ঢাকা, সোমবার 09 January 2017, ২৬ পৌষ ১৪২৩, ১০ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সৌন্দর্যের তুষার দেশ

৮ জানুয়ারি, ডেইলি মেইল : প্রকৃতির এক আশ্চর্য আবিষ্কার হিমালয়। তুষার পরিহিত পাহাড়-পর্বত, অত্যাশ্চার্য উদ্ভিদ এবং প্রাণী, নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের হিমালয়ে অন্যরকম জীবনের উৎস মেলে এখানকার মানুষের মাঝে। ২ হাজার ১শ ৯৫ কিলোমিটার বা ৭ হাজার ২০০ ফিট ওপরে বাস করে হিমালয়ান অধিবাসীরা। ঘন মেঘ, লুকোনো সূর্য, তুষার ঝরা ঋতু আর বরফের চাদরে বাস করে তারা। তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস, পেশা এবং জীবনযাত্রা একেবারেই আলাদা বাহিরের পৃথিবী থেকে।
উপজাতি : নেপালের নাগরকোটের হিমালয়ানদের প্রতিবেশি হল মাউন্ট এভারেস্ট। ৫০ লক্ষ মানুষের বাড়ি এই মেঘের দেশে। উত্তর পূর্ব ভারতের সিকিম, নেপাল, ভুটান, আসাম, অরুণাচলে হিমালয়ান উপজাতিরা বাস করে। শুধুমাত্র অরুণাচল প্রদেশেই ৮০টি উপজাতি বাস করে। তারা ইন্দো-মঙ্গোলয়েড জাতির অন্তর্গত। হিমালয়ান উপজাতিরা তিন ভাগে বিভক্ত, আরাকান, মঙ্গোলয়েড এবং নেগোরিড। কিন্তু তাদের সত্যিকারের বংশ পরিচয় বিতর্কিত। নেপালের শেরপা এবং ভারতের কাশ্মীর থেকে অনেক মানুষ এসে এই পাহাড়ের কোলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।
ধর্ম ও জীবন : স্বর্গের শুভ্রতায় বাস করা বৈচিত্রময় হিমালয়ান অধিবাসীরা বৌদ্ধ, ইসলাম, হিন্দু ধর্মের অনুসারী। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠই বৌদ্ধ ধর্মের অনুগত। গোধূলি বেলায় হিমালয়ের পাদদেশে শোনা যায় সন্ধ্যার সুর, ঐতিহ্যবাহী তিব্বতিয়ান গান গেয়ে প্রার্থনা করে তারা। হিমালয়ান অধিবাসীদের পোশাকপরিচ্ছদের মাঝে জম্মু এবং কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, সিকিম, নেপাল, অরুণাচল প্রদেশ, ভুটান এবং তিব্বতের মানুষের পোশাক পরিচ্ছদের প্রভাব আছে। তারা পাকিস্তানি, ভারতীয়, ভুটানিয় এবং তিব্বতিয়ান ভাষায় কথা বলে।
হিমালয়ে পশু-পাখিদের একটি বড় বিপন্ন প্রজাতি বাস করে। এই অঞ্চলে শিকার একটি জনপ্রিয় কাজ। গারাওয়াল জনপ্রিয় শিকারের জায়গা।
অর্থ এবং প্রযুক্তি ছাড়াই দিব্যি দিন কাটিয়ে দিতে পারে তুষার দেশের এই বাসিন্দারা। এই অঞ্চলে আধুনিতার একমাত্র নিদর্শন পুরোনো সেলাই মেশিন। এটিই একমাত্র বাহিরের পৃথিবীর সাথে তাদের যোগাযোগ নির্দেশ করে। ঐতিহ্য অনুসারে তিব্বতের নারীরা একের বেশি মানুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে। একজন গৃহস্থালী কাজে তাদের সাহায্য করে আরেকজন বাহিরে কাজ করে জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করে।
বরফে ঢাকা পাহাড়ের বুকে খাদ্য অন্বেষণ করে দিন কেটে যায় তিব্বত-ভারতীয় সীমান্তের যাযাবর উপজাতি জিমমাইদের। আয়ের একমাত্র উৎস ছাগল পালন। ভারত সরকারের কাছে তারা ছাগল বিক্রি করে। তবে তারা জানায়, এর জন্য তাদেরকে খুব কম দাম দেয়া হয় কিন্তু তাদের কিছুই করার নেই। জিমাই কিশোরি সোনাম (১২) বরফে ঢাকা পাহাড়ে তার ছাগলগুলোকে চরাতে চরাতে গান ধরে। তার বাবা গায়েসতোর বয়স যখন সাত বছর তিনি এই স্থানে পালিয়ে আসেন। এই দ্বীপের অধিবাসীদের সাথে মিলে তিনিও এই আদিম জীবন যাপন করতে শুরু করেন। রাতের বেলা টিমটিম করে আলো জ্বলে হিমালয়ের বুকে। ছাগলের মাংস, দুধ এবং তিব্বতের বিশেষ খাদ্য মোমোস (দুধ, মাংস ও সবজি দিয়ে তৈরি করা পুডিং) তিব্বতিয়ান চা এবং সামপা তাদের প্রধান খাদ্য। দালাইদামার প্রতি অত্যন্ত অনুগত তারা, তিনি হিমালয়ান অধিবাসীদের শিক্ষার ওপর জোরদান করেন, গায়েস্তাও তার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান। কিন্তু তারা যে পরিমাণ আয় করেন তা দিয়ে দূরের লাদাখ এর লিহ শহরের স্কুলে পাঠানো তাদের জন্য সম্ভব হয় না।
তুষার মানব : হিমালয়ান বাসিন্দাদের বিশ্বাস, ইয়েতি (মানুষের মত দেখতে বৃহৎ একটি লোমশ প্রাণী) হিমালয়ে ঘুরে বেড়ায়। একে বলা হয় বীভৎস তুষার মানব। ইয়েতির অর্থ ‘পাথুরে ভালুক’। মানুষের মত গড়নের, বানর জাতীয় মুখ, লালচে বাদামী চুল রঙা চুলের এই প্রাণীটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে আলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী।
ম্যাড হানিও বন্যঔষধি : ‘রডোডেনড্রন অ্যানথোপোগন’ নামের গাছ তাদের কাটা ছেঁড়া ও ক্ষত সারার কাজে ব্যবহৃত হয়। ঔষধ হিসেবে তারা নানা প্রজাতির গাছ ব্যবহার করে। বছরের নির্দিষ্ট মাসে হিমালয়ে ফোটে এক বিষাক্ত ফুল। এই ফুলের বিষ থেকেই তৈরি হয় পৃথিবীর সবচাইতে দুলর্ভ খাদ্যবস্তু ‘ম্যাড হানি’। আয়তনে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা মাটি থেকে হাজার হাজার মিটার উপরে হিমালয়ের খাঁজে বাসা বাঁধা দৈত্যকার মৌমাছি এই মধু সংগ্রহ করে।
সেখানে আধিপত্য প্রাচীন গুরুং উপজাতির। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, মাদকের চেয়েও বেশি নেশা রয়েছে এই বিশেষ মধুর মধ্যে। উচ্চ রক্তচাপ, সুস্বাস্থ্য এবং নিয়মিত সঙ্গমেও বিশেষ উপকারী। তবে, বেশি খেলে তা আবার হৃৎপিন্ডের জন্য ক্ষতিকর এবং নেশার চোটে মানুষের চোখে ধাঁধা লেগে যায়।
সারা পৃথিবীতে গুটি কয়েক মানুষই এই বিশেষ মধুর স্বাদ পেয়েছেন। তবে গুরুং উপজাতির বাসিন্দারা রোজ সকালে সেবন করে থাকেন এর এক চামচ। এতেই তাঁরা আবার শক্তি পান দুর্গম পাহাড়ের উপরে উঠে এই বিরল মধু সংগ্রহ করার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ