ঢাকা, শনিবার 07 January 2017, ২৪ পৌষ ১৪২৩, ০৮ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ত্রিশালকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপদান করা দরকার

মোঃ আব্দুল ওয়াহেদ : সাহিত্যিক সাংবাদিক আবুল কালাম সামসুদ্দিন, সাংবাদিক সাহিত্যিক রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমেদের জন্মভূমি ত্রিশাল। ত্রিশাল এমন একটি নাম, যে নামের সাথে মিশে রে ছে একটি অতুলনীয় নাম। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কিশোর জীবনের কয়েকটি বছর কেটেছে এই ত্রিশালে। ত্রিশাল উপজেলার কাজী শিমলা কাজী বাড়ি, দরিরামপুর হাইস্কুল এবং নামাপাড়ায় বেচুতিয়া মন্ডলের বাড়ি, নজরুলের বাঁশি বাজানোর স্মৃতিবহ বটগাছ, দুখু মিয়া বিদ্যানিকেতন ও সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় ধরে রেখেছে মহাকবির মহান স্মৃতি। কাজী কবির সেই দুঃসহ শৈশবে, আসানসোলের রুটির দোকান থেকে পুলিশ ইন্সপেক্টর কাজী রফিজউল্লাহ নজরুলকে নিয়ে এলেন ত্রিশালে, তার বাড়িতে। ছোট ভাই কাজী হামিদ উদ্দিনের ওপর নজরুলের দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন। দায়িত্ব দিয়ে তিনি আবার বর্ধমানে চলে গেলেন। হামিদউদ্দিন সাহেব ত্রিশাল দরিরামপুর হাইস্কুলে (বর্তমানে নজরুল একাডেমী) ৭ম শ্রেণিতে নজরুলকে ভর্তি করে দেন। কাজী শিমলা থেকে ৭ মাইল কাঁচা পথ, পায়ে হেঁটে প্রতিদিন ক্লাস করতে হয়। তাতে নজরুলের ভীষণ কষ্ট হতো। তাই হামিদ উদ্দিন সাহেব নজরুলের লেখাপড়ার অসুবিধার কথা চিন্তা করে জায়গিরের ব্যবস্থা করে  দেন ত্রিশালের নামাপাড়া বিচুতিয়া মন্ডলের বাড়িতে। সেখান থেকে স্কুলে যেতে হয় শুকনি বিলের মাঝখান দিয়ে। সামান্য বৃষ্টি হলেই তা পানির নিচে তলিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে নজরুল বিলের টানে বটবৃক্ষের নিবিড় ছায়ায় বসে রাখাল সঙ্গী-সাথী নিয়ে বাঁশি বাজানো, কানামাছি, হা-ডু-ডুসহ বিভিন্ন খেলায়  মেতে উঠতেন। পরে পণ্ডিত এ,বি,এম খিজির নজরুলকে নিয়ে যান তার শ্বশুর বাড়ি, দরিরামপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম বীররামপুরে। সেখান হতেই নজরুল পুরো বর্ষাকাল নিয়মিত ক্লাস শুরু করেন। পণ্ডিত সাহেবের শ্যালিকা নুরুন্নাহারকে জড়িয়ে এর সূত্র। নুরুন্নাহার কবির নিকট ভোরে আরবি পড়তেন। কবির গান, কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার নুরুন্নাহারকে মুগ্ধ করেছিলো। কবির ‘অগ্নিগিরি’র আখ্যান রচিত হয়েছে বীররামপুরের স্মৃতিকে ঘিরে। তিনি ত্রিশালে ব্যাপকভাবে আদর পেয়েছিলেন। তার সহপাঠী মরহুম নিয়ামত উল্লাহ মাস্টার, ওয়াজেদ আলি ও ছফির উদ্দিনকে পেলে আনন্দে ফেটে পড়তেন কবি। সেই কিশোর বয়সের আবেগ আকুলতায় কিশোর কবি দরিরামপুর, বীররামপুর, ত্রিশাল, নামাপাড়া ও কাজীর শিমলার অভিজ্ঞতা কবির প্রতিভাকে জাগিয়ে তুলেছিলো। নজরুল ইসলামের সঙ্গে সেই অঞ্চলের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ ছিলো। কাজীর শিমলা কাজী বাড়ি দরিরামপুর নজরুল একাডেমি, ত্রিশাল নামাপাড়াতে নজরুল সংস্কৃতি  বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতিকে ধরে রাখা আমাদের জাতীয় কর্তব্য। কাজীর শিমলার কাজী বাড়ি, দরিরামপুর নজরুল একাডেমী এবং ত্রিশাল নামাপাড়া ‘দুখু মিয়া বিদ্যানিকেতন’কে ঘিরে স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সে স্থানগুলোকে সংরক্ষণ করে স্মৃতিস্বরূপ ধরে রাখার জন্যে বাংলাদেশ সরকার কি উদ্যোগ নেবেন না?
১৯৭৯ সনের জুন মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নজরুল একাডেমির মাঠে নজরুল স্মৃতি সংরক্ষণ ও পাঠাগার নির্মাণের জন্যে ১১ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দ করেন। ১৯৮১ সনের প্রথম দিকে পাঠাগারের ভিত্তি স্থাপন করেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদিউর রহমান। দু’তলা ভবন নির্মাণের কাজ করলেও পাকা ছাদ না করে কাঠের ফ্রেমে টিনের ছাদ নির্মাণ করা হয়। ১৯৮১ সনের ৩০ মে, প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হওয়ার পর তৎকালীন সংসদ সদস্যের যোগসাজশে উক্ত পাঠাগারকে সিনেমার হল বানানোর পরিকল্পনা নেন। কিন্তু এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও নজরুল একাডেমির ছাত্র-শিক্ষকের প্রতিরোধের মুখে কার্যকর করতে পারেনি। ১৯৮১ সনে ত্রিশালে ভয়াবহ ঘূর্ণি-ঝড়ে পাঠাগার ভবনের টিনের ছাদ উড়িয়ে নিয়ে যায়। ফলে দিনে দিনে কাঠের ফ্রেমগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। দীর্ঘদিন পাঠাগার ভবনটি অবহেলিত থাকার পর ১৯৮৭ সনে এরশাদ সরকার ভবনটির নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছেন। কাজীর শিমলা ঐ দারোগা বাড়িতে এখন ১টি ছোটো পাঠাগার রয়েছে। উক্ত পাঠাগারটিও মরহুম জিয়াউর রহমান সাহেবের সময় ৮৫ হাজার টাকা সাহায্য পেয়ে গড়ে উঠেছে। বেশ কিছু বই সংগ্রহ হয়েছে। বর্তমান সরকার আর কোনো সাহায্য দেননি। নজরুল যে ঘরে বাস করতেন, সে ঘরটি বর্তমানে নেই। তবে সেখানে নতুন ঘর উঠেছে, তাও জীর্ণ। নজরুল নামাপাড়ার যে বাড়িতে থাকতেন, সে বাড়িতে ‘নজরুলের সংঘ’ গড়ে উঠেছে। সাহায্য নেই বলে সেটা জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। নজরুল স্মৃতি বিজড়িত তাল গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। সেই ঐতিহাসিক বট গাছটির গোড়া বাঁধিয়ে রাখা হয়েছে।
ত্রিশাল নজরুল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এবং সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য জনাব আব্দুল রমিদ সাহেবের একান্ত প্রচেষ্টায় একসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন বৃহত্তম ময়মনসিংহ সংস্কৃতি ফোরামের সভাপতি জনাব আশরাফ সিদ্দিকী, সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যক্ষ হামিদা আলী, ডিজি বদিউজ্জামান, রাশেদুল হাসান শিলি ও আরো অন্যান্য উক্ত সভায় কাজী নজরুল ইসলাম সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রস্তাব পাস করা হয়। এই প্রস্তাবটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ এর নিকট পাঠানো হয়। উক্ত প্রস্তাবটি একনেকে পাস করিয়ে সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।
১ মার্চ ২০০৫ ইং সাবেক প্রধানমন্ত্রী  বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশাল নামাপাড়া ৫ একর জমির উপর ত্রিশাল সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। কবির ১০৭তম জন্মদিনে তিনি আবার সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শুভ উদ্বোধন করেন। দিনে দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর বেড়ে প্রায় ২০ একর জমির উপর বর্তমানে নিয়মিত লেখাপড়া চলছে।
সরকার থেকে কাজী সিমলা, দরিরামপুর নামাপাড়ায় তথ্য কেন্দ্র করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলো সরকার নিয়ন্ত্রণাধীন আনা দরকার। কাজী সিমলা, দারোগা বাড়ি, ত্রিশাল নামাপাড়া, বেচুতিয়া ম-লের বাড়ি, দুখু মিয়া বিদ্যানিকেতন, নজরুল একাডেমি, নজরুল সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রভৃতি স্মৃতিবহ স্থান ও প্রতিষ্ঠান সমন্বয়ে একটি পর্যটন  কেন্দ্র করতে আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাই।
লেখক : দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ’র বিজ্ঞাপন বিভাগে কর্মরত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ