ঢাকা, মঙ্গলবার 03 January 2017, ২০ পৌষ ১৪২৩, ০৪ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঠাণ্ডা জ্বরের প্রতিকার

ডা. আবু আহনাফ : কমন কোল্ড বা ঠাণ্ডা লাগা। আমাদের দেশে ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ঠাণ্ডা লাগলে রোগী অসুস্থ বোধ করে, জ্বর জ্বর ভাব লাগে, মাথা ধরে, নাক দিয়ে পানি ঝরে। হাঁচি আসে। নাক দিয়ে শ্লেষ্মা বেরোতে পারে। নাক বন্ধ হতে পারে। গলা ব্যথা হতে পারে, রক্তের শ্বেতকণিকার সংখ্যা বাড়তে পারে।
ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা বড়দের তুলনায় ছোটদের মধ্যে বেশি। বিভিন্ন ভাইরাসের কারণেই আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় ঠাণ্ডাজনিত অসুস্থতা দেখা যায়। ছোটশিশুদের বছরে প্রায় সাত-আটবার এই ঠাণ্ডাজনিত ভাইরাল সংক্রমণ দেখা যায়। ছোটশিশুরা বাড়িতে থাকলে যত না বেশি অসুস্থ হয়, তার চেয়ে বেশি স্কুল খোলা থাকলে অসুস্থ হয়। কারণ ক্রস ইনফেকশনের মাধ্যমে ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলে কোনো শিশুর ঠাণ্ডা সংক্রমণ থাকলে তা অন্য শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তাই কোনো শিশু ঠাণ্ডা লাগাজনিত কারণে অসুস্থ হলে তাকে জোর করে স্কুলে পাঠানোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হলেই তাকে স্কুলে পাঠাতে হবে। তা ছাড়া শিশুর সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
ঠাণ্ডা লাগার মতো প্রতিদিনের রোগ পৃথিবীতে আর দু-একটি আছে কি না সন্দেহ। অতি প্রাচীনকাল থেকেই ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা বিদ্যমান। বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় ঠাণ্ডা লাগা হচ্ছে আসলে শ্বাসনালীর ওপরের আস্তরণে একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। ঠাণ্ডা লাগার প্রধান ভাইরাসটির নাম রাইনোভাইরাস। এই ভাইরাসের ১১৩টি রকম ভেদ রয়েছে। প্রায় ৫০ ভাগ সর্দি-কাশির কারণ হলো এই ভাইরাস। বাকি ৫০ ভাগ ঠাণ্ডার জন্য যে কোন ভাইরাস দায়ী, তা এখনো জানা যায়নি। ঠাণ্ডা লাগা ব্যাকটেরিয়ার কারণেও ঘটতে পারে; যেমনÑ স্ট্রেপটোকক্কাই। ব্যাকটেরিয়াজনিত ঠাণ্ডা লাগার সাথে গলাব্যথা, গলা ফোলা, গলায় ঘা থাকতে পারে। আরো যেসব কারণে ঠাণ্ডা লাগতে পারে তার মধ্যে রয়েছে ধূলিকণা, যা শ্বাসের সাথে শরীরে ঢুকে ঠাণ্ডা লাগার মতো লক্ষণ সৃষ্টি করে। যেসব লোকের রক্তের প ‘এ’ ও ‘এবি’ তাদের ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা বেশি। মেয়েদের ঋতুচক্রের মাঝামাঝি সময়ে ঠাণ্ডা লাগার প্রবণতা থাকে। এর কারণ এখনো জানা যায়নি।
ঠাণ্ডা লাগার অতি পরিচিত নাম ইনফ্লুয়েঞ্জা। বছরের যেকোনো সময়ই এটি হতে পারে। তবে শীত ও শরতেই এর প্রকোপ বেশি। ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ ও ‘বি’ ঘটায় পরিচিত ফ্লু রোগ, মানে নাক ও গলায় সংক্রমণ। অনেক সময় হঠাৎ জ্বর বাড়তে পারে (১০১ ডিগ্রি পর্যন্ত), সাথে গলাব্যথা, বুকব্যথা, দুর্বলতা, গা ম্যাজ ম্যাজ করা।
অনেকের গরমের সময় ঠাণ্ডা লাগে। এর নাম গ্রীষ্মকালীন ঠাণ্ডা লাগা। সাথে জ্বর, হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা। এ জন্য দায়ী যে ভাইরাস তার নাম এন্টারোভাইরাস। এরা থাকে শরীরের পাকস্থলীতে। প্রায় দশ শতাংশ ঠাণ্ডা লাগার জন্য দায়ী এই ভাইরাস। আরো একটি অতি পরিচিত ভাইরাস, যার নাম রেসপিরেটরি সিনসিটিয়াল ভাইরাস সংক্ষেপে আরএসভি। এ ভাইরাসের সংক্রমণে ঠাণ্ডা লাগা থেকে শুরু করে নিউমোনিয়া পর্যন্ত হতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী জুড়ে প্রায় প্রত্যেক শিশুই একবার এ ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে থাকে। জন্মের তিন সপ্তাহ পর থেকে এক বছর সময় পর্যন্ত শিশুদের এ ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। সংক্রমণ জটিল হয়ে নিউমোনিয়া এমনকি মস্তিষ্কের ক্ষতি পর্যন্ত হতে পারে। তিন বছর বয়সের পর আরএসভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়।
ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে সারা বিশ্বে জোর প্রচেষ্টা চলছে। প্রতিষেধক হিসেবে ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল খাওয়ার ব্যাপারে জোর দেয়া হচ্ছে। ভিটামিন ‘সি’ শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করে। ফলে ভাইরাস সংক্রমিত কোষগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ভিটামিন ‘সি’ দেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষকের উৎপাদন বাড়ায়। যেমন- ইন্টারফেরন, প্রোস্টাগ্লান্ডিন, টি লিম্পোসাইট ও ইম্যুনোগ্লবুলিন প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়। ভিটামিন ‘সি’র রয়েছে হিস্টামিনবিরোধী কার্যকারিতা। ফলে দেহের অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ে। দেহ হয় বিষমুক্ত।
ঠাণ্ডা লাগার প্রতিরোধ প্রক্রিয়া নিয়ে বহু আলোচনা রয়েছে। কিভাবে ঠাণ্ডা লাগা এড়ানো যায়, তা নিয়ে বহু গবেষণাও রয়েছে। হাঁচি, কাশি এমনকি চুমু খাওয়ার মাধ্যমেও ঠাণ্ডাজনিত ভাইরাস ছড়ায় বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। বাস্তবে হাতের সাথে হাতের সংস্পর্শেই ঠাণ্ডার ভাইরাস বিস্তার লাভ করে।
একজন সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে একজন সুস্থ ব্যক্তি হাত মেলালে, এমনকি সংক্রমিত ব্যক্তির দরজার যে হাতল ছুঁয়েছেন, সেই হাতল ধরলেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ রকম স্থানে তিন দিন পর্যন্ত ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে। তাই এ সংক্রমণ এড়াতে সবাইকে বারবার হাত ধোয়ায় উৎসাহিত করুন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। খুব বেশি ঠাণ্ডা লাগলে বিশ্রাম নিন, প্রচুর পানি পান করুন এবং ভিটামিন ‘সি’ সেবন করুন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ