ঢাকা, বুধবার 11 January 2017, ২৮ পৌষ ১৪২৩, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সব কিছু হিম হয়ে আসে

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : এখন শীতকাল। সকাল বিংবা সন্ধ্যায় কুয়াশা নামে এই জনপদে, ভারী হয়ে। দুপুরের দিকে রোদ থাকলে শীত কিছুটা কমে। আবার সন্ধ্যার দিকে শীত নামে জাঁকিয়ে। অধিকাংশ মানুষ এই শীতে থরথরিয়ে কাঁপে। পথের পাশে আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণ থাকার চেষ্টা করে। কেউ নিজেকে সেঁদিয়ে দেয় চটের বস্তার ভেতরে। কেউ কেউ শরীরে দামি গরম কাপড় চাপিয়ে গাড়িতে হিটার চালিয়ে দিয়ে দিব্যি আরামে গন্তব্য থেকে গন্তব্যে ঘুরে বেড়ান। শীত বা কুয়াশা তাদের স্পর্শও করতে পারে না। কিন্তু এখন বাংলাদেশে কুয়াশা হিম হয়ে নেমে আসছে। যেন একটি সমাজ কুয়াশায় বরফে জমে অচঞ্চল স্থির হয়ে যাচ্ছে।
উজবেকিস্তানের দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসক ইসলাম আবদুগানিয়েভিচ করিমভ সম্প্রতি মারা গেছেন। তিনি এত বড় স্বৈরশাসক ছিলেন যে, তার সময়ে সে দেশে তার বিরুদ্ধে ট’ শব্দটি করার মতো কোনো লোক ছিল না। সব মানুষ যেন রোবোটে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিল। উজবেকিস্তানের জনগণের ওপর করিমভের অত্যাচারের কাহিনী কিংবদন্তীর জন্ম দিয়েছে। সেখানেও একদলীয় শাসন ছিল। সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলেন করিমভ ও তার দুর্নীতিবাজ দলের ষ-ারা। ১৯৯১ সালের ১ সেপ্টেম্বর স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর মৃত্যু পর্যন্ত করিমভ উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার আগে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকার সময় বছর খানেক তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন উজবেকিস্তানের।
১৯৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বরে করিমভ উজবেকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিয়েছিলেন। কিন্তু সে নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতি ভোট ডাকাতির ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। তার প্রতিপক্ষকে সামনেই আসতে দেননি। সে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুবি হয়েছিল। বিরোধী দল ও আন্তর্জাতিক দুনিয়া এই অনিয়মের অভিযোগ এনেছিল। পাত্তা দেননি করিমভ। আস্তে ক্ষমতা সংহত করেন। বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য তিনি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঐ দলের পক্ষে ৬০,০০০ লোকের স্বাক্ষরসহ কমিশনে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। ব্যর্থ হলে ঐ দল আর নির্বাচন করতে পারবে না। বিরাধী দল তা জমাও দিয়েছিল। কিন্তু করিমভ তার মধ্যে ২৫,০০০ স্বাক্ষর বাতিল করে দেন। তাদের নিবন্ধন হয় না। এভাবে উজবেকিস্তানকে তিনি বিরোধীদল শূন্য করে তোলেন।
করিমভের আমলে উজবেকিস্তানে কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেখানে তৃতীয় পার্লামেন্ট বা অলিয় মজলিস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর। কিন্তু তার গোটা আয়োজনই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। পৃথিবীর প্রায় সকল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। তারা ঐ নির্বাচনের ফলাফলকে স্বীকৃতি দেননি। এসব পর্যবেক্ষকের মতে ঐ নির্বাচনে ন্যূনতম মানও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ক্ষমতা সংহত করেই করিমভ উজবেকিস্তানে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন শুরু করেন। আর সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করে নেন। আর ২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তাসখন্দে নিযুক্ত বৃটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রেইগ মুরে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন যে, সেখানে পুলিশ ব্যাপকভাবে নির্যাতন, অপহরণ, খুন ও ধর্ষণ করেছে। অর্থনৈতিক দুর্নীতি ছিল সীমাহীন। তারা ধর্ম সম্প্রদায়ের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে তারা। করিমভ প্রশাসন সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। তাছাড়া মি. মুরে করিমভের নিরাপত্তা বাহিনীর নিষ্ঠুর নির্যাতনের বর্ণনা দেন। আর মানবাধিকারের ব্যাপারে বৃটিশ ও মার্কিন দ্বিমুখী নীতির প্রতিবাদে তিনি কূটনৈতিক দায়িত্ব ছেড়ে দেন। সে সময় সন্ত্রাস দমনের নামে বৃটিশ ও মার্কিন সরকার করিমভের স্বৈরশাসনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। মুরে পরে স্মৃতিকথামূলক যে বই লিখেছিলেন, তার শিরোনাম ছিল ‘মার্ডার ইন সমরখন্দ’ বা সমরখন্দে হত্যাযজ্ঞ।
করিমভের অত্যাচার নির্যাতন সম্পর্কে জাতিসংঘও তদন্ত করেছিল। তাতে তারা দেখতে পান যে, উজবেকিস্তানের বিচার ব্যবস্থায় নির্যাতন প্রাতিষ্ঠিকীকরণ, ধারাবাহিক ও ব্যাপক করে তোলা হয়েছে। নির্যাতনের কৌশল, মিডিয়া সেন্সরশীপ আর ভুয়া নির্বাচনের কারণে ‘প্যারেড ম্যাগাজিন’ বেশ কয়েক বছর ধরে করিমভকে পৃথিবীর সব চেয়ে নিকৃষ্ট স্বৈরশাসকদের একজন হিসেবে অভিহিত করেছিল। আবার উজবেকিস্তানের প্রায় সকল সংবাদপত্র তার অনুগামীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রায়নের চরম অবমাননার দুর্নাম ঘোঁচাতে করিমভ তার দেশে রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার বাজে মানবাধিকার রিপোর্টের কারণে না মেলে বিদেশি সাহায্য আর না আসে বিদেশি বিনিয়োগ।
উজবেক সংবিধানে ‘সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ’ নিষিদ্ধ করা আছে। তাতে স্পষ্ট করে বলা আছে, সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশীপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু করিমভ প্রশাসনের অধীনে সকল সংবাদপত্রকে প্রকাশিত সকল সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়। আর এই দায়বদ্ধতাকেই করিমভ তার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। উজবেক সংবিধানের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, সংবাদপত্র স্বাধীন, তবে তারা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা আর সংবিধানের সমালোচনামূলক কোনো কিছু প্রকাশ করতে পারবে না। আর জবাবদিহিতা কী, তা নির্ভর করে করিমভ প্রশাসন কাকে জবাবদিহিতা বলে মনে করেন, তার ওপর। উজবেকিস্তানে সংবাদপত্রের সংখ্যা কম নয়। তবে তার সবই সরকার নিয়ন্ত্রিত। এর সম্পাদকীয় নীতিও সরকার নিয়ন্ত্রিত। তাই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে যা কিছু স্পর্শকাতর, তার কোনো কিছুই প্রকাশের অনুমতি নেই উজবেকিস্তানে। আর ‘অননুমোদিত’ বিষয় বা মতামত প্রকাশ করায় তাসখন্দ ও সমরখন্দে অনেক সাংবাদিককে কারাগারে ঢোকানো হয়েছে। তবে সরকার নিম্ন ও মধ্য শ্রেণীর কর্মকর্তাদের অপরাধের খবর প্রকাশের অনুমতি দেয়, উচ্চ পদস্থদের নয়। আর উজবেকিস্তানে যা ছাপা নিষিদ্ধ, তা হলো প্রশাসনের দুর্নীতি আর বিরোধী দলের খবর। এর মধ্যে রেডিও লিবার্টির প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উজবেকিস্তানে একটাই ইন্টারনেট সার্ভিস আছে, তবে তাতে ওয়েব সাইটে ঢোকার ব্যবস্থা নেই।
২০০৫ সালে আন্দিজানের গণহত্যা
বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, করিমভ সরকার ২০০৫ সালের ১৩ মে সরকারবিরোধী ৪০০-৫০০ বিক্ষোভকারীকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে বদ্ধ চুলপভ এভিনিউয়ের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে পালাবার সব পথ বন্ধ করে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। তারপর পুলিশ ও তার সহযোগীরা ঐ লোকদের গুলি করে হত্যা করে। পরে পুলিশ বলেছিল, তাদের হত্যা করার জন্য করিমভ স্বয়ং সরাসরি আদেশ দিয়েছিলেন।
উজবেকিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে নানা সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে, আইএইচএফ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, প্রভৃতি। তারা বলেছেন, উজবেকিস্তান একটি একনায়কতান্ত্রিক দেশ। সেখানে মানবাধিকার খুবই সীমিত। নির্যাতন ও যথেচ্ছ গ্রেফতার স্বাভাবিক ঘটনা। ধর্মীয় স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা সভা-সমিতি করার স্বাধীনতা সেখানে নেই। সরকার সভা- সমাবেশের ওপর সাধারণত এই বলে হামলা চালায় যে, তারা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। সরকার পল্লী এলাকার উজবেক মহিলাদের বাধ্যতামূলকভাবে জন্মনিরোধের ব্যবস্থা করে দেয়। সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নির্যাতন উজবেকিস্তানে স্বাভাবিক ঘটনা। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা সব সময় হয়রানির শিকার হন।
উজবেবিস্তানের ৩ কোটি ১৫ লাখ মানুষের ৯৩ শতাংশই মুসলমান। কিন্তু উজবেক সরকার সব সময়ই মুসলমানদের ওপর খড়গহস্ত। তাদের সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক অধিকার খুবই সীমিত। যেসব মুসলমান সংগঠন সরকারকে সমর্থন করে, কেবল তারাই কিছুটা অধিকার ভোগ করে। যারা বিরোধিতা করে, সন্ত্রাসী বলে সরকার তাদের দমন করার যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তবে করিমভ নিজেকে সাচ্চা মুসলমান হিসেবে প্রমাণের জন্য ১৯৯২ সালে হজব্রত পালন করেন।  তাছাড়া ভিন্নমতের উত্থান রহিত করার জন্য করিমভ উপজাতীয়, আঞ্চলিক, ও ধর্মীয় রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। উজবেকিস্তানে একটি মসজিদ তৈরি করতেও সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ১৯৯৯ সালে করিমভকে হত্যার একটি ব্যর্থ চেষ্টার পর ইসলামী গ্রুপগুলোর ওপর তার নির্যাতনের মাত্রা শতগুণে বেড়ে যায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার পর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধে শরিক হন করিমভ। এমন কি ৮০০ মার্কিন  সৈন্যকে উজবেকিস্তানে থাকবার ব্যবস্থা করেন। তিনি আফগানিস্তানে মার্কিন হামলারও সমর্থন করেন। উজবেকিস্তানের বড় রাজনৈতিক দল ‘ইসলামিক মুভমেন্ট অব উজবেকিস্তান’কে করিমভ সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে এর নেতাদের আটক করেন। তিনি ইমামদের দমনেও কঠোর ব্যবস্থা নেন। তাছাড়া খোলা জায়গায় নামাজ বা অন্য কোনো ধর্মীয় আয়োজনও তিনি বল প্রয়োগের মাধ্যমে ভেঙে দেন। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের তিনি আটক করে বিনা বিচারে জেলে রাখেন। তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয় এবং কখনও কখনও তারা গুম হয়ে যান।
উজবেকিস্তানের প্রায় ৪ শতাংশ লোক আধুনিক কালের দাস হিসেবে কাজ করে।  সেখানে বেশির ভাগ চাকরি তাদের তুলা শিল্পে। অভিযোগ আছে যে, তুলা তোলার মওসুমে কয়েক মাস সরকারি কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে তুলা তোলার কাজে নিয়োজিত করা হয়। সেখানে এনজিও’র কাজও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এনজিওগুলোকে বলা হয়, ‘সরকার- আয়োজিত বেসরকারি সংস্থা বা জিওএনজিও’। সরকারের অনুমোদন বা ইচ্ছার বাইরে তারা স্বাধীনভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার ব্যবস্থা এমন করা হয়েছে, যাতে সেখানে কর্মী তৈরি হয়, কোনো বুদ্ধিজীবী তৈরি হতে না পারে। কিংবা এমন কেউ তৈরি হতে না পারে, যে জনগণের ইস্যুতে সরকারের সমালোচনা করতে পারে। করিমভের মৃত্যুর পর এখন উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন শাভকাত মিরজিইওয়েভ। তাতে করিমভের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি করিমভের উজবেকিস্তানের চেয়ে উন্নত কিছু নয়। এখানে গণতন্ত্র পদদলিত। মানবাধিকার লাঞ্ছিত। মৌলিক অধিকার উধাও। ভিন্ন মত কঠোরভাবে প্রতিহত। এখানেও সরকারের সমালোচক বা বিরোধিতাকারীরা ‘সন্ত্রাসবাদের দোসর’ বলে নির্যাতিত। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা তিরোহিত। বিরোধী মতের রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাংবাদিক বা মানবাধিকার কর্মীরা জেল-জুলুম থেকে শুরু করে নানাভাবে নাজেহাল ও পর্যুদস্ত। এখন সবারই একটা প্রশ্ন, এই যে হিম শৈত্যপ্রবাহ, এর শেষ কোথায়!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ