ঢাকা, মঙ্গলবার 10 January 2017, ২৭ পৌষ ১৪২৩, ১১ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নৈরাজ্য কাম্য নয়

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা : চলমান রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক ও নতুন কমিশন গঠন নিয়ে বঙ্গভবন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিএনপিসহ সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলো ঐক্যমতের ভিত্তিতে নতুন মেয়াদে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে কতিপয় প্রস্তাবনাসহ মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিও সে আহবানে সাড়া দিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু করেছেন। যা ঘোর অন্ধকারে একটুখানি আলোর ঝলকানি বলেই মনে হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ শেষে বিএনপি নেতৃবৃন্দ সংলাপের সফলতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে এ বিষয়ে আন্তরিক বলেও দৃশ্যত মনে হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সংলাপের সফলতা খুব একটা দেখা যায় না। তবে অতীতে হয়নি বলে এবারও হবে না এমনটা মনে করার মত কোন হীনমন্যতা পোষণ করা মোটেই ঠিক হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনটা খুবই জরুরি। দেশের মানুষ নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ ও বিতর্কমুক্ত নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সকল দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রত্যাশা করে। এ ব্যাপারে মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ গ্রহণ জনমনে বেশ আশার সঞ্চার করেছে।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংকটের আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়ার কোন রেকর্ড নেই। আলোচনা-সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার কারণেই ১৯৭১ সালে মুক্তি সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। এরশাদ সরকারও আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি। কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান মার্টিন স্টিফেনের প্রেসক্রিপশনও আমাদের রাজনীতিকে সুস্থ্য করতে পারেননি। এমনকি ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আব্দুল জলিল ও বিএনপি মহাসচিব মরহুম আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার মধ্যে দফায় দফায় সংলাপ ও আশাবাদও আমাদের কোন কাজে আসেনি বরং ১/১১ এর মত এক দুঃখজনক পরিণতিকেই মেনে নিতে হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মহলবিশেষ পুলকবোধ ও সুবিধাভোগ করলে তা শুধুই সাময়িক। মূলত এ ঘটনা কারো জন্যই কল্যাণকর হয়নি। বরং এর নেতিবাচক-কুপ্রভাবটা দীর্ঘমেয়াদী হবে বলেই মনে হচ্ছে।
যাহোক একটি গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনগ্রাহ্য নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ কামনা এবং সে প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু ইতিবাচক হিসেবেই দেখতে হবে। আমরা যেমন রাষ্ট্রতির মহতি উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি, ঠিক তেমনিভাবে তাকে সফল করার জন্য আমাদেরকে স্ব স্ব অবস্থান থেকেও প্রচেষ্টা চালানো উচিত। কারণ, আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে এমন কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি যে, তিনি নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করে চলমান এ সংকটের একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করবেন। এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের একটি মন্তব্য বেশ প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিস্তর মত পার্থক্য থাকার পরও তারা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করার  বিষয়ে একমত’। মূলত রাষ্ট্রপতি পদকে যদি এভাবে ক্ষমতাহীন না করা হতো তাহলে জাতির যেকোন ক্রান্তিকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতি কাণ্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারতেন। যেহেতু তিনি সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাহীন তাই তার সাফল্যের বিষয়টি নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছার ওপর। পুরোটাই দয়া-দাক্ষিণ্যও বলা চলে।
সংবিধান অনুয়ারি রাষ্ট্রপতির কোন নির্বাহী ক্ষমতা চর্চার সুযোগ না থাকলেও তাকে রাষ্ট্রের সবার ওপরে স্থান দেয়া হয়েছে।  সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘The President shall, as Head of State, take precedence over all other persons in the State, and shall exercise the power and perform the duties conferred and imposed on him by this Constitution and by any other law.’ অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির উর্দ্ধে স্থান লাভ করবেন এবং এই সংবিধান ও অন্য কোন আইনের দ্বারা তাঁকে প্রদত্ত  ও তাঁর ওপর অর্পিত সকল ক্ষমতা প্রয়োগ ও কর্তব্য পালন করবেন।
মূলত রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক। তিনি কোন দলের বা গোষ্ঠীর নন। তাই চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধারের জন্য রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন যদি আমরা  তাকে যথাযথভাবে সহযোগিতা করি।  আমাদের যেমন উচিত তাকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নেয়া, ঠিক তেমনিভাবে দেশের মানুষও রাষ্ট্রপতির কাছে অভিভাবকতুল্য আচরণ আশা করে। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের অতীতটা মোটেই সমৃদ্ধ নয়। আমরা যেমন রাষ্ট্রপতিদেরকে যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারিনি, ঠিক তেমনিভাবে রাষ্ট্রপতিরাও জাতির অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
তারাও দলীয় সংকীর্ণতার বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি। আমরা তো সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম ইয়াজউদ্দীন আহমদকে ‘ইয়াজিদ্যা’ আখ্যা দিয়ে গালমন্দ করতে কুণ্ঠাবোধ করিনি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিতকে এভাবে গালমন্দ করায় আমাদের সম্মান মোটেই বৃদ্ধি পায়নি বরং জাতি হিসেবে আমরা হীনমন্যতারই পরিচয় দিয়েছি। যাহোক আমরা এ ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি চাই না। যদিও আমাদেরকে বরাবরই আশাহত হতে হয়েছে।
মূলত সাম্য, অবাধ গণতন্ত্রায়ন, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু বিজয়ের চার দশক পরও স্বাধীনতার সুফলগুলো আমাদের কাছে অনেকটাই অধরায় রয়ে গেছে। দেশে গণতন্ত্র এখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো নেয়-ইনি বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই এখন প্রায় নির্বাসনের পথে। স্বাধীনতা লাভের পর দেশের গণতন্ত্র যেভাবে বিকশিত হওয়ার কথা তা হয়নি বরং উচ্চাভিলাসী ও আত্মকেন্ত্রিক রাজনীতির কারণে তা বারবার হোঁচট খেয়েছে।
আমাদের রাজনীতি এখনো গণমুখী হয়ে ওঠতে পারেনি। ফলে দেশের রাজনীতি এখন শ্রেণি বিশেষের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা মরণপণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলাম, সে গণতন্ত্রের সংকট এখনও কেটে যায়নি বরং দেশে যত রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার প্রায় সবগুলোই গণতন্ত্র ও জনগণের অবাধ ভোটাধিকারকে কেন্দ্র করেই। তাই গণতন্ত্রকে অবাধ ও অবারিত করার জন্যই রাজপথ বারবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে। জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিটাও একেবারে কম হয়নি। ফলে মাঝে মধ্যে পূর্ব দিগন্তে আলোর স্ফুরণ দেখা গেলেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি বরং তা আবারও কালো মেঘে ঢেকে গেছে। আর এ ধারা এখনও অব্যাহতই আছে। কিন্তু এর শেষ কোথায় যা বলা বেশ কষ্টসাধ্যই বলতে হবে।
একটি সদ্য স্বাধীন দেশকে যেভাবে পুনর্গঠন ও পরিশীলিত করা দরকার ছিল তা কিন্তু আমরা  পারিনি। আমাদের মূল ব্যর্থতাটা মনে হয় এখানেই। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করতে যেখানে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি পড়েছে। একশ্রেণির অতিউচ্চাভিলাষী রাজনীতিক পরিকল্পিতভাবে জাতিকে বহুধাবিভক্ত করে আমাদের জাতিস্বত্তার মর্মমূলে প্রকারান্তরে আঘাতই করেছেন। ফলে জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে বরাবরই আমরা আত্মকলহে লিপ্ত থেকেছি। ফলে বহির্বিশ্বে আমরা কিছুটা হলেও কলহপ্রিয় জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছি। সঙ্গত কারণেই  জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিই শুধু থেমে যায়নি বরং অতীতে যা ছিল তাও হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে যা হবার তাই হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
আগেই বলেছি যে, স্বাধীনতার চার দশকে আমরা যত রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি তার প্রায় সবগুলোই গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার কেন্দ্রীক। যদিও মুক্তি সংগ্রাম ও মহান বিজয় অর্জিত হয়েছিল মূলত এই ইস্যুতেই। মূলত আমাদের দেশের গণতন্ত্র সংকটাপন্ন হয়ে পরে ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। একটি নির্বাচিত  সরকারকে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ফলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসে স্বৈরাচারি শাসন। যা চলে একটানা ৯ বছর। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসনের অবসান হয় এবং প্রথমবারের মত একটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।
মনে করা হয়েছিল যে, অন্তত গণতন্ত্রের সংকটটা আমাদের কেটে গেছে। কিন্তু হতাশ হয়ে আমাদের খুব একটা সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর গণতন্ত্র যখন মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল, তাও ব্যর্থ হয়েছে আমাদের স্বার্থান্ধ রাজনীতির কারণেই। ফলে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বাধার অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আর এর শেষ শ্রাদ্ধটুকু অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে। ফলে দেশে উদার গণতন্ত্রের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত, শ্রেণিতোষণ ও সুবিধাবাদী গণতন্ত্র চালু হয়েছে। যা আমাদেরকে রীতিমত খাদের কিনারে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এ অবস্থা উত্তরণের কোন সহজ পথ আপাত দেখা যাচ্ছে না।
দেশ এক মহাকান্তিকাল অতিক্রম করছে। ৫ জানুয়ারির একতরফা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর দেশে যে গণতন্ত্রের সংকট চলছে তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছে সংসদের বাইরের বিরোধী দলগুলো। সরকার তো দেশে কোন সংকট আছে বলে মনে করে না। ফলে দেশে গণতন্ত্রেরও সজ্ঞায়নও বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। সাংবিধানিক ব্যাখ্যায়ও স্বেচ্ছাচারিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমারা নিজেদের সুবিধামত সাংবিধানের অপব্যাখ্যা করতে শুরু করেছি। ফলে সাংবিধান  জাতির ক্রান্তিকালে খুব একটা সহায়ক হচ্ছে না। ফলে অসাংবিধানিক পন্থাকেই সঙ্কট সমাধানের মাধ্যম হিসেবে মনে করা হচ্ছে। যা দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে।
দেশে রাজনৈতিক সংকট চলছে। আর এ সংকটে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে। স্বাধীনতার পর সকল নির্বাচন কমিশন নিয়ে কমবেশি বিতর্ক থাকলেও বিদায়ী নির্বাচন কমিশনের মত এত বিতর্কিত কোন নির্বাচন কমিশনই ছিল না। ফলে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনীতির মাঠ আবারও গরম হয়ে উঠেছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদান্তে একটি সর্বজনগ্রাহ্য নতুন কমিশন গঠনের জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সার্চ কমিটি গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে রাষ্ট্রপতির কাছে। যদিও সার্চ কমিটি গঠনের ব্যাপারে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবুও বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করার আগে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। কিন্তু সার্চ কমিটি গঠনের যে উদ্দেশ্য ছিল তা অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে হয়। কারণ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি বরং এ কমিশনের অধীনে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার সবগুলোই ছিল চরম বিতর্কিত।
উল্লেখ্য,  সংবিধান অনুসারে নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করার কথা থাকলেও গত ৪৪ বছরেও তা করা হয়নি। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচেছদে বলা হয়েছে, ‘There shall be an Election Commission for Bangladesh consisting [the Chief Election Commissioner and not more than four Election Commissioner] and the appointment of Chief Election Commissioner and other Election Commissioners (if any) shall, subject to the provisions of any law made in that behalf, be made by the President.’
অর্থাৎ [প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনার লইয়া] বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত কোন আইনের বিধানাবলী-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।
এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রণীত বিধানাবলি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কমিশনারকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে; যদিও বর্তমান সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি কিছুই করেন না বলে মনে করা হয়। আর এই অতীত সংস্কৃতির চর্চাটা অব্যাহত থাকে তাহলে রাষ্ট্রপতি যতই আন্তরিক হোন না কেন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করা রাষ্ট্রপতির কোনভাবেই সম্ভব হবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি যদি তার কথায় আন্তরিক হন তাহলে চলমান সংকটের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেড়িয়ে আসা অসম্ভব কিছু নয়। মূলত রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সাফল্য নির্ভর করছে সরকারের আন্তরিকতার ওপর।
এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ সরকারের স্রেফ নাটক বা আইওয়াশ কি-না এ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। সচেতন মহল  নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে সার্চ কমিটির কাঠামো দেখে বর্তমানে সরকারের মনোভাব বোঝা যাবে বলে মনে করছেন। তারা মনে করছে, সার্চ কমিটিতে রাষ্ট্রপতি কাদের নিয়োগ দেন তা দেখেই সরকারের অবস্থান বা আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা বোঝা যাবে। ফলে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ নিয়ে এখনও অতি উৎসাহী হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।
অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সরকারের আকাঙ্খা হলে রাষ্ট্রপতি তুলনামূলক বিতর্কের বাইরে থাকা নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সার্চ কমিটিতে নিয়োগ দেবেন এমন প্রত্যাশা সচেতন মহল। আর এমন পরিস্থিতিতে সার্চ কমিটি তথা নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠনে বিরোধী দলগুলোর প্রস্তাবের অনেকাংশ বিবেচনায় নেয়াও কঠিন নয় বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু কঠোর অবস্থানে গিয়ে নিজেদের মতো করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাইলে সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ স্রেফ নাটক বা আইওয়াশ ছাড়া কিছুই হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
মূলত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপ তথা সার্চ কমিটির কাঠামোর ওপর আগামী  দিনের রাজনীতির অনেক কিছু নির্ভর করছে। সরকার আন্তরিক হলে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করবে। আর ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন চাইলে সে ক্ষেত্রে সার্চ কমিটি বেছে বেছে তাদের অনুগত লোকদের বের করবে। তবে যা-ই হোক, সরকারের আন্তরিকতার প্রথম পরীক্ষা এটি। দেশে ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই এ পরীক্ষায় সরকারকে উত্তীর্ণ হওয়া জরুরি।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিল্লুর রহমান স্ব-উদ্যোগে সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন। ওই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। এর আগে সার্চ কমিটি গঠনকে সামনে রেখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডাকেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় বিএনপি তখন সার্চ কমিটির জন্য কোনো সুপারিশ বা প্রস্তাব দেয়নি।
গত ১৮ নবেম্বর রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে ১৩ দফা প্রস্তাব দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পরে গত ৩ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে প্রস্তাবের অনুলিপি পৌঁছে দেন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী। এর নয়দিন পর  বিএনপিকে আলোচনায় ডাকেন রাষ্ট্রপতি।
২০১২ সালে নির্বাচন কমিশন গঠনের আগেও সে সময়ের রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তখন বিএনপিও সেই আলোচনায় অংশ নিয়েছিল। তবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে কোনো নাম তারা প্রস্তাব করেননি। আর কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনকে শুরু থেকেই আক্রমণ করে এসেছেন বিএনপির নেতারা। কিন্তু জাতি আর এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না। কিন্তু এ জন্য জরুরি রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। রাজনৈতিক ঐক্যমত ছাড়া দেশ ও জাতিকে কোনভাবেই সংকটমুক্ত করা সম্ভব হবে না এবং রাষ্ট্রপতিরও সফল হওয়ার কোনই সম্ভবনা নেই।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। আত্মস্বার্থ বা গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করা রাজনৈতিক দলের কাজ নয়। কিন্তু দেশে যে অবস্থা চলছে তাতে বোধ হয় নৈরাজ্যবাদকেই উস্কে দেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এডমান্ড বার্ক (ইঁৎশব) বলেন, ‘A body of men united together for promoting by their joint endeavors the national interest upon some particular principles on which they are all agreed.’
অর্থাৎ কতকগুলো লোক যখন তাদের সমবেত চেষ্টা দ্বারা জাতীয় স্বার্থে কতকগুলো নীতি সম্মন্ধে একমত হয়ে সংঘবদ্ধ হয়, তখন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়।
মূলত নৈরাজ্যবাদ (Anarchism) বলতে  রাষ্ট্রের কার্যকর অনুপস্থিতিকেই বোঝায়। এর মূল কথা হলো, মানুষ স্বভাবত সৎ, সরল ও বন্ধুভাবাপন্ন। কিন্তু রাষ্ট্র শ্রেণি স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে তার ওপর পাশবিক বলে বলীয়ান হয়ে আইন-কানুন চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে শক্তির এই বিষক্রিয়ার প্রভাবে মানুষ মনুষত্ব হারিয়েছে, নৈতিকতাবোধ হারাতে বসেছে এবং একে অপরকে  শত্রু জ্ঞান করে সহযোগিতার স্বর্ণসূত্র ছিন্ন করেছে। রাষ্ট্র মানুষকে প্রতারিত করে দুর্নীতিপরায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। সুতরাং মানুষকে আবার স্বীয় গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করতে হবে। তখন মানুষ আবার পরষ্পরের মধ্যে সহযোগিতা করে বাসের অযোগ্য এ পৃথিবীকে সুন্দর করে আনন্দে বসবাস করবে।
আমাদের কোন অবস্থাতেই নৈরাজ্যবাদী হওয়ার সুযোগ নেই বা তা কোন পক্ষের জন্যই কল্যাণকর নয়। তাই মহামান্য রাষ্ট্রপতির মহতি উদ্যোগকে সফল ও সার্থক করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। কোন বিশেষ গোষ্ঠী ও দলের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের দায় শেষ করার সুযোগ নেই। তবে সরকারের দায়িত্বটা অন্যদের চেয়ে অনেকটাই বেশি। দেশের মানুষ সরকার সহ সকল পক্ষের কাছেই দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।
[email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ