ঢাকা, শুক্রবার 06 January 2017, ২৩ পৌষ ১৪২৩, ০৭ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

লোকসংস্কৃতিতে ঋদ্ধ এক কাব্যোপন্যাস : সোজন বাদিয়ার ঘাট

ড.আশরাফ পিন্টু : জসিম উদদীনের কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে সম্ভবত ‘‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’’-ই সবচেয়ে বেশি পঠিত। এটি একটি কাহিনীকাব্য বা কাব্যোপন্যাস। এই গ্রন্থটি বাংলা কাব্যোপন্যাসের জগতে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। বিদেশি ভাষায় অনূদিত হিসেবেও গ্রন্থটি অগ্রগামী। সম্ভবত সর্বাধিক বিদেশি ভাষায় অনূদিত এটি বাংলাগ্রন্থ। “এুঢ়ংু যিধৎভ” নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়ে গ্রন্থটি আন্তর্জাতিক পাঠক সমাজেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
‘‘ সোজন বাদিয়া ঘাট’’ কাব্যোপন্যাসের প্লট নির্মিত হয়েছে মুসলমান চাষীর ছেলে সোজন আর হিন্দু নমুর মেয়ে দুলীর অপূর্ব প্রেমের কাহিনীকে ঘিরে; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিগত সামন্ত যুগের জমিদারি প্রথার নিষ্ঠুরতার আলেখ্য। নমু-মুসলমানের দাঙা, অন্ধকার রাতে দুলীকে নিয়ে সোজনের পলায়ন, গড়াই নদীর তীরে পাখির মতো সোজন-দুলীর নীড় রচনা, তারপর সোজনের বিচার, দুলীর অন্যত্র বিয়ে; জেল থেকে ফিরে বেদের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে দেশে দেশে সোজনের দুলীকে অন্বেষণÑ এইরূপ নানা ঘটনা-বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে সোজন বাদিয়ার ঘাটে এনে কবি কাব্যের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন।
আমাদের লৌকিকজীবনের এক সুনিঁপুণ আলেখ্য নির্মিত হয়েছে ‘‘সোজন বাদিয়া ঘাট’’-এ। কাব্যোপন্যাসটির প্রতিটি পরিচ্ছেদের ভূমিকা শুরু হয়েছে আমাদের লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানের অংশ বিশেষ দিয়ে। এক থেকে বাইশ পর্যন্ত পরিচ্ছেদের ভূমিকাতে আছে যথাক্রমে ছেলেভুলানো ছড়া, গাজির গান, মুর্শিদি গান, জারিনাচের গান, বশীকরণের মন্ত্র, বসন্তরোগের মন্ত্র, কবিগানের ধূয়া, বিচ্ছেদের গান, বাউল গান, হা-ডু-ডু খেলার ছড়া ইত্যাদি। এর মধ্যে কোনোটি একাধিকবারও উল্লিখিত হয়েছে। এরকম স্টাইল বা রীতি দেখা যায় সাধারণত উপন্যাসে। বাংলা উপন্যাসের শুরুতেই যেটি করেছেন সাহিত্যস¤্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি “কপাল কু-লা’’ উপন্যাসে পরিচ্ছেদে শুরুতে দেশি-বিদেশি অনেক লেখকের রচনাংশের উদ্ধৃতি দিয়েছেন; যেখানে পরিস্ফুটিত হয়েছে আধুনিক শহুরে চেতনা। কিন্তু জসীমউদদীন লৌকিকজীবনের কাহিনীকে নিয়ে রচিত “সোজন বাদিয়ার ঘাট’’-এ লৌকিকজীবনকে পরিপূর্ণ ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি পরিচ্ছেদের ভূমিকা থেকেই লৌকিকজীবনের আবহ তৈরী করেছেন। এরপর কাব্যোপন্যাসটি শুরু করেছেনও লোকছড়ার ঢঙেÑ
ইতল বেতল ফুলের বনে ফুল ঝুরঝুর করে রে ভাই
ফুল ঝুরঝুর করে,
দেখে এলাম কালো মেয়ে গদাই নমুর ঘরে।
এরপর এ কাব্যোপন্যাসে ব্যবহৃত হয়েছে লোককথা, রূপকথা, লোকসংস্কার, তন্ত্রমন্ত্র, প্রবাদ,  লোকশিল্পকলা, লোকখাদ্য ইত্যাদি।
আদিকাল থেকে মানুষের মনে গল্প বলা বা শোনার যে অদম্য নেশা নিহিত আছে সেই প্রবণতাকেই রূপ দিতেই মানুষ কল্পনার রঙে রাঙিয়ে বাস্তবের মিশেল দিয়ে তৈরী করেছেন রূপকথা। এ রূপকথার কাহিনীর অনুষঙ্গ আছে “সোজন বাদিয়া ঘাট’’-এÑ
দূর মেঠোপথে প্রেতেরা চলেছে আলেয়ার আলো বয়ে
বিলাপ করিছে শ্মশানের শব ডাকিনী- যোগিনী লয়ে।
অমঙ্গল চিন্তাই হলো লোকসংস্কারের মূল ভিত্তি। এই অমঙ্গল চিন্তা থেকে রেহাই পাবার জন্য মানুষ নানারকম সংস্কার তৈরী করেছে। এর জন্য পীরের দরগায় সিন্নি, তাবিজ-কবজ বাঁধা, দেব-দেউলে ধূপ, দেবতাকে ভোগ দেয়া ইত্যাদি লোকসংস্কার আমরা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করি। এ কাব্যোপন্যাসে এ দুই সম্প্রদায়ের লোকসংস্কারকে কবি তুলে ধরেছেন এভাবেÑ
আল্লা রহেন মসজিদে, সিন্নি মানি নামাজ পড়ি
রোজার চাঁদে উপোস করি আমরা তরে শান্ত করি।
না করিলে মসজিদ ছেড়ে আল্লা কভু হন না বাহির
দেবতারে ভোগ না দিলে নাইক বালাই জবাবদিহির।
লোকসংস্কারের আরেকটি অনুষঙ্গ তন্ত্রমন্ত্র। দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য মন্ত্র উচ্চারণ হিন্দুসমাজে প্রচলিত আছে। তেমনটি জসীম উদদীনও উল্লেখ করেছেন Ñ
এলা মোহন রায় পুবের বায় মন্ত্র ছুঁড়ি ছুঁড়ি
 ষোল শো ডাক-ডাকিনী তার সঙ্গে নাচে ঘুরি।
লোকসহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যে প্রবাদই একমাত্র উপাদান যার মধ্যে কল্পনা বা অতিকথন নেই। মানবজীবনের কঠোর এবং রূঢ় সমালোচনা  তথা সত্যকথা প্রবাদের মধ্যে পাওয়া যায়। প্রবাদের মধ্যে ধনী-গরিব উভয় শ্রেণির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় সেই সাথে পাওয়া যায় গরিবের প্রতি ধনীর চিরকালীন শোষণের চিত্র। আমরা জসীম উদদীনের ‘‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’’-এও ধনী কর্তৃক গরিবের উপর চিরায়ত শোষণ-নির্যাতন দেখি। জমিদার কর্তৃক নায়েবের কলমের মাধ্যমে ক্ষমতা অপব্যবহারের চিত্র ফুটে উঠেছে ‘‘ভিটেয় ঘুঘু চড়ানো’’ প্রবাদটিতেÑ
তারি একটা আঁচড় লেগে গেছে কত চালের ছানি
কত ভিটেয় চরছে ঘুঘু, ইহার হদিস আমরা জানি।
সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ যেমন নিজের ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটাতে অনেক কিছু তৈরী করেছেন তেমনি মনের চাহিদা পূরণে তৈরী করেছেন পুঁতিরমালা গাঁথা, হাড়িকুড়ি গড়া, নকসা-আল্পনা আঁকা, মাটির পুতুল বানানো ইত্যাদি। এসব লোকশিল্পকলার ব্যবহারও দেখা যায় ‘‘সোজন বাদিয়ার ঘাট-’’এÑ
 তোমার জন্য গাঁথিয়া রাখিব পাকাকুঁচ দিয়ে মালা
 ডোমনী আসিলে কিনিয়া রাখিব তল্লাবাঁশের ডালা।
 বেদেনীর কাছ হইতে রাখিব রঙিন পুঁতির দানা
 সে দানা তুমি ছবি এঁকো বুজী, ফল লতা-পাতা নানা।
লোকজ বিজ্ঞানের কৌশল প্রয়োগ করে মানুষ নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করেছে এবং সংরক্ষণ পদ্ধতিও  আবিস্কার করেছে। এভাবেই মানুষ এগিয়েছে ক্রমান্বয়ে। কবি এ কাব্যোপন্যাসে চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন এসব প্রাচীন লোককাব্যের কথাÑ
কখনো হবে না, আগে তুমি বস, বউটি তখন উঠি
ডালায় ভরিয়া হুড়–মের মোয়া লইয়া আসিল ছুটি।
একপাশে দিল তিলের পাটালি, নারকেল নাড়– আর
ফুল-লতা আঁকা ক্ষিরের তক্তি দিল তারে খাইবার।
এ ছাড়া এ কাব্যোপন্যাসে লোকনৃত্য, লোকনাট্য, লোকক্রীড়া, লোকভাষার ব্যবহার, আবাস ও গৃস্থালির বিভিন্ন জিনিসপত্রের উল্লেখ রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, জসীম উদদীন গ্রামীণজীবনের লোককাহিনী ও গাঁথা অবলম্বন করে ‘‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’’ নামের যে কাব্যোপন্যাস লিখেছেন তা অনন্য। গ্রামবাংলার সাদামাটা জীবনের মাধুর্যকে দেশীয় (লোকসংস্কৃতি) সংস্কৃত প্রয়োগ করে তা কাব্যমহিমায় ভাস্বর করে তুলেছেন ; যা দেশি ও বিদেশি পাঠকদের মনে আজো বিস্ময় জাগায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ