ঢাকা, বৃহস্পতিবার 05 January 2017, ২২ পৌষ ১৪২৩, ০৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গুলশান মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড

গত মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশান এক নম্বরে অবস্থিত ডিসিসি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অগ্নিকাণ্ডে মাত্র ১৬ ঘণ্টার মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বিরাট এ মার্কেটের ছোট-বড় কয়েকশ’ দোকান। হাজার কোটি টাকার অংকে বিনিয়োগ করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। ছিল কোটি কোটি টাকার নানা ধরনের পণ্যসামগ্রী। সেগুলোর সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেক দোকানে নগদ লাখ লাখ টাকাও ছিল। কিন্তু সবই পুড়ে গেছে অনেকটা চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে। প্রকাশিত খবরে এবং ফায়ার সার্ভিসসূত্রে জানা গেছে, অগুনের সূত্রপাত হয়েছিল সোমবার দিবাগত রাতে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টজনেরা জানিয়েছেন, প্রথমে আগুন ধরেছিল মার্কেটের দক্ষিণ দিকের কয়েকটি দোকানে। মুহূর্তেই সে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট এবং নৌবাহিনীর বিশেষ টিম সর্বাত্মক চেষ্টা করেও ১৬ ঘণ্টার আগে আগুন নেভাতে এবং পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। মঙ্গলবার রাত পর্যন্তও মার্কেটের বিভিন্ন অংশে ধোঁয়া বেরোতে দেখা গেছে। এর ফাঁকেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে শত শত কোটি টাকার পণ্য। সঙ্গে পুড়েছে নগদ অর্থও।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটকে অগ্নিকা-ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকে এমনকি জোর দিয়ে নাশকতার কথাও জানিয়েছেন। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ম-যুক্ত কোনো একটি ডেভেলপার কোম্পানি নাকি দশ বছরের বেশি সময় ধরে এই ডিসিসি মার্কেটের তিন বিঘা জমি হাতিয়ে নেয়ার এবং সেখানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, বিশেষ ওই কোম্পানিটিই ষড়যন্ত্র করে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্নিকা- ঘটিয়েছে। কোম্পানির উদ্দেশ্যে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এর মালিকরা মার্কেটের ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করে পুরো জায়গাটুকু নিজেদের দখলে নিতে চান। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে তারা ‘আইনসম্মতভাবে’ এর মালিকানাও অর্জন করতে চান। বলা হচ্ছে, প্রলোভন এবং ভয়-ভীতি দেখানোসহ সম্ভাব্য সকল পন্থায়ই তারা চেষ্টা করে দেখেছেন, কিন্তু মার্কেটের দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা রাজি হননি। সে কারণেই শেষ পর্যন্ত বিশেষ কোম্পানিটি ষড়যন্ত্রের তথা অগ্নিকা-ের মাধ্যমে ধ্বংসাত্মক পন্থা অবলম্বন করেছে। তাদের জ্বালানো আগুনে সম্পূর্ণ মার্কেটই ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ষড়যন্ত্রের এই অভিযোগ গুরুতর হলেও তথ্যাভিজ্ঞরা কিন্তু দ্বিমত পোষণ করতে পারেননি। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলেছেন, অগ্নিকাণ্ড ঘটানো হয়েছে গান পাউডার দিয়ে। কারণ, গান পাউডার ছাড়া এত অল্প সময়ে এত বেশি স্থানে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে না। তাছাড়া মার্কেটের একাংশের ছাদ ভেঙে পড়াও সাধারণ অগ্নিকাণ্ডে সম্ভব নয়। এভাবে সব মিলিয়েই জোর দিয়ে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ড আসলে সুপরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। 
গুলশান মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড এবং এর ক্ষয়ক্ষতিতে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করি। মঙ্গলবারের অগ্নিকাণ্ডে শুধু শত শত কোটি টাকার পণ্যসামগ্রীই পুড়ে যায়নি, পুড়েছে বহু মানুষের স্বপ্ন ও কপালও। এসব হতভাগ্যের মধ্যে মালিক ও শিল্প-উদ্যোক্তারা যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক-কর্মচারীও। ক্ষুদে অনেক বিনিয়োগকারীও এর ফলে পথে বসেছেন। দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতির পাশাপাশি জাতীয় স্বাার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও আমরা বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়ার পক্ষপাতী নই। আমরা মনে করি না যে,  বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ধরনের কোনো কারণে এত ভয়ংকর একটি অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। তাছাড়া আগুন নেভানোর চেষ্টা এবং সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এত বড় একটি অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে যত দ্রুত ও যত বেশি সামর্থ্য নিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা উচিত ছিল তেমনটি বাস্তবে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করা দরকার। সরকারের উচিত গুলশানের এই অগ্নিকা-কে নিতান্ত দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখা এবং দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখা। এজন্যই প্রথাগত তদন্ত কমিশনের পরিবর্তে এ ব্যাপারে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা এবং অগ্নিকাণ্ডের পেছনে সত্যিই কোনো বিশেষ কোম্পানি ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না তা খুঁজে বের করা সরকারের কর্তব্য। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকেও এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে হবে। দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকলে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একথা বুঝতে হবে যে, বিশেষ কোনো ডেভেলপার কোম্পানি কিংবা স্বর্থান্বেষী গোষ্ঠীর তুলনায় ওই মার্কেটের কয়েকশ’ দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীর স্বার্থ অনেক বড়। এজন্যই দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যেককে নগদ অর্থে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা আবারও কোমর সোজা করে দাঁড়াতে এবং নতুন পর্যায়ে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করতে পারেন। আমরা একই সাথে মার্কেটের শ্রমিক-কর্মচারীদের আর্থিক সাহায্য দেয়ার জন্যও সরকারের কাছে দাবি জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ