ঢাকা, শনিবার 07 January 2017, ২৪ পৌষ ১৪২৩, ০৮ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলমানদের ঈমানদীপ্ত ইতিহাস

আরাফাত ডেস্ক: দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলমানদের বিশেষ সম্মান আছে, আর সেখানে তাদের অবস্থানও খুব শক্তিশালী। এমনকি যখন বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করার সাহস হয় না, তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় মুসলমানদের মজবুত অবস্থানের কারণে সেখানে সে দেশের আদালত কাদিয়ানীদের অমুসলিম বলে ঘোষণা করেছে। ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে তার একটি মুখ্য কারণ পেয়ে গেলাম।
কৃষ্ণাঙ্গরাই মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার মূল অধিবাসী। সপ্তদশ খ্রিস্টাব্দে ডাচ্রা একদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার উপর নিজেদের আধিপতথ্য প্রতিষ্ঠা করে, অপরদিকে সে সময়ই মালয় ও তার পার্শ্ববর্তী দ্বীপসমূহকে ঔপনিবেশিবাদের পাঞ্জায় কষে ধরে। মালয় ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেখানে মুসলমানরা বারবার স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করতে থাকে, আর ডাচরাও তাদের স্বভাবমাফিক এ সমস্ত আন্দোলনকে সব সময়ই যুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করে। সেখানকার অনেক মুজাহিদ মুসলমানকে বন্দী করে দাস বানিয়ে রাখা হয়। এতদসত্ত্বেও ডাচ্দের এই আশঙ্কা ছিল যে, এরা যে কোন সময় বিদ্রোহ করতে পারে। তাই সরকার তাদেরকে দেশান্তর করে কেপটাউন পাঠিয়ে দেয়। যেন স্বদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করে তারা চরম অসহায় হয়ে পড়ে। সুতরাং মালয় ও আশপাশের প্রায় ৩০০ মুজাহিদকে দাস বানিয়ে পায়ে শিকল পরিয়ে কেপটাউন নিয়ে আসা হয়। ‘আউয়াল মসজিদ’ দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটউন শহরের বো-ক্যাপে ১৭৯৪ সালে নির্মিত হয়। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত।
বন্দিদের প্রধান শায়খ ইউসুফ: কেপটাউনে মুসলমানদের খুব কষ্টসাধ্য কাজ দেয়া হয়। ডাচ্ শাসকগোষ্ঠীর ভার করেই জানা ছিল যে, তাদের স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহা মূলত তাদের বক্ষ্যস্থিত প্রজ্জ্বলিত ঈমানের উত্তাপে উজ্জীবিত। তাই তাদেরকে স্বধর্ম থেকে করতে ও তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঈমানের নূর থেকে বঞ্চিত করতে সবধরনের প্রচেষ্টাই তারা চালায়। নামাজ পড়া তো দূরের কথা, ডাচ্ মনিবদের কাছ থেকে তাদের কালিমা পড়ার অনুমতিটুকু ছিল না। অসহায় সেই মুসলমানদের থেকে সারাদিন কষ্টসাধ্য কাজ করানো হতো। কোন ব্যক্তি নামাজ কিংবা অন্য কোন ‘ইবাদাতে লিপ্ত হওয়ার তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হতো।
কিন্তু এমন নিপীড়নের মাধ্যমে তাদের অন্তর থেকে ঈমানের প্রদীপ্ত আলো নির্বাপিত করা সম্ভব হয়নি। জুলুম-নির্যাতনে নিষ্পেষিত হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের দ্বীনকে বুকে ধারণ করে রাখেন। চরম অবস্থাতেও তারা নামাজকে পর্যন্ত ছাড়েননি। সারাদিন কষ্টকর পরিশ্রম করার পর দৃঢ়-সংগ্রামী এই রাতে নিজেদের অবস্থানস্তলে ফিরে যেতেন, তখন ক্লান্তিতে নিথর হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের তত্ত্বাবধায়কদের ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষা করতেন। তারা ঘুমিয়ে পড়লে মুজাহিদগণ রাতের অন্ধকারে চুপিসারে অবস্থানস্থথল থেকে বের হয়ে একটি পাহাড়ে আরোহণ করে সারাদিনের নামাজ একসঙ্গে পড়ে নিতেন। বর্তমানে কেপটাউনের প্রত্যেক মুসলমান অধিবাসী জায়গা সম্পর্কে জানেন, যেখানে নিপীড়িত এ সমস্ত মুসলমান নিস্তব্ধ নিশীথে স্বীয় মনিবের সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়তেন। শহর থেকে বেশ দূরে সেই পাহাড়টি। পাহাড়ের মাঝে প্রশস্ত একটি জায়গাকে নিরাপদ মনে করে নিজ প্রভুর সম্মুখে দাসত্বের সেজদাহ আদায় করার জন্য তারা নির্বাচিত করেছিলেন। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত শ্রান্ত মুসলশানদের এখানে এসে নামাজ পড়া এখন একটি সাধনা, যার কল্পনাও চোখকে করে অশ্রুসিক্ত। এখানকার পরিবেশে আল্লাহ্-পাগল সেই মুজাহিদদের যিকর ও তাকবীরের সুরভি আজও অনুভূত না হয়ে পারে না।
প্রায় আশি বছর আল্লাহ্র এই নেক বান্দাগণ দাসত্বের শিকলে একইভাবে বন্দি থাকেন। দীর্ঘ এ সময়ে তাদের মসজিদ বানানো তো দূরের কথা একাকী নামায পড়ার অনুমতি ছিল না। অবশেষে এমন একটি সময় আসল, যখন বৃটিশরা কেপটাউনের উপর আক্রমণ করে ডাচ জাতি থেকে এ অঞ্চল ছিনিয়ে নিতে চাইল। তারা বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে ‘উত্তমাশার’ কূলে পৌঁছে গেল। এ যেন চোরের ঘরে বাটপারের আগমন। এ অবস্থায় ডাচ্ শাসকদের এমন কিছু নিবেদিতপ্রাণ সৈনিকের প্রয়োজন পড়ল, যারা জান বাজি রেখে তাদের পথ রোধ করবে। প্রাণদানের জন্য ভিনদেশী মুসলমানদের চেয়ে অধিক উপযুক্ত কেউ ছিল না। সুতরাং ডাচ্ সরকার নির্যাতিত ও শোষিত এ সমস্ত মুসলমানের নিকট এ লড়াইয়ে ডাচ্ সরকারের হয়ে শুধু লড়াই করারই নয়, বরং ইংরেজদের মোকাবিলায় এদের অগ্রবাহিনীর দায়িত্ব পালনের দাবি জানায়।
এ পর্যায়ে এসে এই প্রথমবারের মতো ডাচ্ সরকারের কাছ থেকে কোন সুবিধা লাভের সুযোগ পেল। কিন্তু এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তারা কোন টাকা-পয়সার আবদার করেননি কিংবা নিজেদের জন্য অন্য কোন সুবিধাও চাননি।
তারা এসবের পরিবর্তে ডাচ্ মনিবদেরকে বললেন, ‘আমাদের জন্য ইংরেজ কিংবা ডাচ্ শাসকদের মধ্যে যদিও কোন তফাৎ নেই। তবুও আমরা আপনাদের খাতিরে ইংরেজদের সাথে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত আছি, যার জন্য আমরা নাজরানাস্বরূপ আমাদের জান কুরবান করতে পারি, তা হলো এ লড়াই শেষ হলে আমাদেরকে কেপটাউনে একটি মসজিদ নির্মাণ করার ও সেখানে নিয়মিত জামা’আতের সাথে নামায আদায় করার অনুমতি দিতে হবে। ডাচ্ সরকার এই শর্ত মেনে নেয়। এভাবে বহুসংখ্যক মুসলমানের জানের বিনিময়ে এখানে একটি মসজিদ বানানোর অনুমতি লাভ করে। এটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম মসজিদ, যা ঐ সমস্ত নিপীড়িত, নিগৃহীত ও নির্যাতিত মুসলমানরা নির্মাণ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ