ঢাকা, বুধবার 11 January 2017, ২৮ পৌষ ১৪২৩, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জিয়ানগরের নাম বদলের সিদ্ধান্ত সরকারের প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি আহম্মদ গতকাল মঙ্গলবাল দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: পিরোজপুরের ‘জিয়ানগর’ উপজেলার নাম বদলের সিদ্ধান্তকে সরকারের আগ্রাসী প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। জিয়ানগরকে ‘ইন্দুরকানী’ করার সরকারের সিদ্ধান্তের পরদিন গতকাল মঙ্গলবার নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী একথা বলেন। তিনি বলেন, জিয়ানগর উপজেলার নাম পরিবর্তন করার যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শুধু রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম থাকার কারণেই এটি সরকারি আক্রমণের শিকার হল। প্রতিহিংসা কত ভয়াবহ রূপ নিলে এই ধরনের সভ্যতা বিবর্জিত আক্রোশমূলক সিদ্ধান্ত নিতে পারে সরকার। তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যে সমস্ত স্থাপনা বঙ্গবন্ধুর নামে করা হয়েছে সেগুলোর আগের নামে করা হলে তখন কি করবেন। তবে আমি আওয়ামী নেতাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, ’৭২-৭৫ সালেও আপনারা জনগণকে বেকুব মনে করেছিলেন, এখনও তাই ভাবছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সচেতন জনগণ বেকুব নয়, এটি যথাসময়ে আপনাদেরকে বুঝিয়ে দেবে জনগণ। 

উল্লেখ্য, চার দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে জিয়াউর রহমানের নাম অনুসারে ইন্দুরকানির নাম বদলে জিয়ানগর করা হয়েছিল। আগের নাম ফেরানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই এলাকার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, এম এ মালেক, আবদুস সালাম আজাদ, আসাদুল করিম শাহিন, মুনির হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিজভী বলেন, প্রথিবীর বিভিন্ন বিভিন্ন দেশে যেসমস্ত বীর সন্তানরা মাতৃভুমির জন্য লড়াই করেছেন, তাদের নামে সড়ক-মহাসড়ক-স্থান-ভবন ইত্যাদির নামকরণ করা হয়। কলকাতায় অনেক রাস্তাঘাটের নাম ইংরেজ সিভিলিয়ানদের নামে ছিল, স্বাধীনতার পর সেটি পরিবর্তন করে সেখানে কীর্তিমান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম দেওয়া হয়েছে। শুধু বর্তমান বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একটি ব্যতিক্রমী দেশ, যেখানে সরকারের দিন-রাত্রি কাটে প্রতিহিংসা-বিদ্বেষ-আক্রোশ আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমনে।

সরকারের উদ্দেশে এই বিএনপি নেতা বলেন, আগামীতে জনগণের শাসন যদি কায়েম হয়, তখন যদি বর্তমান বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববদ্যালয় যার আগের নাম ছিলো পিজি হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম যার আগের নাম ছিল ঢাকা স্টেডিয়াম, বঙ্গবন্ধু সেতু যেটির আগের নাম ছিলো যমুনা সেতু, বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার যার আগের নাম ছিলো মওলানা ভাসানী নভো থিয়েটার, এসবের নাম পরিবর্তন করে পূর্বের যে নাম ছিল তা যদি বহাল করা হয়, তখন আপনাদের বক্তব্য কী হবে?

রিজভী জিয়ানগরের নাম ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, জিয়ানগর নামটি বাদ দেয়া আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ ও সকল মুক্তিযোদ্ধাদেরই অপমান করা। কারণ এটি আমাদের দেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে। তিনি এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেছেন, বাকশালের অন্ধকার গুহা থেকে যিনি গণতন্ত্রকে উদ্ধার করেছিলেন। তিনি জানান, জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকার সময় ইন্দুরকানীতে ‘জল-থানা’ প্রতিষ্ঠিত করেন এবং পরবর্তীতে তা পূর্ণাঙ্গ থানায় উন্নীত করেন। জিয়ার ওই অবদানের কারণে ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার আমলে এটিকে উপজেলায় উন্নীত করে জিয়ানগর নাম দেয়া হয়।

‘রাজধানীতে সমাবেশ করতে দেয়ার ক্ষমতা ডিএমপির’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা কী জনগণকে কাঁচকলার রাজনীতি শেখাচ্ছেন ? জনগণ মনে হয় কিছুই বোঝেন না? ডিএমপির কাজ হচ্ছে অপরাধ দমন, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অধিকার দমন নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য যদি সঠিক হয় তাহলে বুঝতে হবে গণতন্ত্রের পায়ে পুলিশ বেড়ি দিয়ে রেখেছে। যখন দেশব্যাপী অপরাধীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখন সরকার ডিএমপিকে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার দমনে ব্যবহার করছে। আওয়ামী লীগের ইচ্ছা বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছে ডিএমপি তথা পুলিশ বাহিনীকে, যাদের বেতন দেয়া হয় জনগণের ট্যাক্স থেকে, আওয়ামী লীগের তহবীল থেকে নয়। 

বিএনপির এ নেতা বলেন, কাদের ইঙ্গিতে ডিএমপি বিএনপিকে ৭ জানুয়ারি সমাবেশ করতে দেয়নি সেটি আওয়ামী নেতারা না বুঝলেও জনগণ ঠিকই বোঝে। কিন্তু মনরক্ষা ও চাকরি রক্ষার জন্য তাদেরকে উল্টাপাল্টা অনেক কিছুই বলতে হয়। অথচ কয়েক দিন আগে এরশাদের জাতীয় পার্টি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাতি-ঘোড়া নিয়ে সমাবেশ করেছে। আওয়ামী লীগ রাজধানীতে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে অহরহ সমাবেশ করছে, আজকেও (মঙ্গলবার) পুলিশের পক্ষ থেকে ঘোষনা দিয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথ-ঘাট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের সমাবেশের জন্য। বাংলাদেশের পুলিশ এখন আওয়ামীল লীগের পার্সনাল সিকিউরিটিতে পরিণত হয়েছে। 

রিজভী বলেন, সারাদেশের জেলা উপজেলায় সরকারের দলবাজ কর্মকর্তা ও প্রশাসনের লোকদের বাধ্য করে পালন করা হচ্ছে উন্নয়নের গণতন্ত্র মেলা। গণতন্ত্রকে পদদলিত করে আয়োজিত এসব মেলায় সাধারণ মানুষের কোন সম্পৃক্ততা নেই। এমনকি এসব মেলায় সরকারী দলের লোকজনদেরও দেখা মেলেনি। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বাধ্য করে লোক দেখানো এসব মেলা কিছু কিছু গণমাধ্যমের বদৌলতে প্রচার হলেও সাধারন মানুষ মনে করে এটি ভোটারবিহীন সরকারের একটি ডিজিটাল তামাশা। অসত্য জোর করে প্রচার করতে গেলে মানুষের আনন্দ হওয়ার চেয়ে হতাশার রুপটিই ফুটে উঠে। কারণ মানুষের মনে শান্তি নেই, পকেটে টাকা নেই, পেটে ভাত নেই, ঘরে বাইরে কোথাও মানুষের নিরাপত্তা নেই, আজ দেশে বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই, বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের অধিকারকে হরণ করা হয়েছে, লুটে নেয়া হচ্ছে মা বোনদের ইজ্জত, স্কুল কলেজের মেয়েরা ভয়ে স্কুলে যেতে পারছেনা ছাত্রলীগ-যুবলীগের চাপাতির আক্রমনে, মায়ের কাছে চাঁদা না পেয়ে মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন করা হচ্ছে, শিশুরাও নিষ্ঠুর নিপীড়ণের শিকার হচ্ছে, রাজকোষসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লুটে ফোকলা করে দেয়া হয়েছে, কিছু কিছু গণমাধ্যম বন্ধ করে দিয়ে বাকিগুলোকে হুমকি ধামকি দিয়ে সরকারী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানীতে প্রকম্পিত, বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লুটের কারখানা বানানো হচ্ছে, যুবকদেরকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে, ঘুষের দাবিতে সাধারণ মানুষদের ধরে নিয়ে থানায় লটকানো হচ্ছে, দেশে বেকারত্ব এখন মহামারী রুপ নিয়েছে, শিক্ষিত বেকাররা কাজ না পেয়ে অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মানুষের জমি-সহায় সম্পদ দখলের হিড়িক চলছে দেশজুড়ে। 

পুরো দেশ এখন লুটেরা রাজ্যে পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে রিজভী বলেন, সামরিক শাসক আইয়ুব খানও ১৯৬৮ সালে এধরনের উন্নয়নের দশক উৎসব করেছিলেন। তাতে তার শেষ রক্ষা হয়নি। গণঅভ্যূত্থানের স্রোতে ভেসে যেতে হয়েছে। শেখ হাসিনা স্বৈরশাসক আইয়ুব খানসহ বিভিন্ন দেশের স্বৈরশাসকদের মডেলকেই বেছে নিয়েছেন। সেজন্য বাংলাদেশের সবুজে এখন শুধুই রক্তের আল্পনা। দেশে দেশে নিষ্ঠুর শাসকরা গণতন্ত্রকে পদদলিত করে নিজেদের উন্নয়নের ফিরিস্তি গেয়ে মানুষকে ভোলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু জনসাধারণ কিছুই ভোলে না। কারন উন্নয়নের নামে নাটকই বেশী হয়। যার কারনে উন্নয়নের কোন ছিঁটেফোটাও মানুষের চেহারার মধ্যে প্রতিফলিত হয়না। আজও হাজার হাজার মানুষ তাদের ভিটে মাটি ছেড়ে কাজের সন্ধানে শহরের দিকে ছুটে আসছে, কাজ না পেয়ে নিজের সন্তানকে বিক্রি করছে, ঢাকা শহরে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে ফুটপাতের ওপর রাত্রি যাপন করছে। দেশের উন্নয়ন শুধু প্রধানমন্ত্রীর মুখে, সারাদেশে শুধু লবডঙ্কা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ