ঢাকা, বুধবার 11 January 2017, ২৮ পৌষ ১৪২৩, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা উপেক্ষা করে খুলনায় ইচ্ছে মতো ভর্তি ফি নেয়ায় অভিভাবকরা নাকাল

খুলনা অফিস : ইচ্ছে মতো ভর্তি ফি নেয়ায় নাকাল হয়ে পড়েছে অভিভাবকরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী তিন হাজার টাকার বেশি ভর্তি হতে পারবে না উল্লেখ থাকলেও খুলনার অধিকাংশ স্কুলেই ভর্তি সাড়ে তিন হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে বলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন শ্রেণীতে ভর্তির জন্য নগরীর বেসরকারি স্কুলগুলোয় ইচ্ছেমতো ভর্তি ও সেশন ফি আদায় করা হচ্ছে। ভর্তি ফি নির্ধারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি নীতিমালা থাকলেও তার তোয়াক্কা করছে না কেউই। বেতন, পরীক্ষার ফি ছাড়াও বিদ্যুৎ-পানির বিল, লাইব্রেরি, আসবাবপত্র, নামফলক, মসজিদসহ স্কুল-কলেজের উন্নয়নের জন্য টাকা নেওয়া হচ্ছে অভিভাবকদের কাছ থেকে। এই সবই জুড়ে দেয়া হয়েছে সেশন চার্জ হিসেবে।

২০১৪ সালের ২০ নবেম্বর বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির নীমিমালা প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, ভর্তি ফরমের জন্য ১০০ টাকার বেশি গ্রহণ করা যাবে না। ভর্তির জন্য ঢাকার বাইরের মহানগর এলাকায় সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকা নেয়া যাবে। কোনো প্রতিষ্ঠান এর বেশি নিলে তা মাসিক বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা অথবা ফেরত দেয়ার কথা। কিন্তু এগুলোকে তোয়াক্কা করছে না কেউই।

সূত্রটি জানায়, খুলনার পাবলিক কলেজে তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির জন্য নেয়া হচ্ছে ৯ হাজার ৩৮৫ টাকা। বাকি ক্লাস থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার ২৭৫ টাকা। পাশের মডেল স্কুল এন্ড কলেজে নেয়া হচ্ছে ৪ হাজার ৯৭০ টাকা। কলেজিয়েট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ১৭৫ টাকা। সেন্ট জোসেফ, লায়ন্স, প্রি-ক্যাডেট স্কুল এন্ড কলেজ, সুলতানা হামিদ আলীসহ সমমানের অন্য সব স্কুলেই তিন হাজার ৪০০ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগছে। এদের চাইতে আরও একধাপ এগিয়ে আছে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো। পনের হাজার টাকার নিচে এসব স্কুলে ভর্তির সুযোগ নেই।

অথচ সরকারি জিলা ও করোনেশনসহ খুলনার ৬টি স্কুলে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ভর্তি ফি এক হাজার ১৩৬ টাকা। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত এক হাজার ১৬৫ টাকা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাজমুল ইসলামের তিন ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে খুলনার পাবলিক স্কুলের দশম শ্রেণীতে, ছোট ছেলে একই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীতে এবং ছোট মেয়ে শেরে বাংলা রোড়ের একটি অভিজাত কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। বছরের শুরুতে তিন ছেলে-মেয়েকে নতুন ক্লাসে ভর্তি করতে গিয়ে নাকাল হতে হয়েছে নাজমুল ইসলামকে। কারণ বড় ছেলেকে ভর্তি করতে তাকে গুনতে হয়েছে ১০ হাজার ২৭৫ টাকা। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করতে মেঝ ছেলের জন্য লেগেছে ৯ হাজার ৩৮৫ টাকা এবং ছোট্ট সোনামনির প্রথম শ্রেণীতেই ভর্তি ফি পাঁচ হাজার ৭৭০ টাকা। নতুন ক্লাসে ছেলে-মেয়েদের ভর্তি করতেই তার খরচ ২৫ হাজার ৪৩০ টাকা। এর সঙ্গে নতুন পোশাক, খাতা, কলম-ব্যাগ তো আছেই। অল্প বেতনের চাকরি দিয়ে নাজমুল ইসলামের পক্ষে একসঙ্গে এতো টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই ঋণ নিতে হয়েছে। নাজমুল ইসলামের চরিত্রটি কাল্পনিক। কিন্তু তার মতোই যাদের একাধিক সন্তান রয়েছে সবার সমস্যা একই। মধ্যবিত্ত ঘরের বাবা-মায়েদের একটি বড় অংশকে নতুন বছর শুরু করতে হয়েছে ঋণ দিয়ে। যাদের ঋণ নিতে হয়নি তাদের ছিল আক্ষেপ। বছর বছর ভর্তি ফি ও বেতন বাড়ানোর লাগাম টেনে ধরার কাউকে না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন তারা। ভর্তি ফি বৃদ্ধির বিষয়ে খুলনা পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগেও এমন ছিল। নতুন করে বেতন বা ফি বাড়ানো হয়নি। ৪ মাসের বেতন ও অন্যান্য ফিসহ ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়া হয়।

কলেজিয়েট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. তৌহিদুজ্জামান বলেন, আমরা এমপিওভুক্ত নই। শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেয়া হয়। এজন্য বেতন বা ভর্তি ফি কমানো সম্ভব না। একই ধরনের বক্তব্য অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের বোঝা শিক্ষার্থীদের কাছে চাপনো অনৈতিক ও নিন্দনীয়। বিকল্প আয়ের উৎস না খুঁজে প্রতিবছর শিক্ষকদের আয় বাড়বে, সেই টাকা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হবে এই ধারণা থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানদের সরে আসা উচিত। সেই সঙ্গে শিক্ষা বিভাগের আরও কঠোর হওয়া উচিত।

এ ব্যাপারে খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা খোন্দকার রুহুল আমিন বলেন, বেতন বা ভর্তির ফি বৃদ্ধির বিষয় সম্পর্কে আমরা খোঁজ খবর নিচ্ছি। কেউ বেশি নিলে অবশ্যই তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ