর বছর শেষ করেছে।
২০০৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আ’লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী জোটের সভা-সমাবেশের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আসতে শুরু করে। ক্রমান্বয়ে সেটি আইন করেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি ছাড়া কোনো ধরণের সভা-সমাবেশ করা যাবেনা। মূলত বিরোধী জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে বন্ধ করতেই এটা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতায় এসে শুধু সভা-সমাবেশের নিষেধাজ্ঞা আসেনি, বিরোধী নেতাকর্মীদের সহ্য করতে হয়েছে স্মরণকালের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী অসহনীয় নির্যাতন। হত্যা, গুম যেন নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পরিবারের সদস্যদের আপনজন হারিয়ে অবিরাম চোখের পানি ফেলতে হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে বিনাভোটের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে একইভাবে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতনের স্টীমরোলার অব্যাহত আছে। মামলা-আর গ্রেফতারের গতিও বেড়েছে সমানন্তরাল ভাবে। গত বছরও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। রাজপথে কোনো ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও বিএনপি-জামায়াতের সিনিয়র নেতাদের সময় কাটছে আদালত এলাকাতেই। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও রেহাই পাচ্ছেন না সরকারের রোষানল থেকে। ক্ষমতাসীনদের হাত থেকে ৮০ বছরের বয়স্ক প্রবীণ রাজনীতিবিদও রেহাই পাচ্ছেনা। তাদের অপরাধ একটাই, তারা ক্ষমতাসীনদের অন্যায়, অত্যাচারসহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
অভিযোগে প্রকাশ, গেল আট বছর ধরে দেশে নামে মাত্র গণতন্ত্র চলছে। বিরোধী জোটকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছেনা। দেশের হারানো গণতন্ত্র এবং জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় জনগণ বারবার রাজপথে নেমে এসেছে। আবারো তারা অপেক্ষায় রয়েছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোট নেতা বেগম খালেদা জিয়া বারবার চলমান সংকট নিরসনে আলোচনার আহবান জানিয়ে আসছেন। তিনি বলছেন, বিএনপি বা ২০ দল শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে বিশ্বাসী। এ জন্য একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের কোনো বিকল্প নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাধীনতার পরে আর দেখা যায়নি। অতীতের কয়েক বছরের ন্যায় গেল বছরটিতেও দেশের গণতন্ত্র ছিল শিকলে বাঁধা। জামায়াত-শিবিরকে তো দেখা মাত্র গুলী করা হচ্ছে। সন্দেহ হলেই করা হচ্ছে গ্রেফতার। যাকে তাকে জঙ্গি বানিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছে। জঙ্গিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার যে দাবি সবার পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে সেটি এখন উপেক্ষিত। একটি বিশেষ মহলকে খুশি করার জন্য সরকার জঙ্গি ইস্যুটাকে জিইয়ে রাখতে চাইছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৫ সালে যেভাবে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি, ঠিক গেল বছরেও বিরোধী পক্ষের সাথে একই আচরণ করেছে। বরং সরকারের আচরণ এতটাই নৃশংস হয়ে উঠেছে যে, ঘরোয়া অনুষ্ঠানও করতে দেয়া হয়নি। অনুমতি নিয়েও বিএনপি ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোকে সমাবেশ করতে বাধা দেয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে সভা-সমাবেশ করার অধিকার সবার থাকলেও সেটি গত বছরও ছিল শুধুই কাগুজে-কলমে। বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীনদের বাকশালী আচরণের কাছে নত শিকার করতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষদের। গেল বছরটিতেও যারা সরকারের অন্যায়ের বিরোধীতা করেছে তাদের বিরুদ্ধে নেমে এসেছে নির্যাতনের স্টীম রোলার। গণতন্ত্রের নামে অভিনব স্বৈরাচারী কায়দায় নির্বাচন করে শাসকরা দেশের মসনদ দখল করেছে। এরপর থেকে আটটি বছর পার হলো গণতন্ত্রমনা মানুষদের জন্য ক্লিষ্টদায়ক হয়ে। বাংলাদেশ আজ গণতন্ত্রের পরিচয় হারাতে বসেছে।
বিশ্লেষকদের অভিযোগ, অতীতের বছরের ন্যায় গেল বছরেও আইন ও অধিকারের কোনো তোয়াক্কা না করে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গুলী, গুম, হত্যা ও দমন-পীড়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে ক্ষমতাসীন আ’লীগ। বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে করুণ ও ক্ষমতাসীনদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল একটি দলে পরিণত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনা এক অনুগত গণমাধ্যমকে সফলভাবে তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য সক্রিয় রাখতে পারছেন। পঞ্চদশ সংশোধনী করে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম ও বহাল রাখতে পারছেন তিনি। তার লক্ষ্যই ছিল ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করা। এই বাস্তবতার আলোকেই পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ যত স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোই জোর করে দখলে নিয়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে সরকারি দল যেভাবে বিরোধী প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের উপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে গণগ্রেফতার করেছে, প্রশাসন যেভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ ভূমিকায় অবতীর্ণ, নির্বাচন কমিশন যেখানে অসহায়, সেখানে ভোটের হিসেবে যে কি হবে তা আগেই নিশ্চিত করে বলা গেছে। 
দেশের মানুষের জন্য ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে রইল। ৫ জানুয়ারির একতরফা বাকশালী কায়দায় অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন বছর পূর্তি হতে আর মাত্র কয়েকটি দিন বাকি। দেশে-বিদেশে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতারা একে নিয়মরক্ষার নির্বাচন বললেও এখন তারা ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলে দেশে আবারো বাকশালের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এরই মধ্যে জনগণ তাদের ভোটাধিকার হারিয়েছে। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত তিন সিটি নির্বাচনেও আরেকটি ভোট ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে শাসক দল। স্বাধীনতার পরে এমন ভোট কেউই দেখেনি। সকাল ১০টার মধ্যে ভোট শেষ। অস্ত্রের মুখে প্রতিপক্ষের লোকদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর পরবর্তী নির্বাচনগুলোও হয়েছে একই কায়দায়। নির্বাচন মানেই সরকারি দল।
দেশের গণতন্ত্র এখন নির্বাসিত। বিরোধী মতের সভা-সমাবেশ করার অধিকার এখন আর নেই। সরকারের সমালোচনা করলেই নেমে আসে নির্যাতন। এমনকি হত্যা-গুমের শিকারও হতে হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানের ভাষায়, বর্তমানে দেশে অনুদার গণতন্ত্র বিরাজ করছে। দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। এ সব আসনের ভোটাররা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। এ সমস্যা দিন দিন জটিল হচ্ছে। সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে কি থাকবে না, এটা কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। এটা ভোটারদের বিষয়। গণভোটের মাধ্যমে ভোটাররাই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। বাংলাদেশে আজ শুধু গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাই বিপন্ন হয়নি, বিপন্ন হয়েছে জনগণের জানমালও।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী আক্রমণের শিকার দেশের বিচার-আদালতও। বাকশাল কায়েমের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ দেশের আদালতকে মেঠো আদালতে পরিণত করেছে। বাকশাল নেই। কিন্তু গণতন্ত্র হত্যার চেতনাটি মরেনি। তা দারুণভাবে বেঁচে আছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও ক্যাডারদের মাঝে। আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে আটকের পর রিমান্ড ও নির্যাতনের বিষয়টি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। নিরীহ-নিরপরাধ লোকজনকে আটকের পরই জিজ্ঞাসাবাদের নামে নেয়া হয় রিমান্ডে (হেফাজতে)। যে অর্থে রিমান্ডে নেয়া হয়, প্রকৃতপক্ষে আইনশৃংখলা বাহিনী তা না করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে নিরপরাধ মানুষকে। শুধু তাই নয়, প্রথম দফার পর গত তিন বছরও বর্তমান অবৈধ শাসনামলেও লোকজনকে আটকের পর রিমান্ডে নিয়ে দিনের পর দিন আটক রেখে নির্মম নির্যাতন, হত্যার হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ঘায়েল করার অপচেষ্টা করা হয়েছে বলে বহু অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের দিনের পর দিন রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি দলের একগুয়েমীর কারণে দেশে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রাজনীতির আকাশে শুধুই অশনি সঙ্কেত। মানুষের মনে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস ও উদ্বেগ-উৎকন্ঠা কোন দিকে যাচ্ছে দেশ, কী হতে যাচ্ছে দেশে। সরকার বেপরোয়া হয়ে অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন চালাচ্ছে এবং এটাকেই তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। দেশের কোথাও কিছু ঘটলে সরকার বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অকারণে হয়রানি, মামলা ও গ্রেফতার করে চরম হেনস্থা করছে। যার প্রমাণ গেল বছরেও দেখা গেছে। সংবাদ মাধ্যমে দেখা গেছে কাদের হাতে অস্ত্র ছিল, কারা সন্ত্রাস করছে। কিন্তু তারপরও সরকার মামলা দিচ্ছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এখন অনেকেই বলছেন, ছাত্রলীগের চাপাতির আঘাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্ষতবিক্ষত। বিজয়ের মাসেও প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের দৃষ্টির সীমানায় তারা সন্ত্রাস করেছে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রশিবিরের উপর তারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে তারা এই হামলার পথ বেঁচে নেয়। সিলেটে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের হামলায় বন্ধ হলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। একইভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিদায়ী বছরেও বন্ধ করা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের মারামারির কারণে।
সূত্র মতে, গেল বছরেও বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে। পাশাপাশি সরকারদলীয় সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র হামলায় আহত হয়েছেন হাজার হাজার নেতা-কর্মী। হাতুড়ি পেটায় ক্ষত বিক্ষত হয়েছেন অনেকে। মামলায় জর্জরিত করা হয়েছে শীর্ষ নেতা থেকে সাধারণ কর্মীকে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযানের নামে হাজার হাজার বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনো সেটি অব্যাহত আছে। দলীয় কার্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, কোচিং সেন্টার, ফসলের ক্ষেত কোনো কিছুই তাদের রোষানল থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। লুটপাট করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। বিরোধী দলের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে প্রশাসনকে ব্যবহার করা হয়েছে অবলীলায়। কিছুক্ষেত্রে পুলিশ-ছাত্রলীগ যৌথভাবে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। শুধু তাই নয় ‘৭২-৭৫-এর ধারায় দেশে আবারো শুরু হয় রাজনৈতিক নেতাদের গুম করার ঘটনা। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী, ছাত্রশিবিরের নেতা আল মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহসহ বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মীকে গুম করা হয়। যাদের লাশও পায়নি তাদের স্বজনরা। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় ছাত্রলীগ নিজেরাও ভাগবাটোয়ারা নিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে এক ছাত্রলীগ নেতা। যার একাধিকবার ময়নাতদন্ত হয়েছে। এভাবে দেশব্যাপী তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যাহত রাখে।
২০০৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর এক ‘ডিজিটাল নির্বাচনের মাধ্যমে মহাজোট সরকার এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্নের রাজভবনে সুবিশাল আসন জুড়ে সরকার গঠন করে। দিনমজুর, রিকশাচালক থেকে নিয়ে সচ্ছলতায় ভরপুর এমন মানুষ পর্যন্তও আজ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বিরামহীন মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মাথায় হাত রাখতে বসেছে। বিদ্যালয়, কলেজ, ভার্সিটি তথা শিক্ষাঙ্গনে কলম ছেড়ে অস্ত্র নিয়ে নির্দ্বিধায় কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় ছাত্রলীগ নামধারী ক্যাডাররা। এই সরকার ইসলামী রাজনীতি বন্ধের নামে ‘ইসলাম বন্ধের হীন পাঁয়তারা অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার হোক এটা এদেশের স্বাধীনতাকামী, শান্তিপ্রিয় জনগণের দাবি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর নামে দেশের নামকরা আলেম-উলামাকে হয়রানি করা, তাদের ওপর মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন মামলা দায়ের করা, এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষ কখনো বরদাস্ত করবে না। মাথায় টুপি আর মুখে দাড়ি দেখলেই মনে করে ওরা জঙ্গি কিংবা জামায়াত-শিবিরকর্মী, তাইতো অহেতুক সন্দেহে ধরে নিয়ে কারাগারে পুরছে আর বেদম পিটুনি দিচ্ছে অনেক নিরীহ, নিরপরাধ মানুষকে। বিএনপি চেয়ারপার্সন মুক্তিযোদ্ধা দলের উদ্যোগে আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনায় বলেছেন, আ,লীগই যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকারদের লালন পালন করছে। তাদের মন্ত্রী বানিয়েছে। তাদের অনেক যুদ্ধাপরাধী রয়েছে।
আজ সরকারের অপকর্মের প্রতিবাদে মুখর সারাদেশ। আমজনতার মুখেও শুনা যাচ্ছে সরকার হটাও স্লোগান। ডিজিটাল বাংলাদেশ চাই না। নেমে পড়ুন গদি থেকে। ছাড়ুন গদি। নইলে টেনে-হেঁচড়ে নামাতে বাধ্য হবো। ২০১৫ সালে সরকার যেভাবে রাজনৈতিক পেশিশক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি বিরোধী মতকে দমনের পথ বেঁচে নিয়েছে তা ২০১৬ সালেও অব্যাহত রেখেছে। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে একাধিকবার সশস্ত্র হামলার শিকার হয়েছেন বিএনপি প্রধান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার প্রচারণা বন্ধে হামলা চালানো হয়েছে। এবার খালেদা জিয়া যেন প্রচারণা চালাতে না পারেন সেজন্য নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে সরকার ৭২ ঘন্টা আগেই বহিরাগতদের প্রচার প্রচারণা বন্ধের আইন করেছে। চলতি বছরও এমন কোন দিন নেই যে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছেনা। সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন যাতে না করতে পারে সেজন্য এই সশস্ত্র সন্ত্রাসের পথ বেঁচে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আ’লীগ। তাদের আচরণে সাধারণ মানুষ আবার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে।
২০১৫ সালের শুরুতে রাজনৈতিক উত্তপ্ত থাকলেও গেল বছরটি ছিল শান্ত। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজপথের আন্দোলন থেকে বিরত রয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুমতি না পাওয়ার কারণে তারা রাজপথে কোন সভা-সামবেশ করতে পারছেনা। চলতি বছরে তারা বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে একটি বিজয় র‌্যালি বের করতে চেয়েছিল। সেটি পারেনি। ৭ নম্বের উপলক্ষে সমাবেশ করতে একাধিকবার আবেদন করেছিল। কিন্তু সেটিরও অনুমতি মিলেনি। কয়েকটি ঘরোয়া কর্মসূচি ছাড়া বিএনপির এবছরের কর্মসূচি তেমন ছিলনা।  নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ২০ দলীয় জোট ২০১৪ সালে দুর্বার আন্দোলন করলেও সদ্য সমাপ্ত বছরে তারা শুধুমাত্র দল গোছানো আর হুমকি-ধামকিতেই ব্যস্ত। বারবার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েও তারা ঘরোয়া সমাবেশের মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে। তাদের যুক্তি ছিল, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা থেকে সরানো হবে। সংঘাত নয়, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটবে।
মহান স্বাধীনতার ৪৫ বছর উদযাপন করেছে দেশ। আজো দেশের মানুষকে অবরুদ্ধ গণতন্ত্র থেকে মুক্তি, বিপন্ন সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করে স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা প্রতিষ্ঠা করা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে হচ্ছে। এবারো করা হয়েছে। আমরা এমন একটা সরকারের শাসনে গত ৭টি বছর অতিবাহিত করেছি, যারা দেশে এখন বিরোধী দল দলন, নিপীড়ন, ভিন্নমত দমনে নানা ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে বিরোধী নেতাদের অন্যায়ভাবে গ্রেফতার ও বিচারের মঞ্চস্থ করা, খুন-গুপ্তহত্যা এবং ভীতিকর আবহ তৈরি করে বিজয়ের গৌরবগাঁথা বদলে ফেলার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।  মানবাধিকার এখন শেকলে বাঁধা। সংবিধান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচার চাচ্ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ঝাঁপিয়ে পড়ছে। ক্ষমতার মসনদকে পাকাপোক্ত করতে শাসক দল আওয়ামী লীগ আবারও গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলীয় বাকশাল কায়েমের স্বপ্নে বিভোর। সেই লক্ষ্যে তারা একের পর এক বাস্তবায়ন করে চলেছে তাদের নীলনকশা। দেশজুড়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নানা প্রক্রিয়ায় চলছে অমানবিক অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন। যা অতীতের সকল রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে। তাইতো এক সময়কার আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আক্ষেপ করে তার দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছেন, আমি সারা জীবন বঙ্গবন্ধুর সাথে আওয়ামী লীগ করেছি কিন্তু সেই আওয়ামী লীগ এই আওয়ামী লীগ ছিল না। এই আওয়ামী লীগ এখন লুটেরাদের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানীরা যখন আমাদের গোলাম করে রেখেছিল তখনো এদেশে এভাবে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়নি।
সূত্র মতে, ২০১৪ সালে দেশ হোঁচট খেয়েছে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অত্যাশ্চর্য উপহার হিসেবে বিনা ভোটে নির্বাচিত তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার পেয়ে।  ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে বিদশীরা নির্বাচন মনে করছেনা। তারা মনে করে সেই নির্বাচনে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এটা কোনো গণতন্ত্র হতে পারেনা। জাতিসংঘের ভাষণে নরেন্দ্র মোদি পার্শবর্তী দেশ ভুটান নেপাল, তিউনিশিয়া, মরক্কোসহ কয়েকটি দেশের গণতন্ত্রের উন্নতির কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের কথা বলেননি। এছাড়া জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি প্রাচ্যের দেশ জাপান-চীনও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে মেনে নেয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার বলছেনা। ফলে এই নির্বাচনের ধাক্কা লেগেছে মানব রফতানিতেও। যদিও এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যসহ অধিকাংশ দেশেই জনশক্তি রফতানি অনেকটাই বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে জনশক্তি রফতানির দ্বার উন্মোচিত হবেনা। 
দেশে বিদেশে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্ষমতাসীনরা মনে করছে, তাদের একটা নির্বাচন করতেই হবে। কী করে সেই নির্বাচনে জেতা যাবে তা-ই এখন ভাবছে তারা। তারই অংশ হিসেবে মাঠ পরিষ্কারের কাজে নেমেছে তারা। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা, বিরোধী জোটের সিনিয়র নেতাদের মামলা দিয়ে কারাগারে রাখা, পুরনো মামলার সাথে নতুন নতুন মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের ব্যস্ত রাখার পাশাপাশি জোটকে ভেঙ্গে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করার কৌশলে এগুচ্ছে সরকার। পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন, এসব করেও যে সরকারের শেষ রক্ষা হবেনা তা ক্ষমতাসীনরা ভালোই জানে।  রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রধান বিরোধী দল, জোটের প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য করে নির্বাচন করলে সেটিও কারো কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবেনা। উল্টো সরকারের আসল চেহারা বিশ্বের সামনে উন্মোচিত হবে।
জোটের একাধিক সূত্র জানায়, ওয়ান ইলেভেনের সময় বিএনপিকে ভাঙ্গার চেষ্টা হয়েছিল। গত কয়েক বছর ধরে জোটের মধ্যে দ্বন্ধ-বিভেদ ধরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তাতে সফলতা আসেনি। বরং দল ও জোট আগের থেকে আরও বেশী শক্তিশালী হয়েছে। চলতি বছরেও সরকারের আজ্ঞাবহ মিডিয়াগুলো বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তাতে সফলতা আসেনি। এছাড়া বিএনপিকে ভাঙ্গার জন্য তারা অনেক ষড়যন্ত্র করছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলে নেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে।  গেল বছরেও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে সরব ছিল ক্ষমতাসীন আ’লীগ। তাদের বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে, জিয়া পরিবার ক্ষমতাসীনদের জন্য বড় হুমকি। সরকার জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এমন কোনো মিথ্যা প্রপাগান্ডা নেই যা তারা করছেনা। খালেদা জিয়া-তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। এমনকি খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারেরও আয়োজন চলছে। আদালতে হাজির হওয়া নিয়ে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
দেশের চলমান সংকট উত্তরণে সরকারকে কর্তৃত্ববাদী মনোভাব থেকে সরে এসে একটি জাতীয় সংলাপ আয়োজনের আহবান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছিলেন, দেশ আজ গভীর সংকটে নিপতিত। এখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হচ্ছেন। তিনি বলেন, ঘরে বাইরে এখন কেউই নিরাপদ বোধ করছেন না। চারদিকে আতংক, উৎকন্ঠা ও উদ্বেগ গোটা জাতিকে গ্রাস করেছে, যেন সামনে ঘোর অন্ধকার। অথচ সরকার অবনতিশীল আইন পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার প্রধান অচিরেই আরেকটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার পর দেশে আজ এক সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় বিপর্যস্ত। তিনি বলেছেন, সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ। সরকার নিজেই এই সংকট সৃষ্টি করেছে-যা ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে অবাধ-নিরপেক্ষ ও সকল দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান মনে করেন, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি এবং গণতান্ত্রিক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত না হওয়া বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে অপশক্তি গোপনে গোপনে বিস্তার লাভ করছে। দেশে যদি গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা হতো, তাহলে পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমি বলব, একটি ব্যাপক জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। এই জাতীয় ঐক্যে বিএনপিকেও থাকতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সব জায়গায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, সুশাসন তখনই হবে, যখন তা হবে স্বশাসন। কারণ, জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, সুজন দেশের সব প্রান্তের মানুষকে যুক্ত করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে দেশের মানুষ সুশাসন ও গণতন্ত্র চায়। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, অধিকাংশ জনগণের জন্য সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, জনগণের ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠার জন্য সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দেশের সব প্রগতিশীল শক্তিকে একত্র হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতন্ত্র মানলে তার অপরিহার্য উপাদান নির্বাচনও মানতে হবে। আর সেই নির্বাচন পরিচালনা করতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আলোচনা চলে আসছিল বেশ কিছু দিন ধরেই। আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে উত্থাপিত সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্টে আগের বারের মতো অর্থাৎ সার্চ কমিটি গঠন করে নির্বাচন কমিশন করার কথা বলা হয়েছে। আইনমন্ত্রীও সে রকম ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে গত ১৯ নবেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন গঠন–প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। একই প্রস্তাবগুলো তিনি রাষ্ট্রপতির কাছেও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন করা উচিত। তার প্রস্তাবগুলো আলোচনার ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু খালেদা জিয়ার প্রস্তাব পেশের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তাতে মনে হবে বিএনপির চেয়ারপার্সন মহা অন্যায় করে ফেলেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নিকট অতীতে বিএনপি কিছু ‘ঐতিহাসিক ভুল’ করার কারণে দলের নেতারা যতই নমনীয়তা দেখাচ্ছেন, সরকার ততই কঠোর হচ্ছে। বিএনপি যখন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আর আলোচনার মাধ্যমে চলমান সংকটের সমাধান চাইছে সেখানে সরকার তাদের রাজপথেই নামিয়ে দিতে চাইছে। এতে করে সরকারের কোনো লাভ হবেনা। বরং জনগণ বিরোধীদের পক্ষেই অবস্থান করবে।
একদিকে সবাই যখন জাতীয় ঐক্য ও সংলাপের কথা বলছে তখন সরকার হাঁটছে উল্টো পথে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ-সমঝোতা হবে না। সংলাপের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ লড়াইয়ে বিশ্বাস করে। এ লড়াই হবে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে। নির্বাচনী লড়াইয়েই জনগণ রায় দেবে। তিনি বলেন, কার সঙ্গে সমঝোতা বা আলোচনা করবো? এগুলো তো আসলে চটকদার কথা। এর মাধ্যমে কোনো সমস্যার সমাধান আসে না, সংবাদমাধ্যমে শুধু হেডলাইন হওয়া যায়। নাসিম আরও বলেন, আমরা কোনো আলোচনা বা সমঝোতা করবো না। নির্বাচনের মাধ্যমেই সবকিছু নির্ধারিত হবে। আর ২০১৯ সালের আগে কোনো নির্বাচন হবে না।
সূত্র মতে,  দেশের মানুষ রাজনীতিকদের কাছ থেকে বেশি কিছু চায় না। তারা পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের একটি সুস্থ ও সুষ্ঠু পরিবেশ চায়। তারা রাজনীতিকদের কাছে একটু সহমর্মিতা ও সহনশীলতা আশা করে। কিন্তু মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতারা তার বিপরীতে হাঁটাকেই ভোট পাওয়ার গ্যারান্টি হিসেবে ধরে নিয়েছেন। অতীত ইতিহাস বলে, ১৯৭০ সালে আইন, শাসক, সেনাবাহিনী সবকিছু তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল। এমনকি পাকিস্তানি শাসক চক্র বাঙালিদের মধ্যে ভাঙন ধরাতে নানা অপকৌশল নিয়েছিল। অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ইয়াহিয়া খানের এলএফও বা লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্কের অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। তিনি জবাবে বলেছিলেন, জনগণের রায় পেলে কোনো ফ্রেম ওয়ার্কই কাজে আসবে না এবং সেটি তিনি প্রমাণও করেছিলেন। স্বৈরাচারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গণমাধ্যম, প্রশাসন, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগই জয়ী হবে। কিন্তু জনগণ বিএনপির পক্ষেই রায় দিয়েছিল এবং খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনেও বিরোধীদের প্রচারণা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই অপপ্রচারে কান দেয়নি, তারা আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় বসিয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে, তার পেছনে নিজ নিজ দলের কৃতিত্ব তেমন ছিল না। ক্ষমতাসীনদের বাড়াবাড়ির জবাবই জনগণ ভোটের মাধ্যমে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ যদি দেশের এতই উন্নতি করে থাকে, তাহলে আগামী নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে এত বিচলিত কেন? সব দলের মতামতের ভিত্তিতে একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারলে সেটা দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তখন আওয়ামী লীগ জনগণকে বোঝাতে পারবে যে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় থাকতে সমঝোতা না চাইলেও তারা সমঝোতায় বিশ্বাসী এবং জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে’। কিন্তু গত পঁয়তাল্লিশ বছরে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনেরা সেটি বুঝতে পারেননি, ভবিষ্যতে পারবেন কি?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ