ঢাকা, বুধবার 04 January 2017, ২১ পৌষ ১৪২৩, ০৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিদেশী টিভি চ্যানেলে দেশী বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে

সরকার বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেলে বাংলাদেশের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গত সোমবার তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিবরণীতে জানানো হয়েছে, কেবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন-২০০৬ অনুযায়ী নেয়া এ সিদ্ধান্ত অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্ট বিদেশী টিভি চ্যানেলের প্রচার সংক্রান্ত সরকারের দেয়া অনাপত্তি ও অনুমতি প্রত্যাহার এবং লাইসেন্স বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য, বিভিন্ন বিদেশী টিভি চ্যানেলে দেশীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিতে বেশ কিছুদিন ধরে এদেশের বেসরকারি টিভির মালিক, সাংবাদিক ও কলাকুশলীরা আন্দোলন করে আসছিলেন। এ উদ্দেশ্যে গত মাস নবেম্বরে তারা মিডিয়া ইউনিটি নামের একটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছেন। একাধিক সংবাদ সম্মেলন ও অনুষ্ঠানে মিডিয়া ইউনিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাধাহীন অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে বাংলাদেশী বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যখন অনেক চ্যানেলের পক্ষে এমনকি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাও অসম্ভব হতে পারে। মিডিয়া ইউনিটি আরো বলেছে, এদেশের কিছু পণ্যের বিজ্ঞাপন ভারতের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশের বেসরকারি সকল টিভি চ্যানেলের আয় কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে এদেশী টিভি চ্যানেলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। তেমন অবস্থায় বেকার হবে হাজার হাজার সাংবাদিক, কলাকুশলী ও শ্রমিক-কর্মচারী। আনুমানিক একটা হিসাব দিয়ে মিডিয়া ইউনিটির নেতারা জানিয়েছেন, বিজ্ঞাপন প্রচারের নামে গত অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ ভারতে পাচার হয়ে গেছে। আরো বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অপেক্ষায় রয়েছে। বিষয়টিকে মানি লন্ডারিং হিসেবে অভিহিত করে মিডিয়া ইউনিটির নেতারা বলেছেন, এর মাধ্যমে একদিকে দেশীয় টিভির অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অবৈধ পথে পাচার করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তাছাড়া সরকারও তার প্রাপ্য ট্যাক্স থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্যই টাকা পাচার বন্ধের লক্ষ্যে নভেম্বরের মধ্যে বিদেশী টিভি চ্যানেলে দেশীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছিল মিডিয়া ইউনিটি।
এটা ছিল সংগঠনটির অল্টিমেটাম। নেতারা সেই সাথে ঘোষণা করেছিলেন, ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ না করা হলে যে কোনো মূল্যে সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। মিডিয়া ইউনিটির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল দেশের খ্যাতনামা অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক-প্রযোজক এবং কলাকুশলীদের সংগঠন ফেডারেশন অব টেলিভিশন প্রফেশনালস অরগানাইজেশন বা এফটিও। এক সংবাদ সম্মেলনে এফটিও’র নেতারাও ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন প্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তারাও নভেম্বর মাসের মধ্যে ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এবং দেশীয় সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রচার বন্ধ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন। কিছুটা বিলম্বে হলেও সরকার অবশেষে মিডিয়া ইউনিটি এবং এফটিওর তথা টিভি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে জড়িতজনদের দাবি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়েছে। ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ না করলেও ওইসব চ্যানেলে এদেশীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ করেছে।
আমরা বিদেশী তথা ভারতীয় টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে যথার্থ মনে করি এবং স্বাগত জানাই। এ ধরনের সিদ্ধান্ত আসলে অনেক আগেই নেয়া দরকার ছিল। কারণ, সমস্যা হঠাৎ করে কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হয়নি। পর্যালোচনায় দেখা যাবে, এমন অবস্থার পেছনে রয়েছে ভারতীয়দের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য, যাতে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়। বাস্তবেও বিগত মাত্র কয়েক বছরে অবস্থা এমন হয়েছে যখন মনেই হয় না যে, বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির আলাদা বা স্বাধীন কোনো জগত আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ভারতীয়দের এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এদেশেরই একটি বিশেষ গোষ্ঠী বহু বছর ধরে সেবাদাসের ভূমিকা পাল করে এসেছে। মূলত তাদের কারণেই বাংলাদেশের কোনো টিভি অনুষ্ঠান মানসম্পন্ন ও আকর্ষণীয় হতে পারেনি। মিডিয়া ইউনিটির নেতারাও কথাটা স্বীকার করে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, অনুষ্ঠানের মান ভালো নয় বলেই বাংলাদেশের দর্শকরা ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এখন থেকে মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান নির্মাণের অঙ্গিকার করেছেন তারা, যাতে দর্শকদের ফিরিয়ে আনা যায়। কথাটার তাৎপর্য লক্ষ্য করা দরকার। কারণ, একই কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন কোম্পানিও তাদের বিজ্ঞাপন ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচার করেছে। বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা স্বাভাবিকও। কারণ, যে দর্শক তথা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য বিজ্ঞাপন প্রচার করা সে দর্শকরা এদেশের নি¤œমানের ও কুরুচিপূর্ণ অনুষ্ঠান দেখে না বললেই চলে। এজন্যই বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানিগুলোও ভারতীয় চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচার করতে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুতর। সুতরাং একতরফা দোষারোপের পরিবর্তে প্রতিবিধানের জন্য বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে অবশ্যই নিজেদের অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে হবে। আশার কথা হলো, অনেক বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টজনেরা বুঝতে পেরেছেন, কেন ভারতীয় টিভির বাধাহীন বিস্তার ঘটেছে এবং কেন বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো কঠিন প্রতিযোগিতা ও চাপের মুখে পড়েছে। এর ফলে একদিকে বাংলাদেশী চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপন আয় অনেক কমে গেছে, অন্যদিকে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অর্থ। আমরা আশা করতে চাই, এদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর সঙ্গে জড়িতজনেরা দেশপ্রেমিক ভূমিকা পালন করবেন এবং সচেষ্ট থাকবেন যাতে দেশীয় টিভির সকল অনুষ্ঠান মানসম্মত ও আকর্ষণীয় হয়। যাতে দর্শক তথা সাধারণ মানুষ ভারতীয় টিভির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে উৎসাহিত হয়। এখানে সরকারের দায়িত্ব সম্পর্কেও বলা দরকার। কেবল বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করাই যথেষ্ট নয়। এদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশকে বাধাহীন করার স্বার্থেও সরকারের উচিত ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রচার ও প্রাধান্যের অবসান ঘটানো। এজন্য প্রয়োজনে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচারও নিষিদ্ধ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ