ঢাকা, বৃহস্পতিবার 05 January 2017, ২২ পৌষ ১৪২৩, ০৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আজ বিরোধী দলের ‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবসে কালো পতাকা মিছিল

স্টাফ রিপোর্টার : আজ ৫ জানুয়ারি। দিনটি বহুল আলোচিত-সমালোচিত। দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল দিবসটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা’ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ দেশের অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। সেই নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী মহাজোট। বাকি আসন গুলোতে নির্বাচন হলেও সেগুলোও ছিল ভোটার শূন্য। তখনকার সংবাদপত্রে ভোটের দিন কেন্দ্রের সামনে কুকুরের ঘুমানোর ছবি প্রকাশ কর হয়। এছাড়া অনেক কেন্দ্রে কোন ভোটই পড়েনি। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তখন সরকার এটিকে নির্বাচনের ধারাবাহিকতা বললেও নির্বাচনের কিছুদিন পরেই তারা সে বক্তব্য থেকে সরে আসে। ফলে দেশে শুরু হয় আবারো আন্দোলন। দিবসটি উপলক্ষে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট সারাদেশে কালো পতাকা মিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করে। অন্যদিকে দিবসটিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস আখ্যা দিয়ে আ’লীগও র‌্যালিসহ সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। বিরোধী শিবির থেকে যখন দিবসটি উপলক্ষে কালো পতাকা মিছিলের ঘোষণা দেয়া হয় তখন আ’লীগ সেটিকে প্রতিহতের ঘোষণা দেয়। ফলে দিবসটি পালন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মাঠ। বিএনপি বলছে, বাধা সত্ত্বেও তারা কর্মসূচি পালন করবে। এছাড়া ৭ জানুয়ারি দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার কথা রয়েছে বিএনপির। যদিও গতকাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে সমাবেশের কোনো অনুমতি মিলেনি। 

সূত্র মতে, নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ২০১৫ সালে বিএনপি ৫ জানুয়ারিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ এবং আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ পালনের ঘোষণা দিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিলে তৈরি হয় উত্তেজনা। পুলিশ ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সমাবেশের পথ বন্ধ করে দিলে খালেদা জিয়া টানা অবরোধের ঘোষণা দেন। এরপর তিনমাসে নজিরবিহীন আন্দোলন গড়ে তোলে বিএনপি। এতে অনেকেই হতাহত হয়েছেন। দশম সংসদের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গেল বছর ৫ জানুয়ারি নয়া পল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। আর আওয়ামী লীগ কর্মসূচি পালন করেছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে। এবারো দুইদিন পিছিয়ে সমাবেশের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এতে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীতে এক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস আখ্যা দিয়ে দেশব্যাপী কালো পতাকা মিছিল ও কালো ব্যাজ ধারণের কর্মসূচি দেয় দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আজ ৫ জানুয়ারি কালো পতাকা মিছিল করবে তার দল। আর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ জানুয়ারি হবে সমাবেশ। রিজভী বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে ইতোমধ্যে সারাদেশের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণ করার জন্য বলা হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালনের জন্য পুলিশ ও গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়েছেন বলে জানান। এদিকে একই দিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, দশম সংসদ নির্বাচনের তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে জনগণ বিএনপিকে রাজপথে কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেবে না। আওয়ামী লীগ ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ পালন করবে জানিয়ে হানিফ বলেন, জনগণ বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেবে না। বিএনপিকে এই দিবস নিয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে রাজপথে নামতে দেয়া হবে না।

এদিকে সরকারি দলের হুমকি, ধমক উপেক্ষা করে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে দেশের সব জেলা ও মহানগরে কেন্দ্রঘোষিত কালো পতাকা মিছিল অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গতকাল বুধবার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে রিজভী একথা জানান। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সরকারি দলের সব হুমকি ধমক উপেক্ষা করে সারা বাংলাদেশের জেলা ও মহানগরগুলোতে বিএনপি’র কালো পতাকা মিছিল ও কালো ব্যাজ ধারণ কর্মসূচি সাফল্যমণ্ডিত হবে। রাজনীতি ও যুদ্ধে দুটি মুহূর্ত থাকে উল্লেখ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, বিএনপি ক্রমাগত আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে বিক্ষোভ মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। ৫ ও ৭ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে তাও শান্তিপূর্ণ হবে।

রিজভী বলেন, ৫ জানুয়ারির এ দিনে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে জনগণকে করা হয়েছে পরাধীন। স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের অধিকার ও ইচ্ছাকে ধ্বংস করা হয়েছে। আর এটি করার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের যে সবচেয়ে বড় আকাঙ্খা গণতন্ত্র সেটিকে গলাটিপে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপি মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য নিরন্তর আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এদেশের ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারদের কবল থেকে অপহৃত গণতন্ত্রকে উদ্ধার করার জন্য যে মহিয়ান অবদান রেখেছে তাদের সেই কীর্তি চিহ্নকে বারবার ধুলোয় নিশ্চিহ্ন করেছে আওয়ামী লীগ। এরা নির্মম একদলীয় শাসনের মাধ্যমে রাজনীতিকে কুৎসিত রুপ দিয়েছে। রাজনীতির বর্তমান দুর্দশা থেকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। নি:শংক কোলাহলে সকল সংশয় ভয়জড়িত আর্তনাদকে উপেক্ষা করে মানুষের নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপি দৃঢ় পদে এগিয়ে যাবে। 

তিনবছর আগে ২০১৪ সালের এদিনে অনুষ্ঠিত একতরফা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ বিজয়ী হয় এবং তৃতীয়বারের মত সরকার গঠন করে। দলটি মনে করে, একাত্তরে যে চেতনা এবং রাজনৈতিক শপথে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল সেই চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র অর্জন বিলীন করার আকাশ সমান ষড়যন্ত্র থেকেও জাতি রক্ষা পায় এদিন। জাতীয় জীবনে এ দিনটি গণতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় দিন। দিবসটিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন ‘ গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করবে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। ওইদিন নির্বাচন না হলে মার্শাল ল হতো বাংলাদেশে। দেশের অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়তো। এই দিন নির্বাচন না হলে দেশে গণতন্ত্র থাকতো না। বাংলাদেশের অবস্থা থাইল্যান্ডের মত হত। আমরা কোথাও কোন সভা সমাবেশ করতে পারতাম না। এই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল বাধাকে অতিক্রম করে বাংলাদেশর গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাই আমরা এই দিবসকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসাবে পালন করবো। 

জানা গেছে, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগসহ মহাজোটভুক্ত সংগঠন আজ এই দিনটিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসাবে পালন করবে । এ উপলক্ষে গ্রহণ করা হয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি । আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- দলের জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে সমাবেশ ও বিজয় র‌্যালি । কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ দুপুর আড়াইটায় রাজধানী ঢাকার রাসেল স্কয়ার প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগ ঢাকা মহানগর উত্তর এবং ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ প্রাঙ্গণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সমাবেশ ও বিজয় র‌্যালির আয়োজন করেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি এক বিবৃতিতে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে দলের ঘোষিত কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের জন্য দেশের সকল জেলা, মহানগর ও উপজেলা আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সাথে তিনি দেশের সর্বস্তরের জনগণকে গণতন্ত্রের বিজয়ের এই ঐতিহাসিক দিনটি উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনের জন্য আহবান জানান।

বাংলাদেশ ন্যাপ : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করেছে অভিমত প্রকাশ করে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ আজ সকল দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে 'কালো দিবস' পালনের জন্য আহ্বান জানান। গতকাল গণমাধ্যেমে প্রেরিত এক বিবৃতিতে দলের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, যে গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এক সাগরের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করেছি আওয়ামী লীগ বার বার সেই গণতান্ত্রিক চেতনাকে আঘাত করেছে। এখন দেশে মূল সংকট গণতন্ত্রের সংকট। এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালের নির্বাচনে; যে নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর বিরাট আঘাত করা হয়েছে।

 নেতৃদ্বয় বলেছেন, আওয়ামী লীগের কাছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কিছুই নিরাপদ নয়। আমরা কে কি করলাম এটি বিষয় নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতার অনিবার্য পরিণতি থেকে স্বৈরশাসক আওয়ামী লীগের মুক্তি নাই। জনরোষের মুখে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত স্বৈরাচারের পতন হবে। বাংলাদেশ একটি পৈশাচিক হত্যার দেশে পরিণত হয়েছে। দেশ আজ এক চরম সংকটে পতিত হয়েছে। এই সংকট গণতন্ত্রের। এ সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন দরকার, যেখানে সব দলের অংশগ্রহণ থাকবে। এর বাইরে গোঁজামিলের রাজনীতির সুযোগ নেই। তারা বলেন, সরকারের গণবিরোধী অবস্থান ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার অপরাজনীতি বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ বয়ে আনছে। এ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণে সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ-সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোন বিকল্প নাই। আগামী বাংলাদেশে একটি দেশপ্রেমিক সরকার প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প নাই।

 নেতৃদ্বয় বলেছেন, রক্ত দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো আপস চলবে না। বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্যেই স্বাধীনতার সংগ্রাম। সুতরাং স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জনগণের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামের কোন বিকল্প নাই। অপশক্তির মদদে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে অধিষ্ঠিত সরকারের কাছে জাতি গণতন্ত্র আর আইনের শাসন প্রত্যাশা করে না। গণজাগরণ অথবা গণঅভ্যূত্থানের মাধ্যমেই চলমান অচল অবস্থা থেকে দেশকে মুক্তি দেয়ার কোন বিকল্প পথ খোলা নাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ