ঢাকা, শুক্রবার 06 January 2017, ২৩ পৌষ ১৪২৩, ০৭ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

অনিয়ন্ত্রিত বাড়িভাড়া

ঈসায়ী নতুন বছরের শুরুতে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গের পাশাপাশি মানুষের মুখে মুখে উঠে এসেছে বাড়িভাড়ার প্রসঙ্গ। বিশেষ করে রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় বাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভাড়াটেরা। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, উত্তরা, গুলশান, বনানী, রামপুরা, খিলগাঁও, বনশ্রী, বাড্ডা, ওয়ারি, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, হাতিরপুল, আজিমপুর ও এলিফ্যান্ট রোডসহ পুরনো ও নতুন ঢাকার এমন কোনো এলাকার নাম বলা যাবে না, যে এলাকার বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ না দিয়েছেন এবং ভাড়া না বাড়িয়েছেন। বৃদ্ধির পরিমাণও চমকে ওঠার মতো। কোনো কোনো বাড়ির মালিক পাঁচশ’ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছেন। এত বেশি টাকা ভাড়াটেদের পক্ষে দেয়া সম্ভব কি না, কোনোভাবে দিতে পারলেও তারা খেয়ে-পরে ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ যুগিয়ে সংসার চালাতে পারবেন কি না- এ ধরনের কোনো বিষয় বিবেচনা করতেও রাজি নন বাড়িওয়ালারা। তাদের এক কথা, হয় ভাড়া বাড়াও না হলে বাড়ি ছেড়ে দাও! ভাড়াটেদের ওপর এভাবে চড়াও হতে পারার কারণ, বাড়িওয়ালারা জানেন, তাদের বাড়ি খালি পড়ে থাকবে না। ভাড়া যতো বেশিই হোক, নতুন ভাড়াটে এসে উঠবেই। বাস্তবেও সেটাই ঘটে থাকে। 

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্টে এমন অবস্থার জন্য সরকারকে দায়ী করা হয়েছে। কারণ, বাড়িভাড়া সংক্রান্ত একটি আইন থাকলেও সে আইনের কোনো প্রয়োগ নেই। ভাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্যও সরকারের পক্ষ থেকে কখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এলাকার গুরুত্ব অনুযায়ী প্রতি স্কয়ারফুটের সর্বোচ্চ ভাড়া কত টাকা হবে সে বিষয়ে ১৯৯১ সালের আইনে বলা আছে। অন্যদিকে বাড়িওয়ালারা আইনের তোয়াক্কা না করে ভাড়া বাড়িয়ে চলেছেন যথেচ্ছভাবে। তাছাড়া প্রায় কোনো বাড়িওয়ালাই ভাড়াটেদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করেন না, ভাড়ার প্রাপ্তি রসিদও দেন না। সে কারণে কোনো ভাড়াটে চাইলেও বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে আইনত কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেন না। বড় কথা, ব্যবস্থা নিতে চাইলে কোথায় কার কাছে যেতে হবে- থানায় না সরাসরি আদালতে এসব বিষয়েও ভাড়াটেদের কোনো ধারণা নেই। কথা শুধু এটুকুই নয়। কোনো ভাড়াটে এ ধরনের চেষ্টা করার চিন্তা করলেই বাড়িওয়ালারা তাকে ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবেন। এলাকার গুন্ডা-মাস্তানদের ব্যবহার করবেন। এমন অনেক ঘটনাই বিভিন্ন এলাকায় ঘটে থাকে। পুলিশও বাড়িওয়ালাদের পক্ষেই দাঁড়িয়ে যায়। অমন পরিস্থিতিতে ভাড়াটেরা মাথা নিচু করে বাড়ি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এজন্যই ভাড়াটেরা বলতে গেলে কখনোই বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার চিন্তা পর্যন্ত করতে পারেন না।

অন্যদিকে এ অবস্থারই সুযোগ নিয়ে থাকেন বাড়িওয়ালারা। পরিণতিতে বাড়ি ভাড়া কেবল বেড়েই চলেছে। প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত ২৫ বছরে রাজধানী ঢাকায় গড়ে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৩৮৮ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ বাড়িওয়ালাদের পক্ষে এমন যুক্তি দেখানো সম্ভব নয় যে, নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়েছে বলেই তারা ভাড়া না বাড়িয়ে পারেননি। হোল্ডিং ট্যাক্স ধরনের ব্যাপারেও একই কথা সত্য। মূলকথা হলো, বছর ঘুরলে ভাড়া বাড়ানোটা বাড়িওয়ালাদের নিয়মে পরিণত হয়েছে। একই অবস্থা চলছে দেশের অন্য সব এলাকায়ও। প্রকাশিত রিপোর্টটিতে জানানো হয়েছে, সিলেটে গত ১০ বছরে পাড়া-মহল্লাভেদে ভাড়া বেড়েছে আড়াই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত। বগুড়ায় গত আট-দশ বছরে ভাড়া বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয়গুণ পর্যন্ত। রাজশাহীতে এলাকাভেদে পাঁচশ’ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছেন বাড়িওয়ালারা। খুলনা সম্পর্কে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ বাড়িওয়ালাই নতুন বছরের শুরুতে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়িয়েছেন। 

এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো, রাজধানী থেকে জেলা ও বিভাগীয় শহর পর্যন্ত কোনো এলাকার বাড়িওয়ালারাই সরকারের আইন মানছেন না। প্রথমত তারা প্রতি স্কয়ারফুটের জন্য নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে অনেক বেশি পরিমাণ ভাড়া আদায় করছেন। এরপর রয়েছে সময় বা মেয়াদের দিকটি। আইনে দু’ বছর পর্যন্ত একই ভাড়ার কথা বলা হলেও প্রায় কোনো বাড়িওয়ালাই তা মানছেন না। তারা বরং বছর না ঘুরতেই ভাড়া বাড়াচ্ছেন। রাজধানীতে এমন অনেক বাড়িওয়ালার কথা জানা গেছে, যারা এমনকি কয়েক মাস পরপর ভাড়া বাড়িয়ে থাকেন। 

আমরা মনে করি, বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে এমন নৈরাজ্য এবং বাড়িওয়ালাদের স্বেচ্ছাচারিতা কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। সরকারের উচিত এ বিষয়ে অবিলম্বে তৎপর হয়ে ওঠা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তথা ভাড়াটেদের স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ নেয়া। এখানে স্মরণ করা দরকার, ১৯৯১ সালে বাড়ি ভাড়ার আইন করা হলেও এখনো পর্যন্ত তার বিধিমালা তৈরি করা হয়নি। ফলে আইনটির প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। সরকার এমনকি সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশও উপেক্ষা করে চলেছে। উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের আইনটিকে কার্যকর করার ব্যাপারে নির্দেশনা চেয়ে ২০১০ সালে একটি মানবাধিকার সংগঠন হাই কোর্টে রিট আবেদন পেশ করেছিল। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৫ সালের ১ জুলাই মাননীয় বিচারপতিরা তাদের রায়ে ১৯৯১ সালের আইন অনুযায়ী ভাড়াটেদের স্বার্থ রক্ষায় উদ্যোগী হওয়ার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। রায়ে রায় ঘোষণার ছয় মাসের মধ্যে সারাদেশে এলাকাভেদে সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করার উদ্দেশ্যে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠনের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও সরকার কমিশন তো গঠন করেই-নি, ১৯৯১ সালের আইনটিকেও কার্যকর করার লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অর্থাৎ সরকার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশও অমান্য করেছে। 

আমরা মনে করি, বাড়িভাড়ার ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাদের অযৌক্তিক ও নির্যাতনমূলক কর্মকান্ড বন্ধ করা দরকার। সরকারের উচিত সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাড়ার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য অবিলম্বে একটি কমিশন গঠন করা এবং ১৯৯১ সালের বিদ্যমান আইনটিকে কার্যকর করার ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠা। আমরা চাই, রাজধানীসহ দেশের কোনো এলাকার ভাড়াটেরাই যাতে বাড়িওয়ালাদের হাতে জিম্মি না হয়ে পড়েন এবং বাড়িওয়ালারা যাতে আইন মেনে চলতে বাধ্য হন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ