ঢাকা, বুধবার 11 January 2017, ২৮ পৌষ ১৪২৩, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে প্রতারণা

খুলনা অফিস : দুর্বল সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কারণে মহানগরীসহ খুলনা জেলায় বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালে খপ্পরে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বছর জুড়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা হলেও বেসরকারি এ সকল ক্লিনিক ডায়াগনস্টিকে অব্যবস্থাপনার চিত্রের পরিবর্তন হয়নি। অপরাধে শুধুমাত্র জরিমানা দিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে আবারো স্বচিত্রে ফিরেছে এ সকল প্রতিষ্ঠান। নতুন বছরকে সামনে রেখে জিম্মিদশা দশা থেকে মুক্ত করতে জেলা প্রশাসনসহ বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে বলে দাবি ভুক্তভোগিদের। চলতি বছরের গত ২৬ সেপ্টেম্বর বটিয়াঘাটা থেকে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আসেন ৩ গরীব অসহায় নারী। তাদের তিনজনের ভাবনায় ছিলো সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের ফি লাগবে না, পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেও খরচ কম। যে টাকা বাঁচবে ওষুধ কিনে বাড়ি ফিরবেন তারা। কিন্তু সেই ভাবনাটা উল্টে গেলো জেনারেল হাসপাতালের সামনে বেসরকারি ক্লিনিকের দালালের খপ্পরে পড়ে। নগরীর দি প্রেসক্রিপসন প্যালেস ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল অনুপম তাদেরকে কম খরচে ভাল ডাক্তার দেখানোর প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসেন ডা. জাফর নামে একজন চিকিৎসকের কাছে। তিনি এ তিন নারীকে বিভিন্ন টেস্ট করানোর জন্য প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। তাদেরকে নিয়ে তার প্রতিষ্ঠান নগরীর সামছুর রহমান রোডের দি প্রেসক্রিপসন প্যালেসে যান অনুপম। ইতোমধ্যে ডাক্তারের ফি দেওয়ার পর তাদের হাতে শুধুমাত্র বাড়ি ফেরার অবশিষ্ট ছিল টাকা। সর্বশেষ সেদিনই বিষয়টি ভাগ্যক্রমে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের নজরে পড়ে। ওই তিন নারীর কাছে বিষয়টি শুনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তথা দালাল অনুপম বিশ্বাসকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ ও ১ লাখ টাকা জরিমানা করেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর নগরীর শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী হয়রানির অভিযোগে গোয়ালখালি এলাকার জাফর শেখের পুত্র বিপুল শেখ (২৬) কে আটক করে খালিশপুর থানা পুলিশ। পরে তাকে প্রতারণার মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়। ২৪ আগস্ট খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আসমা বেগম (২৩), ফাতেমা (৩৫), খাদিজা (৩৫), সোনিয়া (২৩) ও রাশিদা (৩২) নামের পাঁচ দালালকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ। মহানগর হাকিম মো. ফারুক ইকবাল শুনানী শেষে তাদের প্রত্যেককে তিন দিনের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন। একই দিনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ময়লাপোতা মোড়ের শিকদার ডেন্টাল হোমের মালিক সুকুমার শিকদারকে ২০ হাজার টাকা এবং শেরে বাংলা রোডস্থ আমতলা মোড়ে স্বস্তি হোমিও ক্লিনিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ৩০ আগস্ট খুমেক হাসপাতালে আগত রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভাগিয়ে নেয়ার কাজে নিয়োজিত আরো ৫ দালালকে আটক করে পুলিশ। পরে তাদেরকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১ মাস করে বিনাশ্রম কারাদ-াদেশ দেয়া হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম পরিচালনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে দ-প্রাপ্তরা দালালরা হলেন ছোট বয়রা মাদরাসা গলির মৃত তৈয়ব আলী গাজীর স্ত্রী হালিমা (৪০), দৌলতপুরের পাবলার শরিফুলের স্ত্রী ঝর্ণা বেগম (২৪), ছোট বয়রা এলাকার সায়েন উদ্দিন মোল্লার ছেলে মেহেদী হাসান ওরফে ইউসুফ (৩৫), একই এলাকার আজিজ হাওলাদারের মেয়ে শাহীনা (২৪) ও সোনাডাঙ্গা এলাকার মাসুদের স্ত্রী রাবেয়া (৪০)। গত ১২ অক্টোবর খুলনার বেসরকারি গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নানা অপব্যবস্থাপনার অভিযোগে ১০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদ-াদেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেদিন দুপুরে র‌্যাব-১ ও ৬ এর যৌথ অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফিরোজ আহম্মেদ এ আদেশ দেন। ওই অভিযানের পর খুলনার বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো নড়েচড়ে বসেন। ১৩ অক্টোবর খুমেক হাসপাতালের সামনে খুলনা হেলথ গার্ডেন, ডায়াগনস্টিক ও কনসালটেশন সেন্টারের মালিক খন্দকার আহসান উল্লাহ (৪০), প্যাথলজি টেকনলজিস্ট মো. হাফিজুর রহমান (২৪) কে এক লাখ টাকা করে মোট ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় উক্ত হাসপাতাল থেকে অনুমোদনবিহীন এক ব্যাগ রক্তসহ মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন প্রকার ইনজেকশন উদ্ধারপূর্বক ধ্বংস করা হয়।
ভ্রাম্যামাণ আদালতের নিয়মিত অভিযানে অসাধু স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন দেখা দিলেও অভিযান অব্যাহত না থাকায় আবারো ব্যবসায়ী চিত্তে ফিরেছেন তারা। নতুন বছরকে সামনে রেখে প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি রোগী ও তার স্বজন এবং ভোক্তা অধিকার আদায়ে আন্দোলনের সংশ্লিষ্টরা।
খুলনার জেলা প্রশাসক সাজমুল আহসান বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বাণিজ্য বন্ধে জেলা প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে আসছে। তবে নতুন বছরকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষের দাবিকে প্রধান্য দিয়ে অভিযান বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ