ঢাকা, বুধবার 11 January 2017, ২৮ পৌষ ১৪২৩, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ট্রেন দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে

ট্রেনে ভ্রমণ এখন আতংকের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শত প্রয়োজনেও মানুষ আজকাল সহজে ট্রেনে উঠতে চায় না। এর কারণ, কখন কোথায় দুর্ঘটনা ঘটবে এবং মানুষকে প্রাণ হারাতে কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করতে হবে সে ব্যাপারে কারো পক্ষেই আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে না। যে কোনো মুহূর্তে চলন্ত ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হচ্ছে, ইঞ্জিনে আগুন ধরে যাচ্ছে, রেলক্রসিংগুলোতে সিগন্যালের যথাযথ ব্যবস্থা এবং দায়িত্বে নিয়োজিত লোকজন না থাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মারাও যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। যেমন গত রোববার গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কোলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেসের ধাক্কায় মারা গেছেন একই পরিবারের চারজনসহ পাঁচজন। এর আগেরদিন ঠাকুরগাঁওয়ের কুজি শহর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে একজনের মৃত্যু ঘটেছে। তারও একদিন আগে টঙ্গীর বেলতলী এলাকায় মারা গেছে একজন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং টাঙ্গাইল নিয়ে গঠিত রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা অঞ্চলেই প্রতি মাসে গড়ে ১২ জন মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অঞ্চলে মৃত্যু ঘটেছে ৯৫০ জনের।
দেশের অন্য সব অঞ্চলেও প্রতিদিন মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। মানুষের বেশি মৃত্যু ঘটছে রেললাইনে এবং রেলক্রসিংগুলোতে। কারণ, প্রায় সম্পূর্ণ রেললাইনই স্থাপিত হয়েছে গ্রামের মধ্য দিয়ে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করার কোনো উদ্যোগ না থাকায় মানুষ অনেক সময় এমনকি রেললাইনের ওপর দিয়েও চলাচল করে। ফলে হঠাৎ কোনোদিক থেকে ট্রেন এসে গেলে তাদের কাটা পড়তে হয়। ওদিকে বেশির ভাগ রেলক্রসিংয়েই গেট এবং সিগন্যাল লাইট নেই। থাকে না লাইনম্যানরাও। একই কারণে দেশের কোথাও না কোথাও প্রাণহানিও ঘটে প্রতিদিন। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটলেই কারণ খতিয়ে দেখার এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কয়েকটি পর্যন্ত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেসব কমিটি যথাসময়ে রিপোর্ট পেশ করে। রেল কর্তৃপক্ষসহ সরকারের পক্ষ থেকে জনা কয়েক কর্মচারীকে বরখাস্ত করাসহ তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়। দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ঘোষণাও দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও যথারীতি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটতেই থাকে। যেমনটি গত রোববার ঘটেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে।
আমরা মনে করি, ট্রেনের ব্যাপারে রেল কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের নীতি-মনোভাব ও কার্যক্রমে জরুরিভিত্তিতে পরিবর্তন ঘটানো দরকার। কারণ, কর্মচারী বরখাস্তের পাশাপাশি তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার মতো ঘোষণা অতীতেও বহুবার দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে দুর্ঘটনা বন্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণই এখনো দেখা যাচ্ছে না। প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট ও পরিসংখ্যানে বরং ছোট-বড় দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার কথাই জানা যাচ্ছে। আহতদের অনেকে এমনকি জীবনের নামে পঙ্গুত্বও বরণ করছে। কিন্তু এত বেশি দুর্ঘটনার পরও সাময়িক বরখাস্তের মতো লোক দেখানো কিছু ব্যবস্থা নেয়ার বাইরে এমন কিছুই করা হয়নি যার ফলে দুর্ঘটনা বন্ধ হবে, বন্ধ হবে মানুষের জীবন কেড়ে নেয়ার ভয়ংকর কর্মকাণ্ডও। সময়ে সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর সুপারিশ সম্পর্কেও জনগণকে কখনো জানতে দেয়া হয়নি। এই মর্মে বরং অভিযোগ রয়েছে যে, কারো কারো বিরুদ্ধে ঘোষণা দিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলেও কয়েকদিনের মধ্যেই ঘুষ এবং গোপন দেন-দরবারের মাধ্যমে তারা পার পেয়ে গেছে। একই কারণে দায়িত্বে অবহেলা দেখানোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ করতেও পিছপা হচ্ছে না কেউ।
বিভিন্ন সময়ের দুর্ঘটনার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসবের পেছনে রয়েছে দায়িত্বে অবহেলার একই কারণ। যথাসময়ে সঠিক সিগন্যাল দেয়া হলে কোনো ট্রেনই নির্ধারিত লাইনের পরিবর্তে অন্য কোনো লাইনে চলাচল করতে বা অন্য লাইন দিয়ে স্টেশনে ঢুকে পড়তে পারতো না। ঘটতো না দুর্ঘটনাও। কিন্তু সিগন্যালের দায়িত্বে থাকা লোকজন দায়িত্ব পালন করে না এবং তাদের গাফিলতির কারণেই বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। মানুষের জীবন তো যাচ্ছেই, রেলওয়েরও হচ্ছে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি। আমরা মনে করি, এই গাফিলতি অমার্জনীয় অপরাধ। সুতরাং সাময়িক বরখাস্ত করার মতো লোক দেখানো ব্যবস্থা নেয়া এবং দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট হতে পারে না। গাফিলতি যারা করে ও করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার, যাতে রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীই ভবিষ্যতে দায়িত্বে অবহেলা করার চিন্তা পর্যন্ত করার সাহস না পায়। চাকরি দেয়ার সময় এবং প্রশিক্ষণকালে প্রত্যেককে এ কথাও বোঝানো দরকার, তাদের সামান্য অবহেলা বা গাফিলতের কারণে কত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, প্রাণ হারাতে পারে কত মানুষ। পঙ্গুত্ব এবং রেলওয়ের তথা জাতীয় অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কেও তাদের বোঝানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সিগন্যাল ব্যবস্থাকেও যুগোপযোগী বা স্বয়ংক্রিয় করা দরকার, যাতে ফাঁকিবাজ কর্মচারীদের ওপরই কেবল নির্ভর না করতে হয়। পাশাপাশি প্রতিটি ছোট-বড় সিগন্যালে গেট লাগানো এবং যথাসময়ে সিগন্যাল দেয়ার ও গেট বন্ধ করার মতো গেটম্যানসহ লোকজন নিযুক্তি দেয়ারও পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ, প্রায় সম্পূর্ণ রেললাইনই গেছে গ্রামের মধ্য দিয়ে। এসবের বেশির ভাগ স্থানেই গেট যেমন নেই, তেমনি নেই সিগন্যাল দেয়ার ব্যবস্থাও। অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় লোকজনও নেই। কোথাও কোথাও লোকজন থাকলেও তাদের ওপর নজরদারি করার কেউ নেই। ব্যবস্থা নেই জবাবদিহিতারও। এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে পারে না।
আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়সহ সরকার রেলওয়ের বিষয়ে অনতিবিলম্বে মনোযোগী ও উদ্যোগী হবে। কারণ, ট্রেন এদেশের একটি প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। এর সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের তো বটেই, সব মিলিয়ে জাতীয় অর্থনীতিরও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং এমন একটি বিষয়ে অবহেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব মিলিয়ে আমরা এমন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দাবি জানাই দেশে যাতে আর একটি ট্রেন দুর্ঘটনাও ঘটতে না পারে। আর কোনো মানুষকেই যাতে জীবন হারাতে ও পঙ্গুত্ব বরণ করতে না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ