ঢাকা, বুধবার 11 January 2017, ২৮ পৌষ ১৪২৩, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বেনাপোল বন্দরে পাটজাত পণ্য রফতানি প্রায় বন্ধ ॥ আটকা পড়েছে ৩৮ ট্রাক

খুলনা অফিস : ভারত সরকার বাংলাদেশী পাটজাত পণ্যের ওপর উচ্চ হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করার এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বেনাপোল বন্দরে। এ বন্দর দিয়ে মাত্র ৬ ট্রাক পাট জাতীয় পণ্য রফতানি হয়েছে। বেনাপোল বন্দরে এ পর্যন্ত ৩৮ ট্রাক পাটজাত পণ্য আটকা পড়েছে।
বেনাপোল চেকপোস্ট কাস্টমস কার্গো শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা আবদুস সামাদ জানান, বেনাপোল বন্দর দিয়ে প্রতিদিন এক থেকে দেড়’শ ট্রাক পাট জাতীয় পণ্য ভারতে রফতানি হতো। নতুন করে শুল্ক আরোপ করে গেজেট প্রকাশের পর গত বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মাত্র ৬ ট্রাক পাট জাতীয় পণ্য রফতানি হয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৯১ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে বিভিন্ন দেশে যার ২০ শতাংশ রফতানি হয়েছে ভারতে।
পাট জাতীয় পণ্য রফতানিকারকের প্রতিনিধি তৌহিদুর রহমান জানান, বাংলাদেশ থেকে যে সব পাট জাতীয় পণ্য ভারতে রফতানি হয় তার সিংহ ভাগ খোলাবাজারে বিক্রি হওয়াকে এন্টি ডাম্পিং বলা হয়। বাংলাদেশী উৎপাদকরা পাট রফতানিতে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা পাওয়ায় ভারতীয় পাট মার খাচ্ছে এমন অভিযোগ জানিয়ে দেশটির অ্যান্টি-ডাম্পিং এন্ড অ্যালাইড ডিউটিজ (ডিজিএডি) অধিদপ্তর গত অক্টোবরে বাংলাদেশে পাটজাত পণের ওপর শুল্ক আরোপের সুপারিশ করে। সুপারিশের পর গত বৃহস্পতিবার ভারতের রাজস্ব বিভাগ এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের গেজেট প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান ভারতে পাটের সুতা, চট ও বস্তা রফতানি করতে চাইলে প্রতি মেট্রিক টনে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। ভারতের এই জাতীয় সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের পাট জাতীয় পণ্যের রফতানি কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
বেনাপোল বন্দর কাস্টমস ক্লিয়ারিং এন্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন জানান, বাংলাদেশের পাট ও পাট জাতীয় পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার ভারত। সেই বাজারে পাঁচ বছরের জন্য এই শুল্ক আরোপ করা হল। প্রতিবছর ভারতে প্রায় দুই লাখ টন পাট সুতা, বস্তা ও চট রফতানি করে আসছে বাংলাদেশ, যার মধ্যে পাট সুতার পরিমাণ দেড় লাখ টন। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন হারে পাট জাতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করায় ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতায় টেকা সম্ভব নয়।
বেনাপোল স্থলবন্দরের কার্যক্রমে ধীরগতি : দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে লাখ লাখ টন মালামাল নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে শত শত ভারতীয় ট্রাক। আমদানি-রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাস্টমসহ সব পর্যায়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কার্যক্রম চললেও বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সব কার্যক্রম চলছে মান্ধাতার আমলের হাতে কলমে লিখে। খোদ বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতার কারণে অটোমোশন চালু হচ্ছে না।
ম্যানুয়েল ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিতে কার্গো পণ্য তদারকি করার ফলে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে পণ্য খালাসে অযথা সময় নষ্ট হয়। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমদানি-রফতানি এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর। এছাড়া এ পুরনো পদ্ধতিকে পুঁজি করে বন্দরে গড়ে উঠেছে একটি অসাধু চক্র। যাদের কারণে সরকার প্রতিবছরই বঞ্চিত হচ্ছে বড় ধরনের রাজস্ব থেকে। গত অক্টোবরে আগুন লেগে কত টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে সেই হিসাব মিলাতে কাস্টমসের কাছে ধরনা দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। অথচ এসব পণ্যের তালিকা কম্পিউটারে থাকলে এক ক্লিকে সব পাওয়া যেত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের প্রধান বন্দরগুলোতে ইতোমধ্যে অটোমোশন পদ্ধতিতে সব কার্যক্রম পরিচালিত হলেও স্থলবন্দর বেনাপোলে এখনও পর্যন্ত অটোমোশন পদ্ধতির ছোঁয়া লাগেনি। অনেক কর্মকর্তা এখন অটোমোশন পদ্ধতি কি সেটিও জানেন না। এর ফলে আমদানি-রফতানিসহ মালামাল খালাসে প্রতিদিন অতিরিক্ত সময়ের অপচয় ঘটছে। পাশাপাশি আশানুরূপ সেবা পাচ্ছে না বন্দর ব্যবহারীরা। অথচ আশানুরূপ সেবা না দিয়েও প্রতিবছর শতকরা ৫ ভাগ বন্দরের চার্জ আদায় করে নিচ্ছেন বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে। যে ভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাড়িয়ে চলেছেন তাতে একদিন দেখা যাবে পণ্যের মূল্যের চেয়ে বন্দর ভাড়া বেশি পড়ে যাবে। আর এ নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারী কোনো সংগঠন কোনো কথা বা প্রতিবাদ করছে না। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ অটোমোশন পদ্ধতি চালু না করার কারণে কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করাও সম্ভব হচ্ছে না। অথচ কাস্টমসে বেশ কয়েক বছর আগেই কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে অটোমোশন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। বন্দরে অটোমোশন পদ্ধতি চালু না হওয়ায় সেটিও কোনো কাজে আসছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের এনালগ পদ্ধতিতে বন্দরে কাগজপত্র সাবমিট করতে হচ্ছে। অটোমোশন পদ্ধতি চালু না হওয়ার কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন ভারত থেকে বন্দরে কি পরিমাণে মালামাল ঢুকছে, মালামালের সঠিক বর্ণনা, মালামালের পরিমাণ, কোন মাল কত নম্বর শেডে সংরক্ষিত হচ্ছে তার কোনো সঠিক হিসাব দিতে পারছে না। এসব জানতে বা দেখতে খাতাপত্র দেখে বলা হয়। যার ফলে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছে হর হামেশায়। এ কারণে অন্যান্য বন্দরের তুলনায় শুল্ক ফাঁকির প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে বহুগুণে। ফলে সরকার এ বন্দর থেকে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বেনাপোল বন্দরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে দ্রুত কার্গো পণ্য আমদানি-রফতানিতে পুরনো ক্লিয়ারেন্স পদ্ধতিকে অন্যতম বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই গবেষণাপত্রে। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফআইসি) সহায়তা ‘বাংলাদেশ টাইম রিলিজ স্টাডি (টিআরএস)’ শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালনা করে বেনাপোল বন্দর কাস্টমস হাউসে। এছাড়া ওরজ-কোয়েস্ট রিসার্চ লি. (ওর- কোয়েস্ট) এ গবেষণায় সার্বিক সহযোগিতা করেছে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দর টিআরএস জরিপ এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দক্ষিণ এশিয়া সামাজিক ও অর্থনীতি ঋণ প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে।
জানা গেছে, বেনাপোল বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর। এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৫ শতাধিক উৎপাদন ও পচনশীল পণ্য বোঝাই ট্রাক ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। যার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি বিল অফ এন্ট্রি পণ্য ক্লিয়ারেন্সের জন্য জমা হয়। এছাড়া প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ৫০০ বিদেশী যাত্রী এ বন্দর দিয়ে ভ্রমণ করে। একই সঙ্গে বন্দরে সময় বাঁচানোর বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দরের উপ-পরিচালক (ট্রাফিক) আবদুল জলিল জানান, বেনাপোল স্থলবন্দরকে ডিজিটাল করতে ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ে কাজ চলছে। অচিরেই বেনাপোল বন্দরকে ডিজিটালে রূপান্তরিত করা হবে। এর ফলে বন্দরের গতিশীলতা অনেক বেড়ে যাবে বলে তিনি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ