ঢাকা, মঙ্গলবার 03 January 2017, ২০ পৌষ ১৪২৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বার্ধক্যে মানসিক স্বাস্থ্য

তাজওয়ার তাহমীদ : যৌবনের শেষে আসে বার্ধক্য। যৌবনের উচ্ছলতা, চঞ্চলতা, অস্থিরতা আর অপরিপক্বতা পরিপূর্ণ হয় পরিপক্বতায়, যখন মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হয়। বার্ধক্য মানুষের পরিপক্ব বয়স। মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় বার্ধক্যে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, Old is gold. বাংলায় বলা হয়, যৌবনের বুদ্ধি গলায়, বার্ধক্যের বুদ্ধি মাথায়। তাই আমাদের সমাজে বয়স্ক ব্যক্তিরা সম্মানিত।
কৈশোরের উচ্ছলতা, যৌবনের কর্মচঞ্চলতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষাদীক্ষা, বিবাহিত সুখী জীবন, সম্মানজনক জীবিকা, সন্তানদের সুশিক্ষা, পরিবারের পরিচর্যা, সামাজিক কর্মধারা, ধর্মীয় জীবনধারা ইত্যাদির সমন্বয়ে একজন মানুষ সার্থকভাবে বয়স্ক হয়ে উঠতে পারেন। এই বয়স্ক, পরিণত মানুষটিই সংসার ও সমাজের অভিভাবক। তিনি সমাজ সংসারকে বিশ্লেষণ করেন তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে। যে সমাজে বিজ্ঞ অভিভাবক থাকে, সে সমাজ সহজেই কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয় না।
আমাদের সমাজে পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তিরাই বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। ১৯-৩৫ বছর বয়সটি যৌবনের পরিচায়ক। ৩৫-৬৫ বছর মাঝবয়স হিসেবে পরিচিত। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়স বার্ধক্য হিসেবে চিহ্নিত। বয়সের কালক্রমে মানুষের শরীরেও ঘটে নানা পরিবর্তন। বার্ধক্যের আসল সমস্যা বার্ধক্য নয়, আমাদের মন হচ্ছে মূল সমস্যা। কিশোরেরা যেমন কিশোর থাকতে চায় না, যুবকেরা তেমনি যৌবন হারাতে চায় না, তাই তারা বুড়ো হতেও চায় না। বুড়ো বয়স মানেই অবহেলার বয়স। বুড়ো বয়স মানেই অসুখ-বিসুখের বয়স। বুড়ো বয়সের পাকা চুলকে তাই সবাই কলপ লাগিয়ে কালো রাখতে চান। চুলের রঙ কালো করে তারা বোঝাতে চান যে, তাদের বয়স হয়নি। সামর্থ্যবানেরা রঙিন জামা পরে দেখাতে চান তারা এখনো যৌবনের রঙে রঙিন। অনেকে বুড়ো বয়সে যুবতী বিয়ে করেও তাদের যৌবনের অস্তিত্ব বোঝাতে চান, যেমন- নেলসন ম্যান্ডেলা তার ৮০তম জন্মদিনে গ্রাসাকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক বিজ্ঞানী হানে মান তার দ্বিতীয় স্ত্রী মাদাম মেলানিকে বিয়ে করেন ৮০ বছর বয়সে। সমাজের অনেক নামকরা বিখ্যাত ব্যক্তি এভাবেই তাদের যৌবনের জানান দেন বিয়ে করার মধ্য দিয়ে। সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে বুড়ো মানুষের যুবতী বিয়ে করার খবর পত্রিকান্তরে প্রকাশ হয়ে থাকে। বুড়ো বয়সে অনেক কবি-সাহিত্যিক তাদের আধুনিকতম কবিতাটি বা গল্পটি লিখে তাদের মনের যৌবন প্রকাশ করে থাকেন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধান কবি আল মাহমুদ তাই এখনো আধুনিক কবি। তাই বয়স মানুষকে বৃদ্ধ বানালেও মন তার যৌবনকে ধরে রাখতে পারে। আর যার মনে থাকে যৌবনের বসন্ত তাকে কেউ বুড়ো বলে অবহেলা করতে পারে না।
তারপরও সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিরা বিষণ্নতায় ভোগেন। ডিপ্রেশন এবং পারকিনসনস ডিজিজ তাদের কাবু করে ফেলে। সহজ-সরল বিষয়গুলোও তারা ভুলে যান। পরিবার ও সমাজে এ জন্য বুড়োদের অনেকে অবহেলা করেন। তীক্ষ্ণ স্মরণশক্তির ব্যক্তিও বয়স হলে অনেক কিছু ভুলে যান। এটা তাদের দোষ নয়। এটাই তাদের বয়সের পরিচয়। এ বয়সে নানা দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধে। যেমন- কোনো চাকরিজীবী যখন অবসরে যান, তখন তার মনে আর্থিক সমস্যার বিষয়টি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি পেনশন কিংবা কর্মসূত্রে পেনশন অথবা লগ্নি থেকে আয়, এমনকি বাড়িগাড়ির মালিক হয়েও মনের মধ্যে বাসা বাঁধে তার বার্ধক্য চিন্তা। বার্ধক্যজনিত অবক্ষয় বা Senile degeneration যতটা ঘটে শরীরে, তার চেয়ে বেশি ঘটে মনের মধ্যে। তাই দেখা যায়, যে লোকটির ব্লাডপ্রেসার এতদিন স্বাভাবিক ছিল, সে এখন উচ্চ রক্তচাপের রোগী হয়ে গেল। কারণ, বয়সের কারণে তার আবেগগত পরিবর্তন ঘটে যায়। তাই তিনি অতি সংবেদনশীল। বিজ্ঞানের ভাষায়, বার্ধক্যে মস্তিষ্ক ছোট হয়ে আসে, যাকে বলা হয় ব্রেন এট্রফি। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এ জন্য কেউ কেউ আলঝেইমারস ডিজিজ বা ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত হন। ফলে তার স্মৃতিশক্তি কমে যায়, আবেগ, অনুভূতি, বিচারবুদ্ধি, বিবেচনাশক্তি, চিন্তাশক্তি, কার্যশক্তিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এ সময় অনেকের আচার-আচরণে শিশুসুলভ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। স্মৃতিশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তিÑ এ তিন প্রয়োজনীয় শক্তি বার্ধক্যে হ্রাস পায়। প্রশান্তির নিদ্রাও কমে যায়। দীর্ঘ রাত জেগে থাকা তার মনোব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষদের মনোব্যথার সাথে যোগ হয় প্রস্রাবের সমস্যা। প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হলে প্রস্রাবের সমস্যা তীব্র হয়। তা ছাড়া বয়সের কারণে কিডনির ছাঁকার ক্ষমতাও লোপ পায়। অনেক সময় কিডনি ফেইলিউর হলে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর যারা ডায়াবেটিসে ভোগেন, তাদের কিডনি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বয়স বাড়লে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়াশীলতা কমে যায়। প্রয়োজনীয় রক্তচাপ সৃষ্টির ক্ষমতা কমে যায়। রক্তনালী সরু হয়ে যায়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি হতে পারে। বয়স বাড়লে খাবারদাবারে পরিবর্তন আসে। এ সময় পাকস্থলীতে হাইড্রোক্লোরিক এসিডের ক্ষরণ কমে যায়। ফলে হজম ক্ষমতাও অনেক লোপ পায়। কারো কারো কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়মিত কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বৃদ্ধ বয়সে ফুসফুস বাতাস টেনে নিয়ে প্রয়োজনমতো ছাড়তে পারে না। কারণ, বুকের পাঁজরগুলো এ সময় অনেক কঠিন হয়ে যায় এবং পেশিগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় বুকের ওঠানামায় সাহায্য করতে পারে না। এ সময় ব্রঙ্কাইটিস এবং এমকিসিমা (ফুসফুসের অস্বাভাবিক স্ফীতি) বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া নিউমোনিয়া ও যক্ষ্মার প্রকোপও বয়স্কদের নিয়মিত সমস্যা হিসেবে দেখা যায়। বয়স বাড়লে শরীরে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যায়। হাড়গোড় নরম হয়ে যায়। তাই অল্প ধাক্কাতেই হাড় ভেঙে যেতে পারে। অস্টিওপরেসিস, অস্টিওআথ্রাইটিস এ সময় বেশি দেখা দেয়।
বয়সকালে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। ফলে ভয়ঙ্কর রোগ ক্যান্সার দেখা দেয়। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির ফলে বার্ধক্যের রোগ চিকিৎসাও সহজ হয়ে গেছে। নিয়মিত মেডিক্যাল চেকআপ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে সুস্থ সবল রাখা বৃদ্ধদের জন্য এখন কোনো সমস্যাই নয়। বার্ধক্যে সাইকোথেরাপিস্টের পরামর্শ গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে মনোচিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভালো থাকতে পারেন। যৌন সক্রিয়তার বিষয়টি এ সময় বিবেচ্য বিষয়। পুরুষ বার্ধক্যে যৌন সক্রিয়তা বজায় রাখতে সক্ষম। যদিও বয়সের কারণে ইচ্ছাশক্তি হ্রাস পায়। নারীর রাজোঃনিবৃত্তির (মাসিক বন্ধ হওয়া) পর হরমোনগত কারণে যৌনক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেয়। ফলে মানসিকভাবে সে বিষণ্নতায় ভোগে। এ জন্য অনেক চিকিৎসক হরমোন ড্রাগ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কিন্তু এই হরমোন থেরাপি ব্রেস্ট ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। এমনই অবস্থায় তাকে একজন মনোচিকিৎসক উপযুক্ত পরামর্শ দিতে পারেন। বার্ধক্যে অসুখ-বিসুখের সাথে মৃত্যুচিন্তা পেয়ে বসে অনেককে। ধর্মচিন্তা, ধর্মচর্চা এবং জীবনকে সংশোধনের শেষ চেষ্টায় ব্যস্ত থাকেন বয়োবৃদ্ধ মানুষেরা। হ্যাঁ, এ সময় এমনটি হতেই পারে। পরকালের জীবন নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন থাকেন। তাই এ সময় অনেকেই ধর্মীয় বিধানের সত্যিকার অনুসারী হয়ে যান। আমরাও বলে থাকি, জীবনগ্রন্থ আল কুরআনের অনুসারীরা মনপ্রাণ দিয়ে আল্লাহর বিধানকে জানা, বোঝা ও মানার চেষ্টা করুন। অবসর সময়ের অফুরন্ত সময়কে ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চায় ব্যস্ত রাখতে পারলে পার্থিব জীবনে পাওয়া যাবে প্রশান্তি আর পরকালে মুক্তি। বার্ধক্যে পরিবার-পরিজনের সাথে একত্রে বসবাস নিজেকে সুস্থ রাখার অন্যতম উপায়। ওল্ডহোম বা বৃদ্ধনিবাসের ধারণা মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। সন্তানেরা বৃদ্ধ পিতামাতার সার্বিক দেখাশোনা করবে এটাই মুসলিম সমাজের অন্যতম আদর্শ। কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে, ‘অর্থাৎ আমি মানুষকে তার পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।’ (সূরা: আনকাবুত-৮)। পবিত্র কুরআনে আরো অনেক আয়াতে পিতামাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মহানবী সাঃ ও অন্যান্য ধর্মের আদর্শেও পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ রয়েছে।
বার্ধক্যের নানা সমস্যা সমাধানে নিজেকেই সচেতন থাকতে হবে। নিজেকে বৃদ্ধ না ভেবে সুস্থ সবল ভাবাই শ্রেয়। সব সময় নিজেকে কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে। অর্থ উপার্জনের কাজ প্রয়োজন না হলে সমাজকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হবে। পরিবার-পরিজনের সাথে সময় কাটাতে হবে। নিয়মিত মেডিক্যাল চেকআপ করাতে হবে। নিজের মধ্যে ইতিবাচক চিন্তার প্রবাহ বাড়াতে হবে। একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে হবে।
-ইসলামিক সাইকোথেরাপী ফিচার

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ