ঢাকা, রোববার 01 January 2017, ১৮ পৌষ ১৪২৩, ২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অবসরের পর রায় লেখা নাকচ ও দ্বৈত শাসন ছিল আলোচনায়

নাজমুল আহসান রাজু : বিদায়ী বছরের শুরু থেকে নানা কারণে আলোচনায় ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত অঙ্গন। বছরের শুরুতে ‘অবসরের পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থী’ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এমন মন্তব্য করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার ১৬ মাস পর এতে স্বাক্ষর করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবি এম খায়রুল হক। প্রধান বিচারপতির বাণীর প্রেক্ষিতে আইন বিশেষজ্ঞরা তত্তাবধায়ক সরকারের রায় বাতিলের দাবি জানান। একই বিষয়ে বিতর্ক আরো জোরালো হয় যখন ৩১ মার্চ বিচারপতিদের রায় ঘোষণার ছয় মাসে স্বাক্ষরের বিধান সম্বলিত ৪০ দফার নির্দেশনা দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সাবেক একজন বিচারপতিকে অপসারণের বিষয়ে করা আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পুর্ণাঙ্গ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট রায় লেখার সময়সীমা বেঁধে দেন এবং আচরণ বিধি নির্ধারণ করে দেন। সরকারের দু’জন মন্ত্রীকে আদালত অবমাননার দায়ে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দন্ড দেয়া হয়েছিল। বছরের শেষের দিকে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অভিযোগ করেন বিচার বিভাগে দ্বৈত শাসন চলছে। দ্বৈত শাসনের অবসানে মাসদার হোসেন মামলার আলোকে বিচারকদের চাকরি ও শৃঙ্খলাবিধির প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেয়া হলেও রাষ্ট্রপতির পক্ষে বলা হয় যে বিধির প্রয়োজন নেই। তিনি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিল করে বাহাত্তরের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবি করেন। বিদায়ী বছরে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদন্ডের রায় পুন:বিবেচনার আবেদন সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করে দেয়ায় তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছিল। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা জাতীয সংসদে ন্যস্ত করার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল হয়ে যায় হাইকোর্টের রায়ে। এই সংশোধনী ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ক্ষমতাসীন সরকার এনেছিল। সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে আপিলের ঘোষণা দেয়া হয় তবে কোন আপিল এখন পর্যন্ত করা হয়নি। এছাড়া ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানা গ্রেফতার এবং ১৬৭ ধরায় রিমান্ডের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আলোচিত রায় প্রকাশিত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) জেলা ও দায়রা জজের পদমর্যাদা সচিবের সমান নির্ধারণ করে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত।
বিচার বিভাগে দ্বৈত শাসন : বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ৯ম বর্ষপূর্তিতে গত ৩১ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের ধীরগতির অন্যতম কারণ। এই অনুচ্ছেদের ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি ও শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে এককভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বৈত শাসনের ফলে সম্ভব হচ্ছে না বহু জেলায় শূন্য পদে সময়মতো বিচারক নিয়োগ প্রদান করা। এতে বিচারকার্য বিঘ্ন ঘটে এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যায়। এ কারণে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুন:প্রবর্তন দাবি করেন তিনি।
জরুরি অবস্থার সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ১ নবেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছিল।
উল্লেখ্য যে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের কারণে প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে সরকারের আইন মন্ত্রনালয় নিন্ম আদালতের বিচারকদের বদলী, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরী করে থাকে। ১৯৭২ সালের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুন:প্রবর্তন হলে এই নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হবে।
বাণীতে প্রধান বিচারপতি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর ওই বিভাগের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রয়েছে। অপর দিকে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের ধীরগতির অন্যতম কারণ। এই অনুচ্ছেদের ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি ও শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে এককভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বৈত শাসনের ফলে বহু জেলায় শূন্য পদে সময়মতো বিচারক নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিচারকার্য বিঘ্ন ঘটে এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃপ্রবর্তন হওয়া সময়ের দাবি। যাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। ওই বিধানটি পুনঃপ্রবর্তন করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও সমুন্নত ও সুসংহত হবে এবং বিচার বিভাগের সার্বিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হবে।
অবসরের পর লেখা অসাংবিধানিক : ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক বছর পূর্তিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক বাণীতে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন। কোন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তাঁর গৃহীত শপথও বহাল থাকেনা। আদালতের নথি সরকারী দলিল (পাবলিক ডকুমেন্ট)। একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান। আশা করি বিচারকগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এমন বেআইনী কাজ থেকে বিরত থাকবেন।’
মাওলানা নিজামীর রিভিউ খারিজ : জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর রিভিউ (পুন:বিবেচনার) আবেদন খারিজের পুর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয় গত ৯ মে। পুর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছে। পরেরদিন রায় কার্যকর করে কারা কর্তৃপক্ষ।
২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় লিখেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। তার সঙ্গে একমত পোষণ করে অপর তিন বিচারপতি রায়ে সই করেছেন। 
রিভিউর পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, আমরা আবেদনের কোন সারবত্তা (মেরিট) খুঁজে পাইনি এবং এটি খারিজ করা হলো।
গত ৫ মে মাওলানা নিজামীর রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন খারিজ করে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ রায় দেয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তখন “ডিসমিসড” এই এক শব্দে রিভিউ আবেদন খারিজের আদেশ দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। ফলে আপিলে তিনটি অভিযোগে দেয়া মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল থাকে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে।
গত ২৯ মার্চ মাওলানা নিজামীর আইনজীবীরা খালাস চেয়ে আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
৭০ পৃষ্ঠার মূল রিভিউর আবেদনের সঙ্গে মোট ২২৯ পৃষ্ঠার নথিপত্রে ৪৬টি (গ্রাউন্ড) যুক্তিতে খালাস চান তার আইনজীবীরা। রিভিউ আবেদনের এডভোকেট অন রেকর্ড হলেন আইনজীবী জয়নুল আবেদীন তুহিন।
এর একদিন পরেই সরকারপক্ষে শুনানির দিন নির্ধারণের জন্য আবেদন করে। সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৩০ মার্চ আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে ৩ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করেন। ওইদিন ডিফেন্সপক্ষে ৬ সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করা হলে আদালত এ সপ্তাহে নয় বলে আদেশ দেন। মামলার প্রধান আইনজীবী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে সময় চাওয়া হয়।
গত ১৫ মার্চ আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে হয়। সে হিসেবে ৩০ মার্চ পর্যন্ত রিভিউ করার সময় ছিল। তার আগেই মাওলানা নিজামীর পক্ষে তার আইনজীবীরা সংশ্লিষ্ট শাখায় এই আবেদন করেন।
২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মাওলানা নিজামীর মামলায় রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়া হয়। অপর চারটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া বাকি আটটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মাওলানা নিজামীকে অভিযোগগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
২০১০ সালের ২৯ জুন কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় মাওলানা নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে একই বছরের ২ আগস্ট এক আবেদনে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
দুই মন্ত্রীর সাজা: আদালত অবমাননার দায়ে সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী দুই মন্ত্রীকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। পরে ওই জরিমানার টাকা ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও লিভার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশকে দেন তারা।
সাজা নিয়ে তারা মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। আইনজীবীদের একটি বড় অংশই  সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও নৈতিকতার প্রশ্নে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত বলে মত দিয়েছিলেন।
রায়ে দুই মন্ত্রীকে সাত দিনের মধ্যে দন্ডের অর্থ পরিশোধ না করলে এক সপ্তাহ করে সাজা খাটতে হবে বলা হয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের আট বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই আদেশ দিয়েছিলেন। তার আগে ২০ মার্চ এ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা রুলের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন, দুই মন্ত্রী সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। তাদের আইনজীবীদের কাছে প্রধান বিচারপতি জানতে চেয়েছিলেন, সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে তা ভঙ্গের পরিণতি কী হবে?
৫ মার্চ একটি গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ডের আদেশ পাওয়া জামায়াতে ইসলঅমীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষধ সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিল মামলা পুনঃশুনানির দাবি জানিয়েছিলেন। ওই শুনানিতে প্রধান বিচারপতি ও এটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতিকে আপিলের শুনানি থেকে সরে যাওয়ার আহবান জানান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। এরপর ৮ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন ‘আমরা সব বিচারক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করেছি। আমরা আদালত অবমাননা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না। শুধু দুজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি সারা জাতিকে একটি বার্তা দেয়ার জন্য। ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরণের অবমাননার পুনরাবৃত্তি না করেন। তারা দেখুক আমরা কত কঠোর হতে পারি।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের একটি বড় অংশ মনে করে, নৈতিকতার প্রশ্নে দন্ডিত দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ওই সময় বলেন, যদি তাঁরা পদত্যাগ না করেন, আশা করব প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করবেন। তিনি বলেন, একজন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন না, এজন্য কোনো আইনের প্রয়োজন হয় না।
মীর কাসেম আলীর রিভিউ খারিজ : জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদন্ডের রায় পুর্নবিবেচনার আবেদন (রিভিউ) খারিজ করে ৩০ আগস্ট রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ডিসমিসড’ এক শব্দে আদালত রিভিউ আবেদনটি খারিজ করেন। পরে বিকাল ৫ টা ১৫ মিনিটের দিকে রিভিউ খারিজের রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর রায়ের অনুলিপি ট্রাইব্যুনাল হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌছে।
রিভিউ খারিজের ২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় লিখেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। তার সাক্ষরের পর অপর চার বিচারপতি এতে একমত পোষণ করে স্বাক্ষর করেন। এরপরই রায় প্রকাশ হয় ওয়েবসাইটে। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
এর আগে ওইদিন সকাল ৯টা ৪ মিনিটে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ মীর কাসেম আলীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখেন। আদালত বলেন রিভিউ ‘ডিসমিসড’।
মীর কাসেম আলীর রিভিউতে বলা হয় আপিলের রায়ে ১১ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদন্ডের দেয়া ত্রুটিপূর্ণ। আবেদনে আপিলের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সাতটি (২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ এবং ১৪) অভিযোগ থেকে খালাস চান তিনি। গত ৬ জুন মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গত ৮ মার্চ মীর কাসেম আলীর আপিল আংশিক মঞ্জুর করে তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি এবং সাতটি অভিযোগে সাজা বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগ। এরমধ্যে ১১ নম্বর অভিযোগে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়ার মৃত্যুদন্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
আপিলের সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, আসামিপক্ষের আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। প্রসিকিউশন করা অভিযোগের মধ্যে ৪, ৬ ও ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে মীর কাসেম আলীকে খালাস এবং  ২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালে দেয়া দন্ড বহাল রাখা হলো। এরমধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে আপিল বিভাগ খালাস দিলেও ১১ নম্বর অভিযোগে তার মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে।
২০১৪ সালের ২ নবেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে দু’ সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায় প্রদান করেন। ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ওই দিনই তাকে গ্রেফতার করে বিকেল সোয়া চারটার দিকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মীর কাসেম আলী বর্তমানে কাশিমপুর কারাগার পার্ট-২ তে রয়েছেন।
বিচারকদের জন্য ৪০ দফা আচরণবিধি : প্রধান বিচারপতি চাইলে বিচারকদের সম্পদ এবং দায় দেনার বিবরণী জমা দিতে হবে। এছাড়া ছয় মাসের মধ্যে মামলার রায় লিখে স্বাক্ষর দিয়ে তা প্রকাশ করতে হবে। রায়ে প্রভাব ফেলতে পারে, এমন কোনো পারিবারিক, সামাজিক বা অন্য সম্পর্ক রাখতে পারবেন না কোনো বিচারক। এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থে বিচারকের পদ ব্যবহার করা যাবে না। গত ৩০ মার্চ এক মামলার রায়ে আপিল বিভাগ এই নির্দেশনা প্রকাশ করেন। ওই রায়ে বিচারকদের জন্য অবশ্যই পালনীয় ৪০ দফা ঘোষণা করা হয়েছে। আপিল বিভাগের পক্ষে এ রায়টি লিখেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।
হাইকোর্টের বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল তার পদ থেকে অপসারণ করেন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে শাহিদুর রহমান হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। রিটের রায়ে রাষ্ট্রপতির ওই সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান জনস্বার্থে আপিল করেন। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল বলে ঘোষণা করে। গত ৩০ মার্চ এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১০৩ পৃষ্ঠার এই রায়ে বিচারকদের আচরণবিধি সংক্রান্ত ৪০টি দফা উল্লেখ করা হয়। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই রায় মান্য করা সকল বিচারকের জন্য বাধ্যতামূলক। ওই অনুচ্ছেদে বলা আছে, “আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যে কোনো বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধস্তন সকল আদালতের জন্য অবশ্য পালনীয় হইবে।
রায়ের ৪০ দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিচার শুধু করলে হবে না, বিচার করা হয়েছে সেটা দৃশ্যমানও হতে হবে। বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বজায় থাকে এমন আচরণ করতে হবে। বিচারক থাকাকালে আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। বিচারক বা তার পরিবারের কোনো সদস্য কারও কাছ থেকে বিচারিক ক্ষমতার বিনিময়ে উপহার, অনুরোধ, ঋণ বা সুবিধা নিতে পারবেন না। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে একজন বিচারক নিজে বা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না। তিনি দেশে বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হবেন না। প্রধান বিচারপতি চাইলে বিচারককে তাঁর সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণী জমা দিতে হবে। একজন বিচারকের পরিবারের সদস্য যেমন স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, জামাতা-পুত্রবধূ বা কোনো ধরণের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যদি আইনজীবী হন, তাহলে তাঁর পরিচালিত কোনো মামলা ওই বিচারক পরিচালনা করতে পারবেন না। কোনো জনবিতর্কে বা রাজনৈতিক বিষয়ে একজন বিচারকের জড়িত হওয়া উচিত নয়। একইসঙ্গে এ বিষয়ে বিচারক কোনো মত দেবেন না। কারণ ওই জন-বিতর্ক বা রাজনৈতিক বিষয়গুলো পরে বিচারিক সিদ্ধান্তের জন্য বিচারকের সামনে আসতে পারে। একই আদালতে প্র্যাকটিস করেন এমন বিচারক ও আইনজীবীর মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থাকতে পারবে না। এমনকি ওই আইনজীবী যদি কোনো মামলার সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত থাকেন, তাহলেও তার বিচার ওই বিচারক করতে পারবেন না। বিচারকের পরিবারের কোনো সদস্য যদি আইনজীবী হন, তাহলে ওই আইনজীবী কোনোভাবে সেই বিচারকের বাসায় পেশাগত কাজ পরিচালনা করতে পারবেন না। পরিবারের কোনো সদস্য জড়িত এমন কোনো মামলাও ওই বিচারক শুনতে পারবেন না। একজন বিচারক কোনো মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবেন যদি তিনি আগে ওই মামলায় আইনজীবী হিসেবে কাজ করে থাকেন। একজন বিচারপতির আইন ও সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত এবং তা মেনে চলা উচিত। এবং সবসময় এমন আচরণ করা উচিত যাতে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা বাড়ে। আদালতে বিচারাধীন মামলার বিষয়বস্তু নিয়ে বিচারক জনসমক্ষে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না। যদি যৌক্তিক কারণে কোনো মামলায় একজন বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় তাহলে ওই বিচারক নিজেকে বিচার কাজ থেকে সরিয়ে নেবেন। বিচারক গণমাধ্যমে কোনো সাক্ষাত্কার দিতে পারবেন না। বিচারক তার বক্তব্য রায়ের মাধ্যমে প্রকাশ করবেন। একজন বিচারক আদালতের বিচার কাজ দ্রুত শেষ করবেন। রায় বা আদেশ প্রদানে অথযা বিলম্ব পরিহার করবেন। বিচারক ব্যতিক্রমী মামলার রায় ছাড়া অন্য যে কোনো মামলায় রায় ঘোষণার অনধিক ছয় মাসের মধ্যে স্বাক্ষর করবেন। এছাড়া একজন বিচারকের আচরণ এমন উঁচু মানের হতে হবে যাতে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও একাগ্রতা অক্ষুন্ন থাকে।
গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এক রায়ে বিচারপতি শাহিদুর রহমানকে অপসারণে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার রায়ে একমত পোষণ করেছেন অপর তিন বিচারপতি।
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল : বিচারপতিদের অপসারণে সংসদের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করার সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা ও বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয় গত ১১ আগস্ট। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে বলতে দ্বিধা নেই ষোড়শ সংশোধনী একটি একটি মেকি আইন (কালারেবল লেজিসলেশন) এবং এটা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের (নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ) ক্ষমতার পৃথকীকরণের লঙ্ঘন। সংবিধানের ৯৪ (৪) এবং ১৪৭(২) অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এই দুটি অনুচ্ছেদ সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভ। এই সংশোধনী সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের (খ) দফাকে আঘাত করেছে। কেননা সংবিধানের ৭-এর ‘খ’ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৌলিক স্তম্ভ পরিবর্তন করার কোনো বিধান নেই এ কারণে রুলের সারবত্তা রয়েছে এবং রুলটি সফল। রুল যথাযথ ঘোষণা করা হলো কোন ব্যয় ছাড়া। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আইন ২০১৪ (এ্যক্ট নম্বর ১৩, ২০১৪) মেকি, বাতিল এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হলো। যাই হোক আমরা সনদ দিচ্ছি কারণ সংবিধানের ১০৩(২)(এ) দফা অনুযায়ী বিষয়টির সঙ্গে বলিষ্ঠ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১৬৫ পৃষ্ঠার এ রায় প্রকাশ করা হয়। এর আগে এই রায়কে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দিয়েছিলেন আইনজীবীরা। গত ৫ মে ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের নিষ্পত্তি করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য দুই বিচারপতি হলেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল। বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বহালের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির রায় হওয়ায় ষোড়শ সংশোধনী আইনটি বাতিল হয়ে যায়।
প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়টি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের লেখা। তাদের দু’ জনের রায়ই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু বেঞ্চের অপর সদস্যবিচারপতি আশরাফুল কামালের লেখা রায় ওয়েবসাইটে এখনো প্রকাশিত হয়নি।
রায়ে আদালত বলেছেন, এই আইন হলে আদালত যদি নিরপেক্ষ বিচার করে এরপরও জনগণের মধ্যে একটা সংশয় সৃষ্টি হবে যে, এটা বোধহয় সঠিকভাবে করা যায়নি।
৫ মে সংক্ষিপ্ত রায়ে আদালত বলেছিলেন, বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদে ন্যস্ত করা ঐতিহাসিক দুর্ঘটনা। রায়ের পরপরই সরকার তা স্থগিত চেয়ে আবেদন করে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে। তবে এখন পর্যন্ত কোন শুনানি হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ (১৬তম) সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ সালের ৫ নবেম্বর হাইকোর্টে ৯ জন আইনজীবী এই রিট করেন।
৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় : বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার (৫৪ ধারা) ও রিমান্ডে (১৬৭ ধারা) জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশনা বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয় গত ১০ নবেম্বর। রায়ে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী এবং ম্যাজিস্ট্রেট ও বিচারকের জন্য নীতিমালা নির্ধারণ করে দেন সর্বোচ্চ আদালত। সংক্ষিপ্ত রায়ের দিনই আইনবিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা বহাল থাকায় তা মানতে সরকার বাধ্য। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই রায় প্রতিপালন করা কর্তব্য।
১০ নবেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৩৯৬ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। রায়ে বলা হয় সরকারের আপিল খারিজ। এই নির্দেশনা তথা নীতিমালা অনুসরণ এবং প্রয়োগে পুলিশের আইজিকে প্রত্যেক থানায় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশের জন্য নির্দেশ দেয়া হল। র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এবং সকল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রেরণের জন্যও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সরকারের আইন মন্ত্রনালয়ের লেজেলেটিভ এবং সংসদ বিষয়ক সচিব, আইন ও বিচার সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি, ন্যাবের ডিজি, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রায়ের অনুলিপি পাঠাতে বলা হলো। রায়ে আইন শৃঙ্খলা বহিনীর দায়িত্ব, এবং পালনীয় হিসেবে ১০টি নির্দেশনা এবং ম্যােিজস্ট্রট বা বিচারকদের জন্য ৯টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর দায়িত্ব :
১. আইনদ্বারা অর্পিত দায়িত্ব পরিপূর্নভাবে পালন করা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, বেআইনী কর্মকান্ড থেকে সকলকে সুরক্ষা দেয়া, যা করতে উচ্চমানের দায়িত্ববোধের প্রয়োজন।
২.আইন শ্ঙ্খৃলাবাহিনীকে দায়িত্বপালনকালে সকলের মানবিক মর্যাদা এবং মৌলিক মানবাধিকারকে সম্মান এবং সুরক্ষা দিতে হবে।
৩.দায়িত্বপালনে অতি জরুরি ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলাবাহিনী ফোর্স ব্যবহার করতে পারে।
৪.সাংবিধানিক অধিকারের ক্ষেত্রে আইন শৃঙ্খলাবহিনীকে শুধুমাত্র সম্মান দেখালে হবে না, সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার সুরক্ষঅ দিতে হবে।
৫. মানুষের জীবন অতিমূল্যবান সম্পদ, মানবজীবন রক্ষায় আইন শৃঙ্খলাবাহিনীকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৬.তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো অপরাধ রোধ, অপরাধ সংগঠন হওয়ার আগে তা রোধ করা অনেক ভাল।
৭.গ্রেফতার হওয়া ব্যাক্তি তার পছন্দ এবং ইচ্ছা অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবেন এবং নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নির্দেশনা:
১.গ্রেফতারের পরপরই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা গ্রেফতারের একটি স্মারকপত্র তৈরি করবেন এবং এতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির স্বাক্ষর, তারিখ লিপিবদ্ধ থাকবে।
২.একজন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর ১২ ঘন্টার মধ্যে অবশ্যই তার কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, তা না পাওয়া গেলে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির পরামর্শে কোন বন্ধুকে গ্রেফতারের স্থান এবং হেফাজতে রাখার বিষয়টি অবহিত করবেন।
৩. একটি ডায়েরীতে গ্রেফতারের কারণ লিপিবদ্ধ থাকবে, সাথে কার তথ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে বা অভিযোগকারীর ঠিকানা থাকবে যার ভিত্তিতে গ্রেফতার হয়েছেন, এবং যার হেফাজতে আছে সুনির্দিষ্টভাবে সে পুলিশ কর্মকর্তার নাম থাকবে।
৪. মামলা নিবন্ধন হওয়ার পর আটকাদেশ বা ১৬৭ (২) অনুযায়ী হেফাজত চাইতে হবে।
৫. কোন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৫৪ ধারায় হেফাজতের উদ্দেশ্যে গ্রেফতার করবে।
৬ গ্রেফতার কালে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় জানতে চাইলে তার পরিচয় দিতে হবে এবং পরিচয়পত্র দেখাবেন।
৭. গ্রেফতারের পর গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তির শরীরে কোন ক্ষত দেখলে তার কারণ লিপিবদ্ধ করবেন এবং নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাবেন এবং একটি চিকিৎসাসনদ নিবেন চিকিৎসকের কাছ থেকে।
৮. যদি বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রেফতার করা না হয় তাহলে থানায় আনার ১২ ঘন্টার মধ্যে তার নিকটাত্মীয়কে জানাবেন।
৯.যখন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গ্রেফতার ব্যক্তিকে উপস্থিত করা হবে তখন তদন্ত সম্পন্ন না হলে ১৬৭(১) ধারায় একটি আবেদনে  আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কর্মকর্তা এর কারণ জানাবেন কেন তিনি বিবেচনা করেেছন আটক ব্যক্তি ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য যথেষ্ট বাংলাদেশ পুলিশের ৩৮ নম্বর ফরমে তা ম্যাজিস্ট্রটকে জানাতে হবে।
ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারক এবং ট্রাইব্যুনাালের জন্য নির্দেশনা :
১. যদি কোন ব্যক্তিকে আটকাদেশের জন্য আদালতে উপস্থিত করে কোন আবেদন করা হয় কিন্তু কোন ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ ছাড়াই সে ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক তাকে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি দিতে পারবেন।
২. যদি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন কর্মকর্তা গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন প্রার্থনা করে, কিন্তু তিনি ইতিমধ্যে হেফাজতে আছেন। সেক্ষেত্রে কোন ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করার অনুলিপি ছাড়া আবেদন করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক বা ট্রাইব্যূনাল তা গ্রহণ করবেন না। আদালত যদি দেখেন গ্রেফতার দেখানোর যথেষ্ট কারণ নেই এবং ভিত্তিহীন তিনি আবেদনটি নাকচ করবেন।
৩.উপরের শর্তপূরণে প্রেক্ষিতে যদি ১৬ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ না হয় তাহলে ১৬৭ (২) ধারা মতে মামলাটি বিশেষভাবে দায়রা আদালতে বিচারযোগ্য হলে এ ধরণের ব্যক্তিকে ৩৪৪ ধারায় রিমান্ডে পাঠাবেন কিন্তু এটা এক টানা ১৫ দিনের বেশী হতে পারে না।
৪.যদি ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হন যে অগ্রবর্তী আবেদনে আটক ব্যাক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের যথেষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে এবং কেস ডায়েরী মতে অভিযোগের উপাদান রয়েছে তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট আটকাদেশ দিবেন এবং আরো বাড়াতে পারবেন।
৫.যদি নিবর্তনমূলক আটকাদেশ হয় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট কোন আদেশ দিবেন না।
৬. ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থাপনের আগে ১৬৭ ধারায় সকল প্রয়োজন বিষয় পুরণ হয়েছে কিনা এটা দেখা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব।
৭.যদি ম্যাজিস্ট্রেটের বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে আইন শৃঙ্খলার বাহিনীর কর্মকর্তা বেআইনীভাবে কোন ব্যক্তিকে কয়েদ করেছেন তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবেন দন্ডবিধির ২২০ ধারায়।
৮. হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে মেয়াদ শেষের আগেই উপস্থাপন করতে হবে। যদি কোন ব্যক্তি রিমান্ডে হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক ভিকটিমের মেডিকেল বোর্ড পরীক্ষার নির্দেশ দিবেন। মেডিকেল বোর্ড আঘাতজনিত মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করলে সংশ্রিষ্ট কর্মকর্তা এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা নিয়ন্ত্রক কর্মকতার বিরুদ্ধে হেফাজতে মৃত্যু আইনের ১৫ ধারায় অভিযোগ আমলে নিবেন।
৯. যদি হেফাজে নির্যাতন বা যন্ত্রনা প্রদানের কারণে মৃত্যুর বিষয়টি মেডিকেল প্রতিবেদনে পাওয়া যায় তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট স্বত:প্রণোদিত হয়ে কোন মামলার অপেক্ষা না করেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।
গত ২৪ মে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ সরকারের আপিল ‘ডিসমিস’ বলে আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন-বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসাইন হায়দার।
আদালত সংক্ষিপ্ত রায়ে বলেছিলেন, আপিল খারিজ করা হল। হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে ৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারার কিছু বিষয় সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণে হাইকোর্ট কয়েক দফা সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে কিছু সংশোধনী থাকবে। আমরা একটি নীতিমালা ঠিক করে দেব।
এই মামলায় চলতি বছর ১৭ মে আপিলের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা কাউকে গ্রেফতারের বিষয়টিকে ভয়াবহ অপরাধ। কাউকে গ্রেফতার করতে হলে ইউনিফর্ম (সংস্থার পোশাক) পরিহিত অবস্থায় থাকতে হবে। শুনানির একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উদ্দেশে বলেন, বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট রায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও আপনারা (সরকার) একটি নির্দেশনাও প্রতিপালন করেননি।
ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স : দেশের রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদার ক্রমের (ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স) তালিকা বাতিলের সুপ্রিম কোর্টের পুর্নাঙ্গ রায় প্রকাশ হয় গত ১০ নবেম্বর। রায় অনুসারে সচিবদের মর্যাদায় থাকবেন জেলা জজরা। এর আগে তাদের অবস্থান ছিল সচিবদের থেকে আট ধাপ নিচে ২৪ নম্বর ক্রমিকে। এখন তারা সচিবদের সঙ্গে ১৬ ক্রমিকে অবস্থান করবেন। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নিয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায় সংশোধন ও পরিমার্জন করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের তা রয়েছে। গত ১০ নবেম্বর সুপ্রিম কোর্টে ওয়েবসাইটে ৬২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়।
রায়ে বলা হয়েছে, নিম্ন আদালতের সর্বোচ্চ পদ হচ্ছে জেলা জজ। এরআগে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের ২৪ নম্বর ক্রমিকে রাখা ছিল তাদের জন্য মর্যাদাহানিকর। আপিল বিভাগের রায়ে অতিরিক্ত জেলা, দায়রা জজ ও সমপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদেরকে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রায় অনুযায়ী তাদের অবস্থান ১৭ নম্বর ক্রমিকে। ইতিপূর্বে অতিরিক্ত জেলা জজরা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।
আদালত রায়ে আরো বলেন, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে একই ক্রমিকে একাধিক সমমর্যাদা সম্পন্ন পদের মধ্যে সাংবিধানিক পদধারীদেরকে প্রথমে রাখতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছে, সংবিধানই হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আইন। অতএব এ আইনটি প্রাধান্য দিতে হবে।
রায়ে যা আছে : ১. সংবিধান যেহেতু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন, সেহেতু রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের শুরুতেই সাংবিধানিক পদাধিকারীদের গুরুত্ব অনুসারে রাখতে হবে। ২. জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচার বিভাগীয় সদস‌্যরা রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের ২৪ নম্বর থেকে ১৬ নম্বরে সরকারের সচিবদের সমমর্যাদায় উন্নীত হবেন। জুডিশিয়াল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ জেলা জজ। অন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে সচিবরা রয়েছেন। ৩. অতিরিক্ত জেলা জজ ও সমমর্যাদার বিচার বিভাগীয় সদস‌্যদের অবস্থান হবে জেলা জজদের ঠিক পরেই, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমের ১৭ নম্বরে। 
সরকারের কার্যপ্রণালি বিধিমালা (রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী) ১৯৮৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে তৈরি করে তা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ২০০০ সালে এটি সরকার সংশোধন করে। সংশোধিত এই ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস এসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব আতাউর রহমান। এ প্রেক্ষিতে ওই সময় জেলা জজদের পদমর্যাদা সচিবদের নিচে দেখানো কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ওই রুলের জুড়ান্ত নিষ্পত্তি করে ২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ