ঢাকা, শনিবার 07 January 2017, ২৪ পৌষ ১৪২৩, ০৮ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বৃটিশ বাংলায় মন্ত্রিত্ব গঠন ও গ্রহণের ইতিহাস (১৯১৯-১৯৩৭)

নূরুল আনাম (মিঠু) : বৃটিশ শাসনামলকে বাহ্যিকভাবে যতটা নিস্তরঙ্গ মনে করা হয় আসলে তা ততোটা ছিল না। যদিও সে সময় এ যুগের মত সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক চেতনা কিংবা আন্দোলন ছিল না। তথাপিও তৎকালীন বৃটিশ ভারত এমনকি বাংলায়ও প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন বিদ্রোহ-অভ্যুত্থান ও তজ্জনিত প্রস্তুতি জারি ছিল। এরই চূড়ান্ত ফলশ্রুতি ছিল ১৮৫৭-এর সিপাহী বিদ্রোহ। যদিও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল কিন্তু সেটা গোটা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কেননা, এরই ফলশ্রুতিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্তৃত্বের চির অবসান ঘটেছিল। বৃটিশ সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে এসেছিল পুরো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা। বাতিল হয়েছিল স্বত্ব বিলোপসহ পুরনোকালের অনেক কালাকানুন। জারি করতে হয়েছিল ভারত শাসন বিধি। ১৮৬১, ১৮৯২, ১৯০৯, ১৯১৯ এবং ১৯৩৫ প্রভৃতি বিভিন্ন সময়ে ৫টি বিধি জারি করা হয়েছিল। এর মধ্যে শেষের দু’টি বিধি উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। তবে বর্তমান আলোচনা ১৯১৯-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সেই সময় উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে ঘটেছিল নানাবিধ আমূল পরিবর্তন। নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে থেকেও সব ভারতীয় কংগ্রেস তখন গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য বৃটিশ সরকারের উপর ক্রমবর্ধমানভাবে চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। ১৯১১ সনে বঙ্গভঙ্গ রদ করার পর ক্ষুব্ধ মুসলিম লীগও স্বশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিকে লক্ষ্য হিসাবে গ্রহণ করে। ১৯১৬ সনে লক্ষ্ণৌ চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনি এক পরিস্থিতিতে ১৯১৭ সনের ২০ আগস্ট তদানীন্তন ভারত সচিব ইএম মন্টেগু দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশাসনের প্রতিটি শাখায় উপমহাদেশেীয় জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানের ঘোষণা দেন। এটাই ১৯১৯ সনের ভারত শাসন আইন নামে পরিচিত। এটিকে মন্টেগু-চেমসফোর্ড বিধিও বলা হয়। এই আইনে সরকারি বিষয়াবলী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বণ্টন করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি, দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন, শুল্ক, মুদ্রা, সরকারি ঋণ, বাণিজ্য, যোগাযোগ, দেশীয় রাজ্যগুলোর সাথে সম্পর্ক।
কেন্দ্রীয় চাকরি প্রভৃতি। অন্যদিকে প্রদেশগুলোর হাতে দেয়া হয় আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, গণপূর্ত প্রভৃতি। প্রাদেশিক সরকারের বিষয়গুলোকে আবার সংরক্ষিত ও হস্তান্তরিত এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। সংরক্ষিত বিষয়গুলো ছিল প্রদেশের আইনশৃঙ্খলা, বিচার, পুলিশ, অর্থ, ভূমি, সেচ ইত্যাদি। আর অন্যদিকে হস্তান্তরিত বিষয়গুলো ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য (ইউরোপীয় ও এ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের শিক্ষা বাদে), স্থানীয় সরকার, কৃষি, শিল্প ইত্যাদি। এগুলোর দায়িত্ব প্রাদেশিক মন্ত্রীদের দেয়া হয়। অপরদিকে সংরক্ষিত বিষয়গুলো গভর্নরের হাতে থেকে যায়। এভাবে প্রাদেশিক সরকারের কর্মকাণ্ড দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় একে দ্বৈত শাসন বলা হয়। তবে এই ব্যবস্থায় প্রথমবারের মত সংশ্লিষ্ট প্রদেশের অধিবাসীদের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। মন্ত্রীরা হস্তান্তরিত বিষয়ে অনেকটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ লাভ করেন। আইন পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রী নিয়োগ করা হতো। তবে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে গভর্নর যে কোন হস্তান্তরিত বিষয় নিজ হাতে নিতে পারতেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অর্থ ব্যয় অনুমোদন ও আইন পাস করার ক্ষমতা গভর্নরদের হাতে থেকেই যায়। এভাবে দায়িত্ব ভাগ করে শাসনব্যবস্থায় নানান জটিলতার সৃষ্টি হয়। যেমন কৃষি কাজ ছিল মন্ত্রীর আওতায়। সেচ ছিল শাসন পরিষদের আওতায়। ফলে কৃষিমন্ত্রীর পক্ষে কৃষি উন্নয়নে পরিকল্পনামাফিক কাজ করা কঠিন হতো। সর্বোপরি ভোটাধিকারও ছিল সীমিত। বর্তমান হিসাবে তা শতকরা তিন শতাংশের কম ছিল। সুতরাং এই ঔপনিবেশিক খুদকুড়া পাওয়াকে পরম পাওয়া মনে করে যেসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী পুলিকিত হন, তাদের জ্ঞাতার্থেই এই প্রসঙ্গের অবতারণা করতে হলো। যা থেকে ১৯১৯ সনের ভারত শাসন আইনের অধীনে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ সনে। এই নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের মধ্য থেকে প্রথম ব্যাচে মন্ত্রী নিযুক্ত হন স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, পি.সি. মিত্র এবং নওয়াব আলী চৌধুরী। এই মন্ত্রীদের প্রতি আইন পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন ছিল।
এর ফলে স্যার সুরেন্দ্রনাথ আইন সভায় কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটি বিল পাশ করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯২৩ সনে। ঐ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মন্ত্রীদের দলকে (কংগ্রেস) পরাজিত করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ্য দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। স্বয়ং সুরেন্দ্রনাথ তার এলাকায় পরাজিত হন। স্বভাবতই তিনজন মন্ত্রীই পদত্যাগ করেন। শূন্যপদে মন্ত্রী নিয়োগের জন্য চিত্তরঞ্জন দাসের কাছে নাম চাওয়া হয়। কিন্তু সেই সময় স্বরাজ্য দলের নীতি ছিল ব্যবস্থাপক পরিষদে যোগ দিয়ে সরকারকে অকার্যকর করে দেয়া। সুতরাং তিনি সরকারের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।
গভর্নর তখন এস.এন মল্লিক, এ কে ফজলুল হক এবং একে গজনবীকে মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেন। নতুন মন্ত্রীরা ১৯২৪ সনের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই নির্বাচন কারচুপি সংক্রান্ত অভিযোগে এস.এন. মল্লিককে পদত্যাগ করতে হয়। ঐ আসনে উপনির্বাচন দেয়া হলে তাতেও স্বরাজ্য দলের প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। অন্য দু’জন মুসলমান মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কিন্তু ১৯২৪ সনের আগস্ট মাসে স্বরাজ্য দলের সদস্যদের বিরোধিতায় ব্যবস্থাপক সভায় মন্ত্রীদের বেতন সংক্রান্ত একটি বিল পাস করাতে তারা ব্যর্থ হলে তারা পদত্যাগে বাধ্য হন। এ অবস্থায় ১৯২৪ সনের ১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রীদের হস্তান্তরিত বিষয়গুলোর দায়িত্ব গভর্ণর নিজহাতে নেন। প্রায় সাত মাস পর ১৯২৫ সনের মার্চ মাসে নওয়াব আলী চৌধুরী ও রাজা মন্ময় রায় চৌধুরীকে মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপক পরিষদে এই দুই মন্ত্রী মন্ত্রীদের বেতন সংক্রান্ত বিল পাস করাতে ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করেন। ফলে দ্বৈত শাসন পুনরায় স্থগিত করে গভর্নর হস্তান্তরিত বিষয়গুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯২৬ সনের ২১ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তা চলতে থাকে। ইতোমধ্যে ব্যবস্থাপক পরিষদের তৃতীয় মেয়াদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৬ সনে। পরিষদের অধিবেশন বসে পরের বছরের জানুয়ারি মাসে। এই পরিষদে ২২শে জানুয়ারি মন্ত্রীদের বেতন বিল পাস হয়। ঐদিনই স্যার আবদুর রহিমকে এই শর্তে মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয় যে, তিনি মন্ত্রী হিসেবে এমন একজন হিন্দু সদস্যকে বাছাই করবেন যিনি তার সঙ্গে যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। কিন্তু স্যার আবদুর রহিম এমন কাউকে রাজি করাতে না পারায় ২৬ শে জানুয়ারি ১৯২৭ সনে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ব্যোমকেশ চক্রবর্তী এবং স্যার এ কে গজনভীকে মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। এটাই ইতিহাসে গজ-চক্র মন্ত্রিসভা নামে বহুল আলোচিত। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরেই ব্যবস্থাপক পরিষদে তাদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলে তারা পদত্যাগ করেন। এমতাবস্থায় হস্তান্তরিত বিষয়গুলো পুনরায় গভর্নরকে গ্রহণ করতে হয়। ১৯২৭ সনের অক্টোবর মাসে পি.সি. মিত্র এবং নবাব মোশাররফ হোসেন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। কয়েক সপ্তাহ পরেই পি. সি. মিত্র গভর্নরের শাসন পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হলে তার জায়গায় ভূপ্রেন্দ্র নারায়ণ সিংহকে মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু প্রায় সাথে সাথেই ব্যবস্থাপক পরিষদে মন্ত্রীদ্বয়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উঠলে উভয়েই পদত্যাগ করেন। এভাবে দেখা যায় যে ১৯২৪ থেকে ১৯২৭ সন পর্যন্ত কোন মন্ত্রীই একনাগাড়ে ৭ মাসের বেশি থাকতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে সরকার দ্বৈত শাসনের কার্যকারিতা স্থগিত করেন। ১৯২৯ সনে ব্যবস্থাপক পরিষদের নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের পর কুমার শিবশেখর রায়, খান বাহাদুর কে, জি, এম, ফারুকী এবং খাজা নাজিমউদ্দিন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনজনই পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন লাভ করেন। ১৯৩০ সনের প্রথমদিকে কংগ্রেস সদস্যরা ব্যবস্থাপক পরিষদ বয়কট করলে মন্ত্রিসভায় মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে যায়।
১৯৩০ সনের আগস্ট মাসে কুমার শেখরেশ্বর রায় এবং খাজা নাজিমউদ্দিন এর মধ্যে ‘বেঙ্গল প্রাইমারী এডুকেশন বিল’ এর বিষয়ে মতদ্বৈততা সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও খাজা নাজিমউদ্দিন ব্যবস্থাপক পরিষদের মুসলমান  ও ইউরোপীয় সদস্যদের সমর্থন নিয়ে বিলটি পাস করাতে সমর্থ হন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিখরেশ্বর রায় মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার জায়গায় বিজয় প্রসাদ সিংহ রায় মন্ত্রী নিযুক্ত হন। পরবর্তী ছয় বছর দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা ভালোভাবে কার্যকর থাকে। ফলে আইন পরিষদে বঙ্গীয় প্রজাখাতক আইন, বঙ্গীয় স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন বিল প্রভৃতি পাস করা হয়। ১৯৩৪ সনে খাজা নাজিমউদ্দিন গভর্নরের শাসন পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হলে ঐ পদে খান বাহাদুর আজিজুল হক মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি, নবাব ফারুকী ও বি. সি সিংহ রায় ১৯৩৫ সনের ভারত শাসন আইনে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৩৭ সনের ১ এপ্রিল তারিখ পর্যন্ত মন্ত্রী পদে বহাল থাকেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ