ঢাকা, বৃহস্পতিবার 05 January 2017, ২২ পৌষ ১৪২৩, ০৬ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লিটনের ভাই-বোনদের বক্তব্যে সর্বত্র তোলপাড়

  • শুধু জামায়াতকে ঘিরে যেন মামলার তদন্ত আটকে না থাকে : লিটনের বোন
  • এমপির নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ এবং প্রশ্ন তুলেছেন বড় ভাই শহিদুল ইসলাম

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের স্ত্রীসহ দলের শীর্ষ থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামীর ওপর দোষ চাপানোর শতভাগ চেষ্টা করলেও এই এমপির বোনেরা তদন্তে সব বিষয়কেই মাথায় রাখতে বলছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথায় লিটনের বোন তৌহিদা বুলবুল ও ফাহমিদা বুলবুল কাকলী কোনো কিছু স্পষ্ট না করেই বলেন, শুধু জামায়াতকে ঘিরে যেন হত্যা মামলার তদন্ত আটকে না থাকে। রোববার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক অভিযোগ করে বলেন এমপি লিটন হত্যায় জামায়াত-শিবির জড়িত। তিনি বলেন, জামায়াত-শিবির অনেক দিন থেকেই লিটনকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছিল। অবশেষে তার শেষ রক্ষা হলো না।

এরপর মঙ্গলবার নিহত এমপি লিটনের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপির নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ এবং প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন কে ওই নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি দিয়েছিল। কেনইবা এই ছুটি দেয়া হলো।

শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তার (লিটন) শত্রুদের বিষয়ে আমার ধারণা নেই। তবে এলাকার লোক তাকে হত্যা করতে পারে না। আমার ভাইকে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

লিটনের বড় ভাই শহিদুল ইসলামের এমন বক্তব্যে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অনেকেই বলছেন, লিটনের বড় ভাইয়ের এমন বক্তব্যে লিটন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ নতুন মোড় নিতে পারে।

এদিকে এতো আলোচনা সমালোচনার পর মুখ খুলেছেন এমপি লিটনের বোন তৌহিদা বুলবুল ও ফাহমিদা বুলবুল কাকলী। তারা বলেন, শুধু জামায়াতকে ঘিরে যেন হত্যা মামলার তদন্ত আটকে না থাকে। তার আগে লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতই তার স্বামীকে হত্যা করেছে বলে তার ধারণা।

আওয়ামী লীগের সেই অভিযোগ ও সন্দেহের মধ্যেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতে তাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।

এ দিকে, লিটন হত্যা ঘটনার ৫ দিন অতিক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ উদ্ধার করতে বা কিলিং মিশনের প্রকৃত খুনিদের গ্রেফতার করতেও সক্ষম হয়নি। যদিও গতকাল বুধবার পর্যন্ত এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৩৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এমপি লিটন হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার ভোর পর্যন্ত সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও চারজনকে আটক করেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে কারও নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ।

পুলিশ সূত্র থেকে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে প্রকৃত কোন তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না। তারা তদন্তের অজুহাতে এখনও বিষয়টি চাপা রাখছেন। পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলাম গতকাল বুধবারের ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিজ্ঞাসাবাদে জানান, সদর থানা পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা বিভাগ, পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত দল এই খুনের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনসহ খুনিদের গ্রেফতারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। অতিসত্ত্বর খুনের প্রকৃত তথ্য জানা যাবে এবং দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

তবে পুলিশের বিশেষ সূত্র থেকে জানা গেছে, শুরু থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নব্য জেএমবি, জঙ্গি, জামায়াত-শিবির, পারিবারিক শত্রুতা, রাজনৈতিক কোন্দল এবং জেলা পরিষদের নির্বাচনসহ যে ৫টি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও এখন জামায়াত-শিবির, পারিবারিক শত্রুতা এবং জেএমবি জঙ্গি এই ৩টি বিষয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে পারিবারিক কোন্দলের বিষয়টি উত্থাপিত হওয়াসহ লিটনের বোন ফাহমিদা বুলবুল কাকলী কর্তৃক থানায় দায়েরকৃত মামলার সূত্র ধরে মঙ্গলবার বিকেলে লিটন হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী পরিবারের লোকজন, কেয়ার টেকারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এজন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্যাহ আল ফারুক, সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি আতিয়ার রহমানসহ পুলিশের একটি তদন্ত দল লিটনের বাড়িতেই মামলার বাদী ফাহমিদা বুলবুল কাকলী, এমপি লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি, লিটনের শ্যালক বেদারুল আহসান বেতার, লিটনের ছেলে সাকিব সাদমান রাতিন, এমপির গাড়িচালক ফোরকান আকন্দ, বাড়ির কেয়ার টেকার ইসমাইল, ইউসুফ, সৌমিত্র, মাজেদুল ইসলাম, এমপির ভাগনি মারুফা সুলতানা শিমু, এমপি’র চাচী শামীম আরাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী শ্যালক বেদারুল আহসান বেতারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই জিজ্ঞাসাবাদের কারণ সম্পর্কে পুলিশ সুপারের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ ব্যাপারে তদন্তের স্বার্থে কোন কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান।

তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে ডেপুটি স্পিকারের মন্তব্য : গতকাল বুধবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স থেকে ফেরার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সাক্ষাতকারে ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া এমপি বলেন, লিটন হত্যার তদন্তের বিষয়টি যদিও পুলিশের ওপরই নির্ভর করছে। তবুও তিনি এ ব্যাপারে জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন। পুলিশ সুপার আশরাফুল ইসলাম তাকে জানিয়েছেন হত্যা মামলা তদন্তের অগ্রগতি হচ্ছে। খুব শিগশিগরই খুনিরা ধরা পড়বে এবং খুনের প্রকৃত তথ্যও জানা যাবে। ঘটনার সঙ্গে পারিবারিক কোন্দল জড়িত থাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এটা দুর্বৃত্তদের একটি অপপ্রচার এবং খুনের ঘটনাকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি এমন প্রচারণার নিন্দা জানান।

লিটনের বাড়ির সবাই ঢাকায় : এমপি লিটন হত্যার তিনদিন পর মঙ্গলবার তার কুলখানি অনুষ্ঠিত হয়। এজন্য বাড়িতে এবং ৫টি বিভিন্ন মাদ্রাসায় একযোগে তার কুলখানি উপলক্ষে কোরআন খানি, মিলাদ মাহফিল ও দরিদ্রদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষেই লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি এবং তার একমাত্র সন্তান ঢাকাস্থ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এ লেভেলের ছাত্র সাকিব সাদমান রাতিন ঢাকা থেকে আসা লিটনের বোন ও আত্মীয়-স্বজনরা মঙ্গলবার রাতেই ঢাকায় ফিরে আসেন।

বাড়িতে কোনো সিসি ক্যামেরা ছিল না : স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এমপি লিটনের বিরুদ্ধে এর আগে তার ঢাকার বাড়িসহ বামনডাঙ্গার শাহবাজ মাস্টারপাড়ার বাড়িতে ৩ বার হত্যার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু বার বার তিনি অলৌকিকভাবে রক্ষা পান। এছাড়া তাকে প্রায় প্রতিদিন মোবাইলে ম্যাসেজের মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেয়া হতো। এসব সত্ত্বেও তিনি তার নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন ছিলেন। তাই বাড়িতে কোনো সিসি ক্যামেরাও লাগাননি। এ ব্যাপারে তার ঘনিষ্ট সহযোগী ডি ডাব্লিউ ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক মো. আলমগীর জানান, এমপি হওয়া সত্ত্বেও মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নিজকে তৃণমুল মানুষের নেতা মনে করতেন। এমপি হিসেবে তার বিশেষ বরাদ্দের টাকায় তিনি সুন্দরগঞ্জ থানা, উপজেলা পরিষদ এবং সুন্দরগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিসি ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা করেন। অথচ নিজে নিরাপত্তার জন্য তার বাড়িতে প্রশাসন ও পুলিশের অনুরোধ সত্ত্বেও সিসি ক্যামেরা লাগাননি।

বামনডাঙ্গায় ছাত্রলীগের প্রতিবাদ সমাবেশ : এমপি লিটন হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। উপজেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে গতকাল বুধবার বিকালে বামনডাঙ্গা রেল স্টেশন চত্বরে এক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগ নেতা তৌফিকুর রহমান পিয়াল, জসিম উদ্দিন ডলার, ফয়সাল সাকিদার, স্বপনবাস রায় প্রমুখ।

ভাই বোনদের মুখে ভিন্ন কথা : লিটনের স্ত্রীসহ দলের নেতারা হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে সন্দেহ করলেও এই সংসদ সদস্যের বোনেরা তদন্তে সব বিষয়কেই মাথায় রাখতে বলছেন। মঙ্গলবার বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথায় লিটনের বোন তৌহিদা বুলবুল ও ফাহমিদা বুলবুল কাকলী কোনো কিছু স্পষ্ট না করেই করে বলেন, শুধু জামায়াতকে ঘিরে যেন হত্যা মামলার তদন্ত আটকে না থাকে।

তার আগে লিটনের স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতই তার স্বামীকে হত্যা করেছে বলে তার ধারণা।

তবে জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতে তাদের ওপর দোষ চাপানো হচ্ছে।

মঙ্গলবার লিটনের বাড়িতে দোয়া মাহফিল হয়। এর মধ্েযই সাংবাদিকদের সামনে আসেন লিটনের দুই বোন ও স্ত্রী। তাদের চোখে মুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ; আতঙ্কিত যে তা লুকানোর চেষ্টাও তারা করেননি।

এ সময় তৌহিদা বুলবুল বলেন, “শুধু জামায়াত-জামায়াত করলে তো হবে না। যদি জামায়াত হয়, জামায়াত। যদি আওয়ামী লীগ হয়, আওয়ামী লীগ। যদি আমি হই, আমি। এনি বডি। আমরা তার পানিশমেন্ট চাই। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।”

এমপি লিটনের বন্ধু ও তার পরিবারের নিকটজন হিসাবে পরিচিত মুকুট বলেন, “জামায়াত হতে পারে। কিন্তু ডাইরেক্ট জায়ামাত করছে- এ কথাটা কখনও বলা হয়নি।”

মামলার বাদী ফাহমিদা কাকলী বলেন, “আমার ভাইয়ের হত্যাকারী কে, কারা করল- সেটা আমি জানতে চাই এবং তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

লিটন হত্যাকাণ্ডের দিন তার বাড়িতে স্ত্রী স্মৃতি ও শ্যালক বেদারুল আহসান বেতারসহ দুই-একজন ছাড়া আর কোনো স্বজন ছিলেন না। বেশ কয়েকজন গৃহকর্মী ও গাড়িচালক ছিলেনও তখন বাড়িতে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যায় পাঁচজন ঘাতক দুটি মোটর সাইকেলে এসেছিলেন। তাদের মধ্েয দুজন লিটনের সঙ্গে কথা বলে তার বৈঠকখানায় ঢুকেছিলেন। এরপরই গুলীর শব্দ আসে।

ফাহমিদা বলেন, “এইভাবে গ্রামের মধ্যে এসে হত্যা করে যাওয়া এবং সেই সুযোগটা পাওয়া সব মিলিয়ে সব অ্যাঙ্গেল থেকে পুলিশ তদন্ত করে দেখুক। প্রত্যেকটা অ্যাঙ্গেলে তারা সার্চ করুক। আসলে কী ঘটনাটা।”“লিটন আমার ভাই। হত্যাকারীর বিচার তো আমি চাইতেই পারি। যতদিন বেঁচে আছি। যতদিন বিচার না হয়, তত দিন বিচার চাইব,”।

বড় বোন তৌহিদা বুলবুল বলেন, “একবারে বাড়ি এসে মেরে যাওয়া। এটা সহ্যও করতে পাচ্ছি না। আবার কিছুটা ভয়ও পাচ্ছি। আবার ও (কাকলী) বাদী হয়েছে। ওকে আবার টার্গট করবে কি না?“আমাদের এক তরফ থেকে বলাও হয়েছে- ‘আপনারা ভাই-বোনেরা একটু সেইফ থাকেন।” 

লিটনের স্ত্রী স্মৃতি বলেন, প্রতিদিন বিকালে অনেক নেতা-কর্মী তাদের বাড়িতে থাকত। পুলিশ পাহারার ব্যবস্থাও ছিল রাতে। সাধারণত সন্ধ্যার আগেই নেতা-কর্মীদের নিয়ে লিটন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বামনডাঙ্গা রেল স্টেশন সংলগ্ন তার অফিসে গিয়ে বসতেন। রাত ৯টা থেকে ১০টা অবধি সেখানে থাকতেন তিনি। “কিন্তু কেন জানিনা সেদিন কোন নেতাকর্মী তার বাড়িতে ছিল না।”

লিটনের স্ত্রী জানান, বাড়িতে তখন তিনি, তার ভাই বেদার, ভাগ্নি মারুফা সুলতানা শিমু, চাচি শামীম আরাসহ কয়েকজন গৃহকর্মী ছিলেন।“আমি ও আমার ভাই উঠানের রান্না ঘরের কাছে ছিলাম। তখন গুলীর শব্দ শুনতে পাই। তিনি (লিটন) ঘর থেকে ভেতর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে বলে, ওরা আমাকে গুলী করেছে, আগে ওদের ধর। তিনি বুকে হাত দিয়ে ছিলেন, বুকের বাম পাশ দিয়ে রক্ত ঝরছিল।”

লিটনের চিৎকার শুনে গাড়িচালক ফোরকান মিয়া হামলাকারীদের ধরতে গিয়েছিলেন বলে স্মৃতি জানান। লিটনকে নিয়ে স্মৃতি, ইসমাইল ও বেদার বেরিয়ে আসেন। গাড়ি ও চালক না থাকায় একটি মোটর সাইকেলের মাঝখানে বসিয়ে লিটনকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হন তারা। কিন্তু এর মধ্েয গাড়িচালক ফিরে আসে।

লিটনের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের আগে তার ভাই‘র নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ এবং প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন কে ওই নিরাপত্তাকর্মীদের ছুটি দিয়েছিল। কেনইবা এই ছুটি দেয়া হলো।‘তার (লিটন) শত্রুদের বিষয়ে আমার ধারণা নেই। তবে এলাকার লোক তাকে হত্যা করতে পারে না। আমার ভাইকে ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’

নিহত এমপি লিটনের বড় ভাই শহিদুল ইসলামের এমন বক্তব্যে সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অনেকেই বলছেন, লিটনের বড় ভাইয়ের এমন বক্তব্যে লিটন হত্যাকাণ্ডের মোটিভ নতুন মোড় নিতে পারে।

আটক আরও ৪ : এমপি লিটন হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ আরও চারজনকে আটক করেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে কারও নাম প্রকাশ করেনি পুলিশ। মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার ভোর পর্যন্ত সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) আবু হায়দার মো. আরাফুজ্জামান জানান, এমপি লিটনকে গুলী করে হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে। হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৯ জনকে আটক করা হয়। তিনি জানান, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ছাড়া এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাসহ দুর্বৃত্তদের আটক করতে পুলিশের কয়েকটি টিম বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে।

গাইবান্ধায় ১৫০ জনকে আসামী করে মামলা : এমপি লিটন হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতার অভিযানে স্থানীয় জামায়াত-শিবির ও চিহ্নিত অপরাধীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশী চালাচ্ছে পুলিশ। ফলে ওই এলাকা এখন পুরুষ শূন্য হওয়ার পথে । মঙ্গলবার বেশ ক‘টি স্থানে চালানো পুলিশের অভিযানে ধর্মীয় বই পুস্তকসহ বিস্ফোরক উদ্ধারের দাবী করে পুলিশ । এ ঘটনায় ওই দিন গভীর রাতেই ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০০/১৫০ জনকে আসামী করে সুন্দরগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সবুজ মিয়া বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করে।

সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি মো. আতিয়ার রহমান জানান, এমপি লিটন হত্যার পর পুলিশ আসামীদের গ্রেফতারে সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন জায়গায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে। অভিযানকালে জামায়াত-শিবির ও চিহ্নিত কিছু অপরাধীর বাড়ি থেকে বেশ কিছু জিহাদি বই ও বিস্ফোরক জাতীয় দ্রব্য উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করে।

গত ৩১ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে গুলী করে হত্যা করা হয় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সরকারি দলের এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে। ঘরের ভেতর ঢুকে খুব কাছ থেকে এমপিকে লক্ষ্য করে গুলী ছোড়ে সন্ত্রসীরা। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরদিন রোববার ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ ঢাকায় আনা হয়। সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে গাইবান্ধায় নেয়া হয় লিটনের লাশ। সেখানে তৃতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা পাঁচজনকে আসামী করে মামলা করেন লিটনের বোন ফাহমিদা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ