ঢাকা, সোমবার 09 January 2017, ২৬ পৌষ ১৪২৩, ১০ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নতুন বছরের প্রত্যাশা

‘দেশের অবস্থা’ নিয়ে আম-নাগরিক সমাজে চিন্তা-ভাবনার অন্ত নেই। নানা পেশা ও বৃত্তির মানুষ নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের সর্ব-সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন। কখনও আশাবাদী হন; কখনও হতাশায় ডুবে যায়। তবু দেশ নিয়ে মানুষের চিন্তার বিরাম নেই। বর্তমান সরকারের কার্যক্রম নিয়ে মানুষের ভাবনার প্রতিফলন আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখি। মানুষের আলোচনাতেও নানা কথা ওঠে আসে। মানুষ দেশ ও মানুষকে সামনে রেখে গণতন্ত্র ও অধিকারের প্রশ্নটি সব সময়ই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। বিশেষত নির্বাচন বা ক্ষমতার প্রশ্ন ক্রমে ক্রমেই মানুষের আলোচনার সামনে চলে আসছে। এভাবেই গণমানুষের ভাবনার বৃত্তটি প্রসারিত হতে থাকে। রাজনৈতিক সামাজিকীকণের কাজটিও সন্তর্পনে চলতে থাকে। অতএব চরম কিংবা নরম, কোনো অবস্থাতেই মানুষের চিন্তা-ভাবনা থেকে থাকে না। মানুষ রাজনৈতিক জীব হিসাবে তা চিন্তা-ভাবনা চালিয়েই যেতে থাকে।
ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই প্রশ্ন: ‘বাংলাদেশ কেমন চলছে?’ কেউ কেউ আরো গভীরে গিয়ে এটাও ভাবেন যে, ‘কেমন চলছে রাষ্ট্র ও সরকার?’ অনেকেই এই বিশ্লেষণও করেন যে, ‘কেমন চলা উচিত রাষ্ট্র ও সরকার?’ মানুষের মনের মধ্যে রেখাপাত করে এই কঠিন অথচ  বাস্তব প্রশ্নটি। মানুষ অতীতে কষ্ট নিয়ে ভাবে; বর্তমানের দুঃখ নিয়ে ভাবে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়েও চিন্তিত হয়। নেতৃত্বের কাজ হলো মানুষকে ভয়-ভীতি-বিপদের বাইরে নিয়ে এসে তাঁদেরকে চিন্তামুক্ত করা। কিন্তু সেটা সর্বদা সম্ভব হয় না। ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে পৌঁছুবে এবং সঙ্কটের উত্তরণের উপায় কি, এমন ভাবনা থেকে মানুষকে কেউ মুক্তি দিতে পারছে না। ফলে মানুষ চিন্তিতই রয়েছে। তাদের দুঃচিন্তার অবসান ঘটছে না।
সন্দেহ নেই, কোনো বিবেচনাতেই এসব প্রশ্ন তুচ্ছ নয়। যারা সংবেদনশীল, ভাবুক ও সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমিক, তারা এসব প্রশ্ন এবং প্রশ্নের উত্তর নিয়ে চিন্তিত। যারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তারা উদ্বিগ্ন। বিশ্লেষকরা গভীর অনিশ্চয়তার আভাস পাচ্ছেন। পত্রিকার কলাম আর টক শোতে উঠে আসছে এমনই মন-খারাপ-করা তথ্য, উপাত্ত, সঙ্কটের পূর্বাভাস। যে বিপদের ঘেরাটোপ থেকে যেন মানুষ বের হতেই পারছে না।
ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যমান সমস্যা ও ইস্যুর তালিকা করতে হলে গবেষণার প্রয়োজন হবে। সব ইস্যু একত্রিত করলে মনে হবে, বাংলাদেশ আসলে একটি ‘সমস্যা ও ইস্যু প্রজনন কেন্দ্র’। সমস্যা ও ইস্যুগুলো সবই বিরোধী দলের ষড়যন্ত্রের ফল নয়; সরকারি দলের অতি উৎসাহে তৈরি। অনেক মাথা-মোটা সরকারি পণ্ডিত মনে করেন, বিরোধী দলকে এক ইস্যু থেকে অন্য ইস্যুতে ঠেলে দিলে তারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে পারবে না। তা হয়ত ঠিক। কিন্তু সমস্যা ও ইস্যুর খেলায়  খোদ সরকার নিজেই যেন গলা পর্যন্ত ডুবে না যায়, সেটাও তো খেয়াল করা দরকার।
বাস্তবে ইস্যুর কচকচানি নয়, মানুষ কথার বদলে কাজ চায়, সমস্যার বদলে সমাধান চায়, বিপদের বদলে শান্তি চায়, স্বৈরতার বদলে গণতন্ত্র চায়, এটাও মনে রাখা দরকার। শুধু ইস্যুর নামে মাঠ গরম করা নয়, সরকারের দায়িত্বের মধ্যে সরকার ও প্রশাসনে গণতান্ত্রিকতা, সুশাসন, আইনের বিধান পালন, দুর্নীতি মুক্ত থাকা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা করা, অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি প্রতিপালন করা, নাগরিকদের যথাযথ পরিসেবা প্রদান করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বস্ত্র, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বহুবিধ সাংবিধানিক কর্তব্য রয়েছে, এ কথা কেউ কেউ ভুলে গেলেও সবাই ভুলে যেতে পারে না। আবেগের ফানুস উড্ডয়েনর নাম রাজনৈতিক দক্ষতা নয়, কথাটি মনে রাখা দরকার।
রাষ্ট্র ও মানব সমাজে সমস্যা ও ইস্যু থাকবেই, সেটার সুরাহা করাই বড় কথা। সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতার প্রমাণও পাওয়া যাবে পারঙ্গমতার মধ্যেই। আবেগী বা বিদ্বেষমূলক বাগাড়ম্বর বা প্রতিপক্ষের প্রতি শক্তি প্রয়োগ সাফল্যের চিহ্ন নয়। ‘হাম সে বড়া কৌন হ্যায়’ ধরনের আত্মগরিমার নাম সুশাসন নয়। সুশাসনের সঠিক প্রচলন সম্পর্কে সবাইকেই সততার পরিচয় দিয়ে হবে। পক্ষপাত বা একদেশদর্শিতার অবসান না হলে সুশাসন আসবে না।
সুশাসনকে বুঝতে হলে বাংলাদেশের ভেতরের অবস্থার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক মানচিত্রের দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার আরো সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাবে। মনে রাখা দরকার যে, ভৌগোলিক কারণে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এই প্রভাব সামরিক, মতাদর্শিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ বহুবিধ। পারমানবিক অস্ত্র ভাণ্ডার থাকায় ভারত এ অঞ্চলে নিজের সামরিক প্রভাবকেও নিত্য জাহির করছে। প্রতিবেশীদের পক্ষ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদ-এর অভিযোগ উত্থাপিত হওয়াটাও যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করে। ভারত তার নিজ দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেসব কার্যকলাপ চালাচ্ছে, সেটার নানামুখী প্রভাবও প্রতিবেশীদের জন্য মাথা ব্যথার কারণে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সবক ভারত দিচ্ছে এবং অঞ্চলের অনেক দেশের ভারতপন্থী সরকার সেটা শিক্ষা ও চর্চা করছে। রাষ্ট্রীয় শ্বেত সন্ত্রাসকে হটাতে ভারতের দিকে দিকে লাল সন্ত্রাসের অগ্নিগর্ভ উত্থান আসলে আর কিছু নয়: ভারতীয় নীতি ও কার্যক্রমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বাই-প্রোডাক্ট। অতএব ভারত কর্তৃক আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের বিকাশ ঘটানোটা এ অঞ্চলের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণও বটে। এবং ভারতীয় সন্ত্রাস-প্রাধান্যমূলক নীতি ও অভিজ্ঞতার কারণে এ অঞ্চলের কোনো কোনো দেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিকাশের ঘটনাও দ্রুত বেগে ঘটছে। বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিসমূহ সরকারের বিরুদ্ধে জেল-জুলুম-নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকেই তাদের প্রধান অভিযোগরূপে চিহ্নিত করছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যমান শাসনের বিশৃঙ্খলা ও সুশাসনের অভাবের সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্রের মুখাবয়বেও একদলীয়-স্বৈরতন্ত্রের কালিমা লাগছে। স্বীকার না করা হলেও সুশাসন, গণতন্ত্র ও বহুদলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির ঐতিহ্যে বিরাট অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় শুধু সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের ভিত্তিতে দেশে-দেশে ভালো সম্পর্ক হয় না। সরকার ও বিরোধী দলসহ জনগণের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রচনা করার মাধ্যমেই দেশে-দেশে সুসম্পর্কের সেতু রচিত হয়। ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ ও একচক্ষুনীতি পরিহার করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চল ও দেশসমূহে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আছে, তা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকেই অনুধাবণ করতে হবে। 
দেশের ভেতরের ও বাইরের এই অবস্থায় বা দুরবস্থায় পারস্পরিক অবিশ্বাস, দূরত্ব, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অচলাবস্থা, নৈরাজ্য-রক্তপাত বা ভীতি নয়, সঙ্কট উত্তরণের জন্য প্রয়োজন উঁচু মানের নেতৃত্বের সাহসী ও ইতিবাচক দিক-নির্দেশনার; তার উদারতা ও খোলা মনের মাধ্যমে সকলের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা; ক্ষুদ্রতা ও সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে এসে দেশ ও মানুষের কল্যাণকে সুনিশ্চিত করা। যে নেতৃত্ব সকলকে বুকে টেনে নেবো। শত্রু-মিত্রের কাল্পনিক দেওয়াল ও দ্বৈরথ ভেঙে দেবে। ঐক্যের পথে বিরাজমান ফাটলগুলোকে ভরাট করে দেবে। হিংসার কবর রচনা করবে। রাজনৈতিক হীনমন্যতা ও বৈরীতার আদিম রক্তমুখী ধারা থেকে সরে আসবে। হাতে হাতে রেখে বাংলাদেশের সকল মানুষ সেই নেতৃত্বের পিছে পিছে ভেদাভেদ ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সম্মিলিত মানবকণ্ঠ শুদ্ধতর উচ্চারণে বলতে পারবে: ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
কিন্তু হায়! চারিদিকে সবই তো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছায়ামূর্তি। বামনমানব। রাক্ষসমুখ। মহীরূহের মতো উঁচু মাপের প্রত্যাশিত তেমন কেউ কোথায় নেই। যিনি বিশাল ছায়ায় সবাইকে আগলে রাখবেন। জাতির ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সকল অংশকেই সব সুযোগ ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন। এমন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আজ সবচেয়ে বেশি। হিংস্রা, মৃত্যু, ষড়যন্ত্রের জালে আঁটকে থেকে লিলিপুটেরাই যেন দখল করে নিচ্ছে গালিভারের ভুবন। আমরা সম্ভবত বাস্তবিক অর্থেই একটি ‘গালিভারস ট্র্যাভেল’-এর মধ্যে আপতিত রয়েছি; নিত্য আবর্তিত হচ্ছি অনাকাক্সিক্ষত রকমের বীভৎস ও কালো, রক্তলোলুপ, হায়েনা-আবর্তে। কিন্তু বেঁচে থাকা সবচেয়ে আনন্দের, সবচেয়ে পবিত্র ও পূণ্যের কাজ বলেই মানুষ সকল কালো ও অন্ধকারকে তুচ্ছ করে এখনো আলোর পিয়াসী। আজ রক্তপিপাস-তাপদগ্ধী নয়, চাই শান্তির সবুজ-অনাবিল- আলো। নতুন বছরের শুরুতে মানুষ এমন আশাবাদী প্রত্যাশা করতেই পারে। আর মানুষের প্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোরও দরকার আছে। কারণ শেষ বিচারে মানুষই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শেষ ক্ষমতাকেন্দ্র; অন্য কেউ নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ