ঢাকা, রোববার 01 January 2017, ১৮ পৌষ ১৪২৩, ২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বছরজুড়েই গুম-খুন অপহরণ, বন্দুকযুদ্ধ ও নারীর প্রতি সহিংসতা

নাছির উদ্দিন শোয়েব : ২০১৬ সালে আলোচনা-সমালোচনার অন্যতম প্রধান উপকরণ ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। এ বছরে ঘটেছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলা। ঘটেছে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড। চট্টগ্রামে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে একজন পুলিশ সুপারের (এসপি)  স্ত্রী মিতুকে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভেতরে লাশ পাওয়া গেছে কলেজ ছাত্রী তনুর। রাজধানী ঢাকায় খুন করা হয়েছে একজন স্কুল ছাত্রীকে। কলাবাগানে সমকামি অধিকার নেতাসহ দুই জনকে বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সিলেটে কলেজছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে ছাত্রলীগ নেতা বদরুল।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যা কান্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকান্ডের প্রকৃত আসামীরা এখনো গ্রেফতার হয়নি। উদ্ধার হয়নি হত্যারহস্য। পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিদায়ী বছরে জানুয়ারি থেকে নবেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দেশে ৩ হাজার ৩২৬টি হত্যাকান্ড ঘটেছে। এরসঙ্গে ডিসেম্বরের পরিসংখ্যান যোগ করা হলে হত্যাকান্ডের সংখ্য দাঁড়াবে প্রায় চার হাজার। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ি হত্যাকান্ডের সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে ১৯৭ জন।
দেশের বিভিন্নস্থান থেকে ১১ মাসে ৭০ জন নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জনকে গুম করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নবেম্বর মাস পর্যন্ত মানবাধিকার সংস্থার একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।  কয়েকমাস আগে নিখোঁজ হওয়া বিএনপি নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানেরও খোঁজ মেলেনি। এছাড়াও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে আটক থাকাকালে মৃত্যুবরণকারী জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহ হিল আমান আজমিরও হদিস মেলেনি।
এছাড়াও ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার রেকর্ড ছিল চলতি বছর। চলতি বছরের শুরু থেকে নবেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সারাদেশে ৪ হাজার ৪৯৬ জন নারী বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৬৩ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জনকে। এর সঙ্গে ডিসেম্বর মাসের পরিসংখ্যান যোগ হলে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা গত বছরের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগে ছিল পরিবারগুলো।  বিচার হীনতার জন্যই এ ধরণের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। কারণ থানাগুলো এখনো নারী ও শিশুবান্ধব হয়ে উঠেনি। নির্যাতিত নারী ও শিশু থানায় গিয়ে আইনের সহায়তা ঠিকমত পায়না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়-পুলিশ অপরাধিদের পক্ষ নিয়ে থানা থেকেই আপস রফা করে দেয়।

আলোচিত হত্যা
কলেজ ছাত্রী তনু: বছরের শুরুতেই চাঞ্চল্য ছড়ায় তনু হত্যাকাণ্ড। ২০ মার্চ সেনানিবাস এলাকায় নিজ বাড়ির কয়েকশ গজ দূরেই খুন হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু। সেনানিবাস সংলগ্ন সংরক্ষিত এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আজও হয়নি।
মিতু হত্যা: বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা চ্টগ্রামের এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ড। গত ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি এলাকায় সন্তানকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় নিজ বাসার ১০০ গজ দূরে ছুরিকাঘাত ও গুলিতে নিহত হন মাহমুদা আক্তার মিতু। ঘটনার পর পুলিশ জানায়, জঙ্গি দমনে বাবুল আক্তারের সাহসী ভূমিকার কারণে জঙ্গিরা তার স্ত্রীকে খুন করতে পারে। ঘটনার পর মিতুর স্বামী এসপি (অব্যাহতি পাওয়া) বাবুল আক্তার পুলিশ সদর দফতরে অজ্ঞাত পরিচয় তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন। ঘটনার পর  সন্দেহজনক কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মূলহোতারা আজও ধরাছোয়ার বাইরে।
হলি আর্টিসান : গত ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায়। হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ জন এবং পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি ও একজন ভারতের নাগরিক। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন। এ ঘটনায় রাতেই ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনার পরদিন সকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ পরিচালনা করে সেনা কমান্ডোর একটি দল। কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। তারা হলো- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সাবিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।
শোলাকিয়া হামলা: গুলশান হামলার রেশ না কাটতেই ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা এবং গুলিতে দুই কনস্টেবলসহ চারজন নিহত হন। আট পুলিশ সদস্যসহ আহত হন আরো ১৫ জন। তবে এ ঘটনায় জড়িত আটজনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়। হামলার দিনই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আবীর রহমান নামে নব্য জেএমবির এক সদস্য। আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয় শফিউল নামে আরেক জঙ্গি। এরপর দেশব্যাপী শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী অভিযান।
স্কুলছাত্রী রিশা হত্যা: গত ২৪ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে স্কুলের সামনে ফুটওভার ব্রিজের উপরে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির সুরাইয়া আক্তার রিশার পেট ও হাতে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় টেইলার্স কর্মচারী ‘বখাটে’ ওবায়দুর রহমান। পরে তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যায় রিশা। পরিবার ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে নীলফামারী ডোমার থেকে ওবায়দুরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দেয় সে।  
নাটোর ৩ যুবলীগ কর্মী: নাটোরের যুবলীগ কর্মী রেদওয়ান আহমেদ সাব্বির, আবু আব্দুল্লাহ ও সোহেল আহমেদের গুলিবিদ্ধ লাশ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থেকে গত ৫ ডিসেম্বর উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, র‌্যাব পরিচয়ে রাতে সদর উপজেলার তকিয়া বাজার থেকে তাদের তুলে নেয়া হয়। পরদিন নাটোর সদর থানায় এ ব্যাপারে জিডিও করেন তারা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে র‌্যাব। নিহত তিনজনই শীর্ষ সন্ত্রাসী। সাব্বির ও সোহেলের নামে ১৫টি মামলা আছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।
জবি ছাত্র নাজিম উদ্দিন সামাদ : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্র নাজিমউদ্দিন সামাদকে গত ৬ এপ্রিল গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশের মতে, নাজিম ধর্মবিরোধী বা ব্লগার ছিলেন না। তবে বিভিন্ন সময়ে মতামত তুলে ধরে ফেসবুকে সত্রিুয় থাকতেন। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীও ছিলেন সামাদ। 
সাধু পরমানন্দ রায় : গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ২২ এপ্রিল প্রকাশ্য দিবালোকে সাধু পরমানন্দ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ধর্ম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য বা কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল না বলে দাবি পরিবারের। তবে বাসুরিয়া রসরাজ ঠাকুরের অনুসারী ছিলেন তিনি। সেখানে সনাতন ধর্মের তপস্যা করতেন।
অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী : চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাজশাহী মহানগরীর শালবাগান এলাকায় বাড়ির কাছেই নির্মমভাবে কুপিয়ে তাকে খুন করা হয়।  অধ্যাপক রেজাউল ‘কোমলগান্ধার’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্টা ছিলেন। 
কাশিমপুরে প্রধান কারারক্ষী: গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের কয়েকশ’ গজ দূরে প্রধান কারারক্ষী রুস্তম আলীকে গত ২৫ এপ্রিল গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রুস্তম আলী ‘সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর’ পদে ছিলেন।
জুলহাস মান্নান ও তনয়: পার্সেল দেয়ার কথা বলে গত ২৫ এপ্রিল বিকেলে কলাবাগানের লেক সার্কাস এলাকায় ৫/৭ যুবক জুলহাস মান্নানের বাসায় ঢুকে তাকে এবং তার বন্ধু তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে। সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাময়িকী ‘রূপবান’ সম্পাদক জুলহাস আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনির খালাতো ভাই। মাহবুব রাব্বী তনয় ছিলেন লোকনাট্য দলের কর্মী। পিটিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ‘শিশু নাট্য প্রশিক্ষক’ হিসেবেও তিনি কাজ করতেন। আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ (একিউআইএস) শাখা ওই হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করলেও পুলিশ অভিযুক্ত করে দেশীয় উগ্রপন্থীদের।
নিখিল জোয়াদ্দার: টাঙ্গাইলের গোপালপুরে নিখিল জোয়াদ্দার নামে এক দর্জিকে গত ৩০ এপ্রিল প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ধর্ম নিয়ে নিখিল নাকি কয়েক বছর আগে কটূক্তি করেছিলেন বলে প্রচার ছিল। তখন তার বিরুদ্ধে মিছিল এবং তার বাড়ি আক্রান্ত হয়েছিল।
রাজশাহীতে পীর : শিক্ষক রেজাউল করিমের মতো একই কায়দায় গত ৭ মে কুপিয়ে হত্যা করা হয় শহিদুল্লাহ নামে এক ‘পীর’কে। গোয়ালন্দঘাটের পীর নূর মোহাম্মদ দয়ালের ভক্ত ছিলেন শহিদুল্লাহ। এ ঘটনায় মামলা হলেও রহস্য উদঘাটিত হয়নি।
বৌদ্ধ ভিক্ষু: বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে মং শু হুক (৭৫) নামে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ১৪ মে সকালে বাইশরি বৌদ্ধবিহারের ভেতর তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায়। জানা যায়, দুই বছর আগে বৌদ্ধমন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভিক্ষু মং শু হু সেখানে ধ্যানমগ্ন থাকতেন।
খাদিজা হত্যাচেষ্টা: গত ৩ অক্টোবর সিলেটের এমসি কলেজে বিএ (পাস) পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার সময় হামলার শিকার হন খাদিজা। সিলেট থেকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে এনে প্রথমেই লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাকে। কয়েকদিন পর লাইফ সাপোর্ট খুলে দুদফা অস্ত্রোপচারের পর ৫৩ দিন পর আশঙ্কামুক্ত হন খাদিজা। হাসিমুখে সাংবাদিকদের সামনে আসেন, দেশবাসীর কাছে দোয়া চান। এ ঘটনায় তার হত্যাচেষ্টাকারী ছাত্রলীগ নেতা বদরুলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানন্দি দেয় বদরুল। দেশজুড়ে এই বর্বর হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ব্যাপক আন্দোলন ও আলোচনা হয়।
বন্দুকযুদ্ধ
সারাদেশে চলতি বছরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে ১৯৭ জন। এই সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সূত্র মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ক্রসফায়ারে ১৮১ জন নিহত হয়েছে। নিরাপত্তা হেফাজতে নিহত হয়েছে ৩১ জন। এই ৩১ জনকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আগেই আটক করেছিল।
৮ ডিসেম্বর ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও ফরিদপুর সদরে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ চারজন নিহত হয়। নিহতরা হল-কেরানীগঞ্জের মনতাজুল ইসলাম (৩৫) ও সাঈদ আহমেদ ওরফে সবুজ (৩২) এবং ফরিদপুরে ফারুক ফকির (৪৫) ও হৃদয় হোসেন মানিক ওরফে ল্যাংড়া মানিক (৩০)। পুলিশ বলছে, চারজনই ডাকাত দলের সদস্য। ৭ ডিসেম্বর সুন্দরবনে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই বনদস্যু নিহত হয়। ৬ ডিসেম্বর রাতে মেহেরপুরের গাংনীতে পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিন যুবক নিহত হয়। পুলিশের দাবি নিহতরা চরমপন্থী দলের সদস্য। শেষরাতের দিকে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার পুরান মটমুড়া গ্রামের একটি ইটভাটায় চাঁদা নিতে এসে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তারা নিহত হয় বলে মেহেরপুর জেলার পুলিশ সুপার আনিছুর রহমান জানান। এছাড়াও একই রাতে ধামরাইয়ে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হানিফ আলী নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়, যাকে পুলিশ ডাকাত ও ছিনতাইকারী হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।
৫ ডিসেম্বর দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার রানীগঞ্জের কলাবাড়ী এলাকায় ধানক্ষেত থেকে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তিনজনের বাড়ি নাটোরে। তারা সেখানকার যুবলীগকর্মী বলে জানা গেছে। তারা হল-রেদোয়ান সাব্বির, আবদুল্লা ও সোহেল। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তাদের তুলে নেওয়া হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ২৫ ডিসেম্বর ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে শরীফ নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, তিনজনের বিরুদ্ধেই মামলা রয়েছে। ১ ডিসেম্বর রামপুরায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ২ যুবক। 
চলতি মাসে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় কমপক্ষে ১৬ জন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এদের বেশিরভাগই ডাকাত, তারা ছিনতাইয়ের সময় বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, এরা সন্ত্রাসীদের দু’পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে পড়ে কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।
২৪ নবেম্বর এক রাতে ফরিদপুরের মধুখালী ও পাবনার ঈশ্বরদীতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ছয়জন নিহত হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নবেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ১৮১ জন কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ এবং ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়। এর মধ্যে র‌্যাবের হাতে ৫৬ এবং পুলিশের হাতে ১০৮ জন নিহত হয়। এছাড়া গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ১৩, আনসার-রেল পুলিশের হাতে এক ও বিজিবির হাতে তিনজন নিহত হয়। এর মধ্যে গ্রেফতারের আগে ১১৯ এবং নিরাপত্তা হেফাজতে ৩১ জন নিহত হয়। এছাড়া গ্রেফতারের আগে শারীরিক নির্যাতনের কারণে ছয়জন এবং গ্রেফতারের পর নির্যাতনের কারণে পাঁচজন নিহত হয়। 
ধর্ষণ-নারীর প্রতি সহিংসতা
এদিকে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যে জানা গেছে, চলতি বছরের নবেম্বর মাসে সারা দেশে ৩৮২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৮৮ জন, যার মধ্যে ১৫টি শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬ জনকে। ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১২ জনকে। এ ছাড়া এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৪ হাজার ১৪৪ জন নারী বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে মহিলা পরিষদ। এই সময়ের মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৭৫ জন। গণধর্ষণের শিকার ১৩৪ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩১ জনকে, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৪০ জনকে। উত্ত্যক্ত ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৩৩১ জন। এর মধ্যে উত্ত্যক্ত করা হয়েছে ২৪০ জনকে। উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৮ জন, প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় নির্যাতন করা হয়েছে ১২ জনকে এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৭১ নারী।
২৯ অক্টোবর রাজধানীর ভাটারায় পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ করে তার পরিবার। রাতে শিশুটিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটির বাবা বলেন, সকালে তার মেয়ে বাসায় ফেরার পথে স্থানীয় শাহীন (২৫) ও নাজমুল (২৭) ডেকে নিয়ে পাশের সমির উদ্দিন মার্কেটের ২য় তলায় নিয়ে যায়। এদের সহযোগিতায় ভাটারা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল আমিনের ছোট ভাই রাশিদুল (৩০) তাকে ধর্ষণ করে এবং কাউকে না বলার জন্য হুমকি দেয়। সন্ধ্যায় মেয়েটি  বাসায় এসে ঘটনা খুলে বলে। পরে তাকে ঢামেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়।
অপরদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বহির্বিভাগে তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় ৬ আনসার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও পরে একজনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ঢামেক হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার সূত্রে জানা যায় ওই তরুণী জানিয়েছেন, গত ২৯ অক্টোবর বহির্বিভাগের তৃতীয় তলায় ছয় আনসার তাকে ধর্ষণ করে। ওই দিন গাইনি বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে পরদিন ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি হয়। তার ফরেনসিকসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় কয়েকজনের ধর্ষণের আলামত মিলেছে। ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জের দৌলতপুর এলাকায় চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয় বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করেন। ২ নবেম্বর ওই শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিশুটির বাবা এই অভিযোগ করেন। এদিকে ওই ঘটনায় অভিযুক্ত হুরমুজ মৃধার বয়স নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। শিশুটির স্বজনরা তার বয়স ৬০ বছর বলে জানালেও দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুরমুজের বয়স ৮৫ বলে দাবি করেছেন।
১ নবেম্বর রাজধানীর খিলক্ষেত থানার ডুমনী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে দুই শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। এ বিষয়ে থানায় পৃথক দুটি অভিযোগ দায়ের করেছে ওই দুই শিশুর মায়েরা। তবে, তদন্ত শুরু করলেও এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বলে সন্দেহ করেছে পুলিশ। এদিন বিকালে খিলক্ষেত থানায় মুক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে দুই শিশুকে ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ করেছেন নির্যাতিতাদের মায়েরা। খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল হক বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। আমাদের একজন কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২৯ অক্টোবর রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় এক আদিবাসী তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত এক তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। গত ২৬ অক্টোবর উত্তর বাড্ডার পুরান থানা রোডের একটি বাসায় ওই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। সন্ধ্যায় বাড্ডা থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ ওই তরুণীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য পাঠায়। বর্তমানে তাকে ঢামেকের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে তরুণীর অভিযোগ পাওয়ার পর বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সালাউদ্দিন নামে এক অভিযুক্তকে আটক করেছে পুলিশ। বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফারুক বলেন, ওই তরুণী একটি পার্লারে কাজ করেন। তার অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে ইতিমধ্যে একজনকে আটক করেছি। বাকিদের আটকের চেষ্টা চলছে।
এদিকে দিনাজপুরে পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলায় আসামি সাইফুল ইসলামকে আটক করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ-গত ১৮ অক্টোবর শিশুটি নিখোঁজ হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওই দিন তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন ভোরে শিশুটিকে তার বাড়ির কাছে হলুদখেতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল, পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে শিশুটি এখন ঢাকা মেডিকেলে। ওর মাথা, গলা, হাত ও পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঊরুতে সিগারেটের ছ্যাঁকার ক্ষত। শিশুটির চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড শিশুটিকে পর্যবেক্ষণ করেছে। শিশুটির প্রজনন অঙ্গে সংক্রমণ দেখা গেছে। ঘটনার পর শিশুটির বাবা ২০ অক্টোবর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় সাইফুল ইসলাম (৪২) ও আফজাল হোসেন কবিরাজ (৪৮) নামের দুজনকে আসামি করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ