ঢাকা, বৃহস্পতিবার 12 January 2017, ২৯ পৌষ ১৪২৩, ১৩ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জ্বালানিতে বিদেশ নির্ভর হচ্ছে সরকার!

  • রান্নার কাজে সিলিন্ডার আমদানি অগ্রাধিকার দেয়া হবে -- অর্থমন্ত্রী
  • আগামী দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তায় পরিবর্তন হবে--- জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী 

স্টাফ রিপোর্টার : মাত্র কয়েক বছর আগেও দেশে গ্যাসের অফুরন্ত মজুদের কথা সরকারের লোকজনের মুখ বেশ প্রচারিত ছিল। এখন বলা হচ্ছে, মজুদ শেষ। রান্নার কাজেও গ্যাস দেয়া হচ্ছে না। আগামী দিনেও গৃহস্থালির কাজে প্রাকৃতিক গ্যাস সংযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে মাত্র এই অল্প দিনের ব্যবধানে গ্যাসের এত মজুদ গেল কোথায়? এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশী আর্থিক সহায়তা নিয়ে জ্বালানি সেক্টরকে বিদেশ নির্ভর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

ইতোমধ্যে দুুটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বা টাকার অংকে যার পরিমাণ এক হাজার ৮০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা নিচ্ছে সরকার। গ্যাসের বিভিন্ন প্রকল্পের নামে এই অর্থ ব্যয় করবে সরকার। এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, আগামী ২ বছরের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন হবে। এক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ অর্থ। একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরপত্তা গড়ে তুলতে আমাদের প্রয়োজন ১৫ বিলিয়ন ডলার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্যাস খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশকে ১৬ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এ অর্থে দেশের প্রধান গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নের পাশাপাশি বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। ফিলিপাইনের ম্যানিলায় এডিবির সদর দফতরে অনুষ্ঠিত এডিবি’র বোর্ড সভায় সম্প্রতি প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। 

এডিবি’র দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এডিবির অর্থায়নে নেয়া প্রকল্পটিতে চীনের নেতৃত্বে নব গঠিত এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) ৬ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা দেবে। এটি এআইআইবির যৌথ অর্থায়নে বাংলাদেশে এডিবি’র দ্বিতীয় প্রকল্প। সব মিলে প্রকল্পে বিদেশী সহায়তা আসবে ২২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।

 এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দ্রুত বাড়ছে। তবে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ছে না। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরল জ্বালানিতে নির্ভরতা বাড়ছে। তাছাড়া গ্যাসের মজুদও ক্রমেই কমে আসছে। এ অবস্থায় সরকার চাহিদা পূরণে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই সরকারের জ্বালানি চাহিদা পূরণে বাড়তি গ্যাস সরবরাহে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন এডিবি দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি বিষয়ক অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ হুংওয়ে জং। 

 দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি বিষয়ক অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ হুংওয়ে জং জানান, গ্যাসের মজুদ সঙ্কট মোকাবেলা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যা উত্তরণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জ্বালানি খাতের অংশিদারিত্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। কারণ এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন দক্ষতা ব্যাপকহারে বাড়বে।

গত কয়েক মাস থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই অব্যাহতভাবে গ্যাসের সংকট বাড়ছে। অনেক এলাকায় চুলায় আগুনই জ্বলে না। দিনে দিনে এই সংকট আরো বাড়ছে। 

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক (অপারেশন) মো. আলী আশরাফ গ্যাসের এই সংকট বিষয়ে বলেন, গ্যাসের যে চাহিদা রয়েছে, সে অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছি না। তাই চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস বিতরণ করা যাচ্ছে না। যা বরাদ্দ পাচ্ছি তাই সরবরাহ করছি। রাজধানীসহ অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কম রয়েছে স্বীকার করে তিনি বলেন, যে সব এলাকায় গ্যাসের চাপ কম, সে সব এলাকায় চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে গ্যাস কম থাকায় সেটি করেও ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

গ্যাসের সংকটের কথা বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, গ্যাসটা এত মূল্যবান সম্পদ যে এটা দিয়ে ভাত-তরকারি রান্নার কোনো মানে হয় না। সরকার নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে গৃহস্থালিতে গ্যাস ব্যবহার নিরুৎসাহিত করছে। বাসা-বাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ আর না দেয়ার পাশাপাশি সিলিন্ডারে এলপিজি আমদানি উৎসাহিত করছে। অর্থমন্ত্রী পাইপলাইনে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলএনজি আমদানি করার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের কথাও জানান।

উল্লেখ্য বাংলাদেশে উৎপাদিত গ্যাসের ১২ শতাংশ ব্যবহার হয় গৃহস্থালিতে রান্নার কাজে। গ্যাস সঙ্কটের কারণে ২০০৯ সাল থেকে গৃহস্থালিতে নতুন আর গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে উৎপাদন দুই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আগামী ২ বছরের মধ্যে জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন হবে। এক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ অর্থ। একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরপত্তা গড়ে তুলতে আমাদের প্রয়োজন ১৫ বিলিয়ন ডলার। আর এই অর্থ জোগাড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো মার্কেটে নিয়ে যাওয়া, ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল বন্ড ছাড়া ইত্যাদি পরিকল্পনা আমাদের আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ