ঢাকা, শনিবার 07 January 2017, ২৪ পৌষ ১৪২৩, ০৮ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

চিত্রা-সুন্দরবন নামে আন্তঃনগর এক্সপ্রেস : বাস্তবে লোকাল

নিজামউদ্দিন আহমেদ : এ কথা আজ বলার অপেক্ষা রাখে না যে রেল যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। এক সাথে বেশি যাত্রী, মালামাল পরিবহনে সক্ষম। ধুলা ময়লা থেকে অনেকটা মুক্ত। ঝাঁকুনি কম। পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থা আছে। অল্প মূল্যে গমনাগমন। রাত্রে শয্যার ব্যবস্থা, খাবার ব্যবস্থা সবই সহজলভ্য এবং আরমদায়ক। সর্বোপরি দুর্ঘটনার হারও অনেক কম। মোদ্দাকথা আরামদায়ক স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তাবোধক হওয়া রেল ভ্রমণ এখন গোটা বিশ্বে সমাদৃত। বিশ্বের উন্নয়নশীল ও উন্নয়নকামী দেশগুলো রেলের উন্নয়ন ঘটিয়ে যাচ্ছে। এখন ঘণ্টায় তিনশ থেকে চারশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বড় বড় শহরগুলোর উপর আবাসন চাপসহ সমগ্র টাকা কমে আসছে। কর্মজীবী এবং সাধারণ জনগণ তাদের প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করে নিজের আবাসনে ফিরে আসে।
হয় হয় করে স্বাধীনতার অর্ধশত বার্ষিকী গমন করতে যাচ্ছি আমরা। অথচ রেল উন্নয়নের ছোঁয়া যে তিমিরে সে তিমিরে। আজো খুলনা থেকে ঢাকা যেতে বারঘণ্টা সময় লাগে। দূরত্ব রেলপথে ছয়শ আর সড়ক পথে তিনশ তিরিশ কিলোমিটার। অনুরূপ উত্তরবঙ্গ থেকেও রাজধানীর দূরত্ব কম বেশি একই রকম এবং সময়ও লাগে কোন কোন ক্ষেত্রে আরো অধিক। তবে উন্নয়ন হয়েছে রেল ভাড়াতে,লাফাতে লাফাতে পঁয়তাল্লিশ বছরে বেড়েছে একশ পঁয়তাল্লিশ গুণ। খুলনা থেকে ঢাকা যেতে সর্বনিম্ন সাড়ে পাঁচশ থেকে পনেরশ টাকা। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় বনগাঁ থেকে শিয়ালদা (কোলকাতা) মাত্র পনের টাকা। দূরত্ব প্রায় একশ কিলোমিটার, ভাড়া অনুপাতে সেবার মানোন্নয়ন হয়নি। যেমন সময়ের অপচয়ে সাথে সাথে অর্থের অপচয় হচ্ছে, হচ্ছে দেশের সার্বিক উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত। সময় ব্যবস্থপনা নেই, নেই সময়ের হিসাব, কতো কোটি কর্মঘণ্টা যে প্রতিদিন বিনষ্ট হচ্ছে তার হিসাব কোন সরকারের বেলায় দেখা যায় না। কর্মঘণ্টা অপচয় যদি হ্রাস করা যেতো, দেশের উন্নয়ন দীর্ঘ পরিকল্পনার আগেই পূরণ করা সম্ভব হতো। এটা আজ স্বীকৃত যে উন্নয়নের প্রথম সোপান হলো যোগাযোগ ব্যবস্থা। সড়কপথ, নৌপথ বা রেলপথ নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য করতে হবে। কাগজে কলমে যতোই উন্নয়নের কথা বলা হোকনা কেন কিংবা ভাড়াটে বিদ্বান দিয়ে যতোই হিসাব নিকাশ করা হোক, প্রকৃত উন্নয়ন দেখা যাবে না। এ প্রসঙ্গে আর একটি বিষয় উল্লেখ্যের দাবি রাখে। তাহলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, শাসন ব্যবস্থা যেমন মন্ত্রণালয় থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে, তেমনি নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের জনগণের দ্বারপ্রান্তে নিতে হবে। একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ থেকে অবসর পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বিষয় দেখভাল করে অধিদপ্তর। কোন কোন ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়। কেন এটা কী জেলা বা বিভাগ পর্যায়ের কর্মকর্তা সম্পাদনে অক্ষম? থাক এটা অন্য বিষয়। এ বিষয় আর একদিন লেখা যাবে। রেল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। স্বাধীনতার সময় যতটুকু রেলপথ ছিল তার চেয়ে কমে গেছে। বলা যেতে পারে খুলনা থেকে বাগেরহাট রেল লাইনের কথা। এটি আজ অচল। অথচ এর উন্নয়ন করার কথা ছিল। নানা অযুহাতে এটা তৎকালীন সরকার বন্ধ করেছে। ডবল রেল লাইন না থাকার কারণে একটি ট্রেনকে যাওয়ার জন্য অন্যটি কোন কোন ক্ষেত্রে ঘণ্টা খানিক দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রী সাধারণ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। সময় অপচয় রোধে এবং জনগণের দুর্ভোগের কথা মাথায় রেখে ডবল লাইন স্থাপন করা অত্যাবশ্যক।
খুলনা থেকে ঢাকাগামী দুটি ট্রেন সকাল-রাতে চলাচল করে। নাম দেয়া হয়েছে “আন্তঃনগর এক্সপ্রেস ট্রেন” এটি এমন আন্তঃনগর যে খুলনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত ছাব্বিশটি স্টেশনে থামে। আন্তঃনগরের অর্থ কী আমি বুঝি না। যদি শুধু নগরগুলোতে থামতো তাহলে এ নামের সার্থকতা থাকতো। খুলনা থেকে ছেড়ে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ঈশ্বরদী, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ঢাকা হলে আন্তঃনগর নামকরণের যথার্থতা ফুটে উঠত। ছাব্বিশটি স্টেশনে থামার জন্য প্রায় দু ঘণ্টা অপচয় হয়। ট্রেন ক্রসিং এর জন্য আরো ১ ঘণ্টা মোট তিন ঘণ্টা কমাতে পারলে, দূরপাল্লার যাত্রীদের ভোগান্তি কমতো, সাথে সাথে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পেতো। খুলনা টু ঈশ্বরদী, ঈশ্বদরী টু টাঙ্গাইল, গাজীপুর টু ঢাকা দিনে কমপক্ষে চারবার লোকাল ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করলে রাজস্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি পেতো। সড়ক পথের দুর্ঘটনা থেকে মানুষ নিশ্চিত হতে পারতো।
দূরপাল্লার ট্রেনে অনেক যাত্রী ছাগল, হাঁস, মুরগি, জ্বলানি কাঠ অন্য লটবহর আছেই যাত্রীর কারণে। যাতে অন্য যাত্রীদের যে কী অসুবিধা হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।ওই যাত্রীর টিকিট নেই, সিটও নেই। আবার কারো টিকিট আছে তো আসন নেই। ওর নাম নাকি “স্ট্যান্ডিং টিকেট” এ এক অদ্ভুত ব্যবস্থা। পৃথিবীর কোন দেশে স্বল্পপাল্লার বা দূরপাল্লার ট্রেনে চড়ার জন্য “স্ট্যান্ডিং টিকেট” বিক্রি করা হয় কিনা আমার জানা নেই। ওই “স্ট্যান্ডিং টিকেট” যাত্রী ঠিক আপনার সিটের হাতলে বসে অথবা সিটের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ান। ফলে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী যাত্রী এক অব্যক্ত মানসিক চাপে ভুগতে ভুগতে বার ঘণ্টা পর ঢাকায় পৌঁছান। ট্রেনের কোন কামরায় স্ট্যান্ডিং টিকেটধারীদের ধরে দাঁড়াবার কোন ব্যবস্থা নেই। ট্রেনের কামরায় ঘন ঘন ছাপ্পা মারা আছে। অনুগ্রহ করে সিটের হাতলে বসবেন না। কি মজা! স্ট্যান্ডিং টিকেট দেবেন। দাঁড়াবার ব্যবস্থা নেই। ধরার ব্যবস্থা নেই, তাহলে যাত্রীটি চলন্ত ট্রেনে কিভাবে ভ্রমণ করবে কর্তৃপক্ষ বাতলিয়ে দিলে ভাল হয়। অচিরেই “স্ট্যান্ডিং টিকেট” প্রথা বাতিল করা হোক।
প্যাসেজ বা করিডোরে ওই সকল স্ট্যান্ডিং টিকেটধারী যাত্রীদের লটবহর লেখে স্বাভাবিক চলাচলের পথ রুদ্ধ করে কামরার দরজায় এবং টয়লেটের নিকট মালপত্র নিয়ে বসে থাকে যাত্রী সাধারণ উঠতে ও নামতে কষ্ট পায়। অনেক সময় নামতেও পারেনা মহিলাও শিশুদের নিয়ে এমন কি উঠতেও পারে না অগ্রিম টিকেট ক্রয়কারী যাত্রী। এগুলো দেখার কেউ নেই। ট্রেনে রেল পুলিশ রয়েছে তারা দরজা ও টয়লেটের স্থানটুকু ফাঁকা রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন, কিন্তু তারাও নির্লিপ্ত থাকেন কোনএক কিশেষ কারণে। মহিলা ও বৃদ্ধ বা শিশুরা টয়লেটে যেতে পারে না ওই অনাবশ্যক টিকেটবিহীন যাত্রীদের ভিড়ে।
ট্রেন থামার সময় কিছু বগি প্ল্যাটফর্মের বাইরে রয়ে যায়। এতে করে যাত্রীদের যে কী অবর্ণনীয় বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না। আর প্ল্যাটফর্মগুলো মান্ধাতার আমলের। ট্রেনের উচ্চতা থেকে প্ল্যাটফর্মগুলোর অনেক নিচুতে, উঠা নামার সময় দুর্ঘটনা ঘটে অনেক সময় ট্রেনের উচ্চতার সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের উচ্চতা সমন্তরাল না হলে যাত্রীদের যে কষ্ট হয় তা রেলমন্ত্রী তথা রেল বিভাগের কেউ ভাবে না। তারা ভাবে “চলছে তো বেশ চলুক” স্টেশনগুলোতে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ থাকে না। রাতের যাত্রীদের কামরা খুঁজে উঠতে এবং নামতে বিড়ম্বনার শেষ নেই। কথিত “চিত্রা” আর “সুন্দরবন” ট্রেন দুটিতে বলা হয় পরবর্তী স্টেশনের নাম। যাত্রীদের নামার ও উঠার জন্য অনেক সুন্দর সুন্দর শব্দ চয়ন করা হয়। কিন্তু শেষ রাতের দিকে আর স্টেশনের নাম বলা হয় না। যখন বলা বেশি প্রয়োজন। গভীর বা শেষ রাতের যাত্রীরা থাকে অবসন্ন কিংবা নিদ্রাচ্ছন্ন। স্টেশনে আলো না থাকার জন্য স্টেশন চেনাও যায় না কিংবা স্টেশনের মানটি পাঠোদ্ধার করা সম্ভব না। দূরপাল্লার যাত্রীরা আট দশ ঘণ্টা ট্রেনে বসে ও থাকতে থাকতে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অবসন্ন হন। অনাকাক্সিক্ষত যাত্রী এবং হরেক কিসেমের ফেরিওয়ালাদের উৎপাত এটা বাড়তি চাপ স্নায়ুকে অবসান্ন করে। অথচ দূরপাল্লাার ট্রেনে নিজস্ব খাবার ব্যবস্থা রয়েছে। কয়েক মাস হলো কিছু দূরপাল্লার ট্রেনগুলোতে নতুন বগি সংযোজন করা হয়েছে। এগুলো উন্নত মানের হলেও অনভিজ্ঞ যাত্রীদের যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে তা ইতোমধ্যে অনেকাংশে নষ্ট হতে বসেছে। আগের ট্রেনে একটি পৃথক কামরা ছিল নামায আদায়ের জন্য এবার তা নেই। যা আছে সেখানে নামায আদায় করা যায় না। শেষে একটা কথাই বলবো অন্তঃনগর ট্রেনগুলো নগর স্টেশনে (যশোর, চুয়াডাঙ্গা, ঈশ্বরদী, টাঙ্গাইল, গাজীপুর) থামুক। দূরপাল্লার যাত্রীদের দীর্ঘ ক্লান্তি বিদূরিত হোক। স্বল্প পথের যাত্রীদের জন্য লোকাল ট্রেনের ব্যবস্থা করা হোক।
ট্রেন ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে নগরগুলোতে মানুষের চাপ এমনিতে কমে আসবে। রাষ্ট্রের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। দেশ উন্নয়নের পথে আরো অগ্রসর হবে।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, খুলনা সাহিত্য পরিষদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ