ঢাকা, শনিবার 14 January 2017, ১ মাঘ ১৪২৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

টঙ্গীর তুরাগ তীরে লাখো মুসল্লীর জুমার নামায আদায়

গতকাল শুক্রবার তুরাগ নদীর তীরে তাবলীগ জামাতের ইজতিমাায় লাখো মুসল্লীর ঢল -সংগ্রাম

গাজীপুর ও টঙ্গী সংবাদদাতা : টঙ্গীর তুরাগতীরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ইজতিমার প্রথম দিন গতকাল শুক্রবার লাখো মুসল্লী একসঙ্গে জুমার নামায আদায় করেছেন। নিয়মিত তাবলিগ জামাত ছাড়াও ঢাকা-গাজীপুরসহ আশপাশের কয়েক লাখ মুসল্লী জুম্মার নামাযে অংশ নেন। জুমার নামাযে ইমামতি করেন ঢাকার কাকরাইল মসজিদের হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের।

বৃহত্তম জুমার নামাযে অংশ নিতে ভোর থেকেই ইজতিমা মাঠে আসতে শুরু করেন মুসল্লীরা। দুপুর ১২টার দিকে ইজতিমা মাঠ ও এর আশপাশের খোলা জায়গাসহ সব স্থান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। মাঠে স্থান না পেয়ে অনেকে মহাসড়ক ও অলি-গলিসহ যে যেখানে পেরেছেন পাটি, চটের বস্তা, খবরের কাগজ বিছিয়ে জুমার নামাযে শরিক হয়েছেন। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেশ কিছুক্ষণের জন্য যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এর আগে বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৫২তম বিশ্ব ইজতিমার প্রথম পর্ব। ভারতের মাওলানা ওবায়দুল খোরশেদের আম বয়ানের মধ্য দিয়ে ইজতিমার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। তিনি উর্দূতে আম বয়ান করেন।

ইজতিমায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের তাবলিগ মারকাজের শুরা সদস্য ও বুজর্গরা বয়ান পেশ করেন। মূল বয়ান উর্দূতে হলেও বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, মালয়, তুর্কি ও ফরাসিসহ বিভিন্ন ভাষায় তাৎক্ষণিক অনুবাদ করা হয়। ইজতিমায় বিভিন্ন ভাষাভাষি মুসল্লিরা আলাদা আলাদা বসেন এবং তাদের মধ্যে একজন করে মুরব্বি মূল বয়ানকে তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে শুনান।

বিশ্ব ইজতিমার কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আম ও খাস বয়ান, তালিম, তাশকিল, ৬ উছুলের হাকিকত, দরসে কোরআন, দরসে হাদিস, চিল্লায় নাম লেখানো, নতুন জামাত তৈরি, যৌতুক বিহীন বিয়ে। ১৫ জানুয়ারি রোববার মোনাজাতের মধ্য দিয়ে প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটবে।

ধর্মপ্রাণ মুসল্লীদের এ বৃহৎ জমায়েত উপলক্ষে দেশ বিদেশের বিপুলসংখ্যক মুসল্লী ইজতিমা ময়দানে জমায়েত হতে শুরু করেছেন। প্রচ- শীতকে উপেক্ষা করে বয়ান শুনতে ছুটে আসছেন তারা। ১৫ জানুয়ারি রোববার মোনাজাতের দিন পর্যন্ত মুসল্লীদের ইজতিমা ময়দানে আসা অব্যাহত থাকবে। প্রথম পর্বের তিন দিনব্যাপী ইজতিমায় অংশ নিতে ইতোমধ্যে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দেশের নির্দিষ্ট ১৬টি জেলা থেকে আসছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা। তাদের নিয়ে মাঠে চলছে আলাদা আলাদা বয়ানও। আগত মুসল্লীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক চিহ্ন তৈরি করা হয়েছে। ৫২তম এ বিশ্ব ইজতিমায় তুরাগ তীরের প্রায় ১৬০ একর জমিতে স্বেচ্ছাশ্রমে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে মুসুল্লীদের জন্য। আগত লাখ লাখ মুসল্লীদের সেবা দিতে মাঠের চার পাশে প্রস্তুত করা হয়েছে ২৮টি তিনতলা বিশিষ্ট টয়লেট। আশুলিয়ার রাস্তা থেকে সরাসরি মাঠে প্রবেশ করতে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় তুরাগ নদীতে নির্মাণ করা হয়েছে ৭টি অস্থায়ী সেতু। এবার বাংলাদেশ ছাড়াও প্রায় ৩০টি দেশ থেকে মুসল্লীরা এ ইজতিমায় অংশগ্রহণ করছেন বলে জানিয়েছেন ইজতিমা আয়োজক কমিটি। সুষ্ঠুভাবে বিশ্ব ইজতিমার অনুষ্ঠান নিশ্চিত করতে বিপুল সংখ্যক র‌্যাব, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশের বৃহত্তম জুম্মার নামায আদায় : বিশ্ব ইজতিমার প্রথম দিন জুম্মা বার হওয়ায় ইজতিমা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের বৃহত্তম জুম্মার জামাত। দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে জুমার জামাত শুরু হয়। ওই নামাযের ইমামতি করেন বাংলাদেশের মাওলানা মো. ফারুক হোসেন।

ইজতিমায় যোগদানকারী মুসল্লীরা ছাড়াও জুম্মার নামাযে অংশ নিতে ঢাকা-গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকার লাখ লাখ মুসল্লী ইজতিমা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। ভোর থেকেই রাজধানীসহ আশপাশের এলাকা থেকে মাঠের দিকে মানুষের ঢল নামে।

দুপুর ১২টার দিকে ইজতিমা মাঠ উপচে আশপাশের সকল সড়ক-মহাসড়ক ও খোলা জায়গায় মুসল্লীরা নামায আদায়ের জন্য অবস্থান নেন। এক পর্যায়ে ১৬০ একর এলাকা বিস্তৃত ময়দান ছাপিয়ে মুসল্লীরা যে যেখানে পেরেছেন হোগলা পাটি, চটের বস্তা, খবরের কাগজ বিছিয়ে জুম্মার নামায়ে শরিক হয়েছেন। এসময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শ্রীপুর থেকে আসা মুসল্লী আল আমিন মিয়া জানান, বড় জামাতে নামায আদায় করা অনেক ফজিলত। তাই জুমার নামায আদায় করার জন্য ভোরেই বাড়ি থেকে রওয়ানা দিয়েছেন।

বাদ ফজর থেকে বয়ান করেন, দিল্লীর মাওলানা ওবায়েদুলাহ খোরশেদ, জুম্মার পর বয়ান করেন দিল্লীর মাওলানা ওয়াসিকুর রহমান, বাদ আসর বয়ান করেন দিল্লীর মাওলানা আহসান, বাদ মাগরিব বয়ান করছেন ভারতের মাওলানা শওকত। এসব বয়ান বাংলা, আরবি, উর্দু, ফারর্সিসহ বিভিন্ন ভাষায় তাৎক্ষণিক তরজমা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বব্যস্থা : গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ জানান, ইজতিমা ময়দানে মুসল্লীদের নিরাপত্তায় ৫স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তুলা হয়েছে। মুসল্লীদের নিরাপত্তাদানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে র‌্যাব সদস্যরা পুরো ময়দানে মুসল্লীদের নিরাপত্তা কার্যে নজরদারী করবে। এদিকে সাদা পোষাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য ইজতিমা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, দেশী বিদেশী লাখো মুসল্লির নিরাপত্তায় ইজতিমা মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭ হাজার সদস্য নিয়োজিত করার পাশাপাশি মাঠ পর্যবেক্ষণে থাকছে ৯টি ওয়াচ টাওয়ার। প্রতিটি মোড়ে বসানো হয়েছে চারমুখী সিসি ক্যামেরা। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বোম ডিস্পোজাল এবং ডগ স্কোয়াড ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশ এবং র‌্যাবের একাধিক টিমকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তুরাগ নদীতে র‌্যবের দুটি স্পিড বোট টহল দেবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হেলিকপ্টার ইজতিমা মাঠের আকাশে টহল দেবে।

গাজীপুর জেলার সিভিল সার্জন সূত্রে জানা যায়, ইজতিমায় আগত মুসল্লীদের চিকিৎসা কার্যক্রমে সকল প্রস্তুতি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের রয়েছে। টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত শয্যা ছাড়াও অতিরিক্ত ৫০টি শয্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। হাসপাতালে একটি নিজস্ব কন্ট্রোল রুম, কার্ডিয়াক, বার্ণ, অ্যাজমা, ট্রমাসহ বিভিন্ন ইউনিট খোলা হয়েছে। এছাড়াও টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের উদ্যোগে টঙ্গীর মন্নুগেট, বাটা গেট ও হোন্ডা রোডে মুসল্লীদের তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার জন্য ফ্রি মেডিকেল সেন্টার খোলা হয়েছে। মুসল্লী¬দের সেবা প্রদানের জন্য টঙ্গী সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল সেন্টারগুলোতে এ্যাম্বুলেন্স সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হোটেলে খাবারের মান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভেজাল খাদ্যদ্রব বিক্রিতে তদারকি করা হচ্ছে। 

শতাধিক রাষ্ট্রের মুসল্লীর অংশগ্রহণ : এবারের ৫২তম বিশ্ব ইজতিমার প্রথম পর্বে গতকাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৮৭ জন বিদেশী মুসল্লী ইজতিমা ময়দানে এসে উপস্থিত হয়েছেন। গাজীপুর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার পরিদর্শক মো. মোমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। 

ইজতিমার আয়োজক সূত্রে জানা যায়, মুসল্লীদের এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। বিভিন্ন ভাষা-ভাষী ও মহাদেশ অনুসারে ইজতিমা ময়দানের উত্তর পাশে বিদেশী মেহমানদের জন্য পৃথক বিদেশী নিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

৬ মুসল্লীর মৃত্যু : বিশ্ব ইজতিমায় যোগ দিতে আসা সুমল্লিদের মধ্যে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৬ মুসল্লীর মৃত্যু হয়েছে। সকাল ৯টার দিকে বাবুল মিয়া (৬০) নামে এক মুসল্লী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তিকাল করেন। তিনি ফেনীর দাগনভূইয়া উপজেলার মাছিমপুর গ্রামের আ. রশিদের ছিলে।

টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোখলেছুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ নিয়ে বিশ্ব ইজতিমার প্রথমপর্বে যোগ দিতে আসা ৬ মুসল্লীর মৃত্যু হলো।

এর আগে বুধবার দিবাগত রাতে কক্সবাজারের মো. হোসেন আলী (৬৫), বৃহস্পতিবার সকালে ময়মনসিংহের নান্দাইলের মারুয়া গ্রামের মৃত আহম্মদ আলীর ছেলে মো. ফজলুল হক (৫৬), বিকেলে সাতক্ষীরা জেলা সদরের খেজুরডাঙ্গা এলাকার মৃত আব্দুস সোবাহানের ছেলে আ. আব্দুস সাত্তার (৬০), সন্ধ্যায় টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি উপজেলার নিজবন্নী এলাকার মো. জানু ফকির (৭০) ও রাতে মানিকগঞ্জের সাহেব আলী (৩৫) মারা যান। তারা সবাই বার্ধক্যজনিত কারণে এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বলে টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. পারভেজ জানান।

ড্যাবের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন : মুসল¬ীদের ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিতে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করেছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)। ইজতিমার প্রথম দিন গতকাল শুক্রবার সকালে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের দক্ষিণ পাশে টঙ্গী থানা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আকবর হোসেন ফারুকের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গনে মেডিকেল ক্যাম্প উদ্ধোধন করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, ইজতিমায় আগত মুসল¬ীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে কেন্দ্রীয় ড্যাব এবং গাজীপুর জেলা ড্যাব যৌথ উদ্যোগে এই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করেছে। মেডিকেল ক্যাম্প উদ্বোধনকালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি হাসান উদ্দিন সরকার, সহ স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা.মাজহারুল আলম, ড্যাব কোষাধ্যক্ষ ডা.মোস্তাক রহিম স্বপন, জেলা ড্যাব সভাপতি ডা. এবিএম মুসা, টঙ্গী থানা বিএনপির প্রচার সম্পাদক আব্দুর রহিম খান কালা, গাজীপুর মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ফারুক হোসেন খান, মো. জাবেদ মাহমুদ, সালাউদ্দিন খোকা, কাজী জয়নাল হোসেন প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ