ঢাকা, শনিবার 07 January 2017, ২৪ পৌষ ১৪২৩, ০৮ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.) ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য বীর

আব্দুল মতিন বিন আব্দুল জব্বার : নাম আলী, পিতা-মাতার সন্তানদের সবার ছোট। পিতার নাম আবু ত্বালিব আবদুল মান্নাফ, মাতা ফাতিমাহ বিনতু আসাদ যিনি হিজরাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করে মৃত্যুবরণ করেন। (‘আল-ইসতি’ আব ফী মা’রিফাতিল আসহাব- পৃ. ৩/১০৮৯)
আলী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আপন চাচাতো ভাই। লকব আসাদুল্লাহ, হায়দার ও মুরতাজা। কুনিয়াত আবুল হাসান ও আবূ তুরাব। জন্মের পর তাঁর মাতা-পিতার অনুপস্থিতিতে আপন পিতার নামের সাথে মিল রেখে ‘আসাদ’ নাম রাখেন। কিন্তু পিতা আবূ ত্বালিবের কাছে সেই নাম ফছন্দ হওয়ার কারণে তিনি ‘আলী’ নাম রাখেন। (ড. আলী মুহাম্মদ মুহাম্মদ আস-সল্লাবী, আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.) শাখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু-পৃ. ২৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের ত্রিশ বছর পর নবুওয়াতের দশম বছরে রজব মাসের ১৩ তারিখ শুক্রবার জন্মগ্রহণ করেন। (আলী মুহাম্মদ আলী দাখীল, সীরাতুল ইমাম আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.)-পৃ. ১১)
মুসতাদরাক ‘আলাস সহীহাইনে সনদ ছাড়া বর্ণিত আছে যে, আলী কা’বার অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-ইসতি আব ফী মা’রিফাতিল আসহাব- পৃ.৩/৪৮৩।)
তবে এ বর্ণণাকে অত্যন্ত দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন ইসলামিক স্কলারগণ। (আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.) শাখসিয়্যাতুহু ওয়া ‘আসরুহু-পৃ. ২৯)
আবূ ত্বালিবের চার ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে একটা বড় সংসার ছিল। পারিবারিক অস্বচ্ছলতাকে হালকা করার জন্য ‘আব্বাস (রা.) জা’ফরের দায়িত্ব নেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ দায়িত্বে নিয়ে নেন আলীকে। এভাবে নবী পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে বেড়ে ওঠেন। আল্লাহ তা’আলা মুহাম্মদ (সা.)কে নবুওয়াত দান করলে বুধবারে ‘আলী ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিই খাদীজাহ (রা.) পর পুরুষ ও কিশোরদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। নবী পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে আলী (রা.)-এর চরিত্রে মাহাসিনুল আখলাকের সমাবেশ ঘটে। ফলে জাহিলিয়াতের কোন অপকর্মই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। (আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.) শাখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু-পৃ.৪৩। ড. আহমদ আল-মাযীদ ও ড. আদিল আশ-শাদী, আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.)-পৃ.-৬।)
‘আলী (রা.)-এর শারীরিক গঠন সম্পর্কে ইবনু ‘আবদুল বাকু (রা.) বলেন, পুরুষদের মধ্যে মাঝারি গঠনবিশিষ্ট হতে কিছুটা খাটো ছিলেন। চোখ দুটো ছিল কালো ও বড়, চেহারা ছিল পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় অত্যন্ত সুন্দর, পেট ছিল স্থুলকায়, প্রশস্ত কাঁধ, শুধু মাথার পেছন দিকে চুল ছিল। দাড়ি এত লম্বা ছিল যে তাঁর বুক স্পর্শ করত। তাঁর বাহু ও হাতে প্রচুর শক্তি থাকায় যখন তিনি কাউকে আঁকড়ে ধরতেন তখন সে ব্যক্তির নিঃশ্বাস নেয়ার মত ক্ষমতা থাকত না। যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ়চিত্তে সাহসিকতার সাথে সামনের দিকে এগিয়ে চলতেন। (আল-ইসতি আব ফী মা’রিফাতিল আসহাব- পৃ. ৩/১১২৩।)
বদর যুদ্ধের পর  হিজরী দ্বিতীয় সনে ফাতিমাহ (রা.)-এর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের কুল আলোকিত করে হাসান, হুসাইন ও উম্মে কুলসুম (রা.) জন্মগ্রহণ করেন। (সীরাতুল ইমাম আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.)-পৃ.১২।
মক্কার ইসলাম বিরোধী শক্তি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)কে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার। মহান আল্লাহ তা’আলার নির্দেশে আলী (রা.)কে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের বিছানায় ঘুমাবার নির্দেশ দিয়ে আবু বকর (রা.)কে সাথে নিয়ে রাতের অন্ধকারে মদীনার দিকে রওয়ানা হন। তিনি জানতেন, এ অবস্থায় তাঁর জীবন চলে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রত্যয় ছিল, এভাবে জীবন গেলে তার চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। (আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.)-পৃ.৬।)
রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরাতকালে আলী (রা.)কে মক্কায় অবস্থান করে তাঁকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গচ্ছিত মানুষের সম্পদ ও ওয়াসীয়ত আদায় করার পর মদীনায় পরিবারসহ হিজরত করার নির্দেশ দেন। (তারীখুল খুলাফা-পৃ. ১৬৫।)
আলী (রা.) একমাত্র তাবুক অভিযান ছাড়া সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। ক্বাতাদাহ থেকে বর্ণিত, বদরসহ প্রতিটি যুদ্ধে আলী ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পতাকাবাহী। সকল যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় তিনি দেন । (মুহাম্মদ আবদুল মা’বুদ, আসহাবে রাসূলের জীবন কথা-১ম খণ্ড, পৃ. ৪৮।)
তাবুক অভিযানে রওয়ানা হওয়ার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)কে মদীনার স্থলাভিষিক্ত করে যান। আলী (রা.) আরজ করলেন : ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি যাচ্ছেন আর আমাকে নারী ও শিশুদের কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন? উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)- বললেন :
হারুন (আ.) যেমন ছিলেন মূসার, তেমনি তুমি হচ্ছো আমার প্রতিনিধি, তাতে কি তুমি খুশি নও? তবে আমার পরে কোন নবী নেই। (সহীহুল বুখারী-হা: ৪৪১৬, তবাকাত-৩/২৪।)
আবূ বকর ‘উমার ও উসমান (রা.)-এর খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁদের হাতে বাইয়াত করেন এবং তাঁদের যুগের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরীক থাকেন। অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতেও উসমানকে পরামর্শ দিয়েছেন। আবূ বকর ও উমরের যুগে তিনি মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। (আসহাবে রাসূলের জীবন কথা- ১ম খ-, পৃ. ৫০।)
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন ‘আব্বাস আলী (রা.)কে বলেন, তুমি রাসুলুল্লাহ (সা.)কে জিজ্ঞাসা করো যে, কে তাঁর পরে খলীফাহ হবেন? তিনি বললেন, মহান আল্লাহর কসম আমি জিজ্ঞাসা করতে পারব না। সহীহ হাদীস সাব্যস্ত হয় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.) কিংবা অন্য কাউকে খিলাফতের ওয়াসীয়ত করে যাননি। তবে তাঁর পক্ষ থেকে আবূ বকর (রা.)-এর ব্যাপারে ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেউ কেউ মনে করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে খিলাফতের ব্যাপারে ওয়াসীয়ত করে গেছেন। যা অত্যন্ত মিথ্যা, বানোয়াট এবং সাহাবীদের ব্যাপারে মিথ্যা অভিযোগ পেশ করা হয়। (আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.)-পৃ. ৮।)
বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বিদ্রোহীদের হাতে উসমান (রা.) শহীদ হওয়ার পর ত্বালহাহ্্, যুবাইর ও আলী (রা.)কে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। প্রত্যেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে মদীনাবাসীরা আলী (রা.)-এর কাছে গিয়ে বলেন, খিলাফতের এ পদ এভাবে শূন্য থাকতে পারে না। আপনিই এর হক্বদার। সকলের পীড়াপীড়িতে প্রকাশ্যে হিজরী ৩৫ সনের জিলহাজ্জ মাসের ১৮ রমযান শুক্রবার বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবীবৃন্দ যারা সে সময় মদীনায় উপস্থিত ছিলেন সকলেই তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। কারণ সে সময় ঐ পদের জন্য তাঁর চেয়ে অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি আর কেউ ছিলেন না। (আসহাবে রাসূলের জীবন কথা ১ম খণ্ড, পৃ. ৫০। আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.) শাখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু-পৃ. ২৩৫।)
তবে কোন গ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছে যে, কিছু সাহাবী তাঁর হাতে বাইয়াত করেননি।
আবূ বকর, উমর এবং উসমান (রা.)-এর পর খিলাফতের অধিক হক্বদার ছিলেন আলী (রা.)। আর এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আক্বীদাহ, এ ধারাবাহিকতায় বিশ্বাস রাখা প্রতিটি মুসলিমের একান্ত কর্তব্য। (আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.) শাখসিয়্যাতুহু ওয়া আসরুহু-পৃ. ২৩৮।)
অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে আলী (রা.)-এর খিলাফতের সূচনা হয়। খারেজী সম্প্রদায়ের তিনটি দল আলী মু’আবিয়াহ ও আমুর ইবনু আস (রা.)কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
আবদুর রহমান ইবনু মুলজিম ও তার সহযোগী ছিল শুবাইব ইবনু ‘উজবাহ্, তারা আলী (রা.)কে হত্যার দায়িত্ব নেয়। ৪০ হিজরী সালের ১৭ রমজান রাতে ফজরের নামাযের প্রস্তুতির সময় আলীকে তরবারীর দ্বারা আঘাত করা হয়। আলী (রা.) আহত অবস্থায় দুই দিন জীবিত থাকার পর রবিবার রাতে কুফায় মৃত্যুবরণ করেন। হাসান ইবনু আলী (রা.) দ্বারা জানাযার ইমামতির পর কুফা জামে মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। খিলাফতের দায়িত্বে ছিলেন চার বছর নয় মাস। (আলী ইবনু আবী ত্বালিব (রা.)-পৃ.-১৬।
আলী (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবূ ফারাজ ইবনুল জাওযী নামক গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫৩৬ বলে উল্লেখ করেন। তবে ইবনু হাযম তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫৮৬ বলে উল্লেখ করেন। তিনি ছিলেন একজন সুবক্তা ও ভাল কবি। তাঁর কবিতার একটি ‘দিওয়ান’ পেয়ে থাকি। গবেষকদের ধারণা, তাঁর নামে প্রচলিত অনেকগুলো কবিতা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। তবে তৎকালীন আরবি কাব্য জগতের একজন বিশিষ্ট দিকপাল, তাতে পন্ডিতদের কোন সংশয় নেই।
ইমাম আহমাদ (রা.) বলেন, আলী (রা.)’র মর্যাদা ও ফযীলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে যত কথা বর্ণিত হয়েছে, অন্য কোন সাহাবী সম্পর্কে তা হয়নি। (প্রাগুক্ত-পৃ. ১০)।
তবে তাঁর ব্যাপারে অনেক দুর্বল ও বানোয়াট হাদীসও রয়েছে।
হে মহান আল্লাহ! আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, ‘আলীসহ সকল খুলাফায়ে রাশিদীনকে ভালবাসী। ভালবাসী আপনার নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সমস্ত সাহাবী (রা.)দের। সাল্লাল্লাহু ওয়া বারিক আলা নাবীয়্যিনা মুহাম্মদ ওয়া আলা আলিহি ওয়া সহবিহি আজমাঈন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ