ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 January 2017, ২৯ পৌষ ১৪২৩, ১৩ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ ও মৃত্যু আশংকাজনকহারে বাড়ছে

সাদেকুর রহমান : দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও দীর্ঘস্থায়ী এসব রোগের ওষুধ তৈরিতে এগিয়ে আসছে না সরকার। ওষুধ প্রস্তুতকারক সরকারি একমাত্র প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) সংক্রামক রোগের ওষুধ দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করলেও অসংক্রামক রোগের ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের মানুষ।
বিভিন্ন প্রামাণ্য গবেষণার বরাতে চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশেষত উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস সংক্রান্ত জটিলতা এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে খাদ্যাভাস পরিবর্তনের মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ইচ্ছা করলেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ জন্য সচেতনতার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার, অধিক ফল, বেশি করে সবজিগ্রহণ ও মানুষের খাদ্যাভাস পরিবর্তন জরুরি।
 জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর ১ লাখ ২১ হাজার ক্যান্সারের নতুন রোগী তৈরি হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, গত এক যুগের ব্যবধানে উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ উচ্চরক্তচাপে ভুগছে। দেশের ১১ শতাংশ মানুষ এখন বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত। গত তিন দশকের ব্যবধানে রোগটির ব্যাপকতা ধারাবাহিকভাবেই বেড়েছে। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক ২৩ শতাংশ মানুষের মধ্যে এ রোগের উপসর্গ বিরাজমান।
বাংলাদেশে ৬০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ। ২০১০ সালে ডব্লিউএইচও’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৯৮ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যক্তির মধ্যে অন্তত একটি, ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে অন্তত দুটি ও ২৩ দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে তিনটি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি রয়েছে। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬৪ লাখ বা ৪ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে।
সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) নামে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ৫১ শতাংশের অধিক অসংক্রামক রোগে মারা যায়। এদের বড় একটা অংশ হৃদরোগ, বহুমূত্র ও ক্যান্সারে আক্রান্ত। আগের চেয়ে শহর ও গ্রামে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৪ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শহরে ভোক্তাদের প্রায় ৭০ শতাংশের অধিক এবং গ্রামে ৫৯ শতাংশ মানুষ কোন না কোনভাবে ক্ষতিকর এই প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করে। আরেক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্র (আইডিআরসি) এর অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণা জরিপে বলা হয়, সবজি ও ফল আগের চেয়ে কম খাওয়ার কারণে এই প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশের ১৬টি উপজেলা ও ৮ জেলায় এই গবেষণা কার্যক্রম চালানো হয়। জেলাগুলো হচ্ছে খুলনা, সাতক্ষীরা, মৌলবীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, জামালপুর ও পাবনা।
জাতীয় অধ্যাপক আবদুল মালিক বলেন, অসংক্রামক ব্যাধি মূলত মানুষেরই তৈরি। জাতীয় অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে অসংক্রামক ব্যাধি দূরে রাখতে হবে। এ জন্য মানুষকে সচেতন করতে হবে। সরকার একা এটা পারবে না। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির সভাপতি ও বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এ কে এম মহিবুল্লাহ বলেন, বর্তমান বিশ্বে তিনটি মৃত্যুর দুটি হচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধিতে। অসংক্রামক ব্যাধিতে যে মৃত্যু, তার অর্ধেক হচ্ছে অকালমৃত্যু।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি এ কে আজাদ খান বলেন, বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে একজন মারা যাচ্ছে অসংক্রামক ব্যাধিতে। উত্তর আমেরিকায় যে হারে অসংক্রামক ব্যাধি বাড়ছে, তার চেয়ে বাংলাদেশে বাড়ছে বেশি। অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন করার কথা সরকারের। তিনি বলেন, গাঁজা চাষ নিষিদ্ধ। তাহলে তামাক চাষ বন্ধ করা হবে না কেন?
এন্ডোক্রাইনো সোসাইটি অব বাংলাদেশের অনারারি সভাপতি ও বহুমূত্র বিশেষজ্ঞ হাজেরা মাহতাব বলেন, শুধু বহুমূত্র নয়, হৃদরোগ, ক্যানসার ও উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ সম্ভব। মায়ের বহুমূত্র থাকলে শিশুরও বহুমূত্র দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করে শিশুর বহুমূত্র অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি বলেন, স্কুলশিক্ষার্থীরা ফাস্টফুড বেশি খায়। এই চর্চা ঠিক নয়।
কিডনি ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হারুন-উর-রশীদ বলেন, কিডনি ৭৫ শতাংশ নষ্ট হলে কিডনি ফেইলিওর হয়। বছরে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষের এটা ঘটে। তাদের ১৫ শতাংশ চিকিৎসা পায়, বাকি ৮৫ শতাংশ বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। তিনি বলেন, কিডনি চিকিৎসার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, অসংক্রামক ব্যাধির ওষুধ এখনো সরকার অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় আনেনি। তবে দেশে অসংক্রামক ব্যাধি যে হারে বাড়ছে, তাতে সময় এসেছে এসব ওষুধকে অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় আনা এবং উৎপাদন শুরু করা। এসব ওষুধ যেসব কোম্পানি তৈরি করছে, সেগুলোর দামও সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে (এমডিজি) অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণের কোনো লক্ষ্যমাত্রা ছিল না। এটা ছিল ভুল। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে (এসডিজি) অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ এক-তৃতীয়াংশ কমাতে হবে। তিনি বলেন, রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে। রোগ কম হলে কম মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।
এদিকে, সরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের সরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ৭০-৭৫ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ দিচ্ছে ইডিসিএল। কিন্তু অসংক্রামক ব্যাধি ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চরক্তচাপ, মস্তিষ্কজনিত সমস্যার ওষুধ তৈরিতে এগোচ্ছে না সরকার। যদিও অসংক্রামক ব্যাধি এখন ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে। এসব রোগের ওষুধকে সরকার এখনো অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় স্থান দেয়নি। ফলে ইডিসিএল এসব ওষুধ তৈরি করছে না। তবে এসব ওষুধ তৈরি ও এগুলো অত্যাবশ্যকীয় তালিকায় স্থান দেয়ার সময় এখন চলে এসেছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
দেশে অসংক্রামক ব্যাধি বাড়লেও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এসব রোগের ওষুধ দরপত্রের মাধ্যমে কিনে নিচ্ছে। এতে সরকারের অর্থের যেমন অপচয় হচ্ছে, তেমনি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এসব ওষুধের সরবরাহ কম থাকায় রোগীদের টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র শ্রেণীর লোকজন স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ছে। কারণ অসংক্রামক রোগে আক্রান্তদের সারা জীবন ওষুধ সেবন করে চলতে হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সরকারি হাসপাতালে ইডিসিএল ওষুধ সরবরাহ করছে। অসংক্রামক ব্যাধির ওষুধ তৈরিতে ওই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কতটুকু রয়েছে, তা দেখতে হবে। গোপালগঞ্জে যেহেতু ইডিসিএলের একটি কারখানা স্থাপনের কাজ চলছে, সেটি সম্পন্ন হলে এসব ওষুধ তৈরি করা যেতে পারে। তারা আরো বলেন, দেশের মানুষ যাতে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের মানুষকে সচেতন করে তুলতে লাইন ডিরেক্টররা কাজ করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ