ঢাকা, শনিবার 14 January 2017, ১ মাঘ ১৪২৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কনকনে শীত আর শৈত্যপ্রবাহ সঙ্গী করেই এলো মাঘ

সাদেকুর রহমান : কনকনে শীত আর শৈত্যপ্রবাহ সঙ্গী করেই এলো মাঘ। পৌষের শেষদিন গতকাল শুক্রবার সকালে সারাদেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর রাজারহাটে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এবারের শীত মওসুমে সর্বনি¤œ তাপমাত্রার রেকর্ড। আর ঢাকায়ও উত্তুরে হাওয়ায় শীত অনুভূত হচ্ছে। এদিন ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সে.। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল জুড়ে মৃদু থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং আগামীকাল রোববার পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে। 

আবহাওয়া অফিস জানায়, শীতের কাঁপন ধরেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীতে। নীলফামারীর রাজারহাটে সকালে তাপমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের শীত মওসুমে এটি সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। রংপুর বিভাগের বেশির ভাগ এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে চলে এসেছে। পাশের বিভাগ রাজশাহীর অবস্থাও একই। ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আগেরদিন বৃহস্পতিবার এটি ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া বিভাগীয় শহর খুলনায় ১১ দশমিক ২, চট্টগ্রামে ১৪, ময়মনসিংহে ১১ দশমিক ৬, রাজশাহীতে ৯ দশমিক ২, রংপুরে ৬ দশমিক ৮, সিলেটে ১৩ ও বরিশালে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। 

গতকাল সকাল ৯টায় দেয়া পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার আবহাওয়া অফিস জানায়, এ শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। রোববার পর্যন্ত রাতের তাপমাত্রা কমতে থাকবে। এই সময় দেশের কোথাও কোথাও আকাশ আংশিক মেঘলা থাকবে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত নদ-নদী অববাহিকায় মাঝারি ধরনের এবং অন্যত্র হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা থাকবে। শেষ রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারাদেশে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা পরতে পারে। আবহাওয়া অফিস আরো জানায়, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে তীব্র মৃদু শৈত্যপ্রবাহ; রাজশাহী বিভাগ, রংপুর বিভাগের অবশিষ্টাংশ এবং মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, সীতাকুন্ড, রাঙ্গামাটি, শ্রীমঙ্গল ও কুষ্টিয়া অঞ্চলসমূহের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। শৈত্যপ্রবাহের এ পরিস্থিতি রোববার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে ও বিস্তার লাভ করতে পারে। আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থা সম্পর্কে অধিদফতরের নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত লঘুচাপটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মওসুমী লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

মওসুমের প্রথম দিকে শীতের তীব্রতা তেমনটা বোঝা না গেলেও জানুয়ারিতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বইতে শুরু করেছে দ্বিতীয় শৈত্যপ্রবাহ। বাংলাদেশে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীত মওসুম ধরা হয়। এবার ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে একটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও জানুয়ারি পর্যন্ত যে গড় তাপমাত্রা রেকর্ড হয়, তা গতবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি বলে আবহাওয়া অধিদফতর জানায়। পৌষের শেষভাগে এসে ৮ জানুয়ারি থেকে রাজশাহী, পাবনা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও শ্রীমঙ্গলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। এরপর সপ্তাহ না যেতেই বৃহস্পতিবার বইতে শুরু করে তৃতীয় শৈত্যপ্রবাহ। এই শৈত্যপ্রবাহ শুরুর আগে গত মঙ্গলবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে রাজশাহী, রংপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক এলাকায় শীতের তীব্রতা বাড়ে।

আজ শনিবার পহেলা মাঘ। প্রাক্কালের প্রকৃতিই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে সেই লোককথা- ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’। কনকনে শীতের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে মানুষের অসুখ-বিসুখও। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা জ্বর-সর্দি, গলা ব্যথা ও ভেঙ্গে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং আমাশয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকরা এ সময়ে খুব সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতেও ভিড়। জ্যাকেট-সোয়েটার, চাদর, মাফলার, কানবন্ধনী-টুপি, কম্বল-কাঁথা ইত্যাদি বেচাকেনা অনেক বেড়ে গেছে। তবে শীতবস্ত্রের অভাবে হতদরিদ্র মানুষকে প্রচন্ড দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

 পৌষের সহোদরা মাঘের নামকরণ হয়েছে ‘মাঘা’ তারার নাম অনুসারে। প্রখ্যাত বাংলা অভিধান-প্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ আছে, ‘শীত বিণ [শীত + অ (অচ্); স্ত্রী -তা]  শীতস্পর্শ (সায়ণ), শীতল, শৈত্যযুক্ত, শিশির।’ আর মাঘ হলো ‘মঘানক্ষত্রযুক্ত’ বা ‘মাঘীপৌর্ণমাসীযুক্ত মাস’। সাধারণত ৩০ দিনে মাঘ মাস গণনা করা হয়। মাঘ মাসের শেষভাগে কখনো কখনো বৃষ্টি হয়ে থাকে। এ মাসে আমের মুকুল আসে। খনার বচনে রয়েছে, “যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ”। মাঘ মাসের পূর্ণিমাকে বলা হয় ‘মাঘী পূর্ণিমা’। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা উদযাপন করা হয়। ১১ মাঘ ব্রাহ্মণ সমাজের মাঘোৎসব। বহু কবিতায় মাঘ মাস একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত। 

বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, “শীতকাল ষড়ঋতুর পঞ্চতম এবং উষ্ণতর গ্রীষ্মের বিপরীতে বছরের শীতলতর অংশ। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে পৌষ ও মাঘ (মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি) এ দু মাস শীতকাল হলেও বাস্তবে নবেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতের ঠান্ডা অনুভূত হয়। এ সময় সূর্য দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থান করে বলে বাংলাদেশে সূর্যের রশ্মি তির্যকভাবে পতিত হয় এবং তাপমাত্রার পরিমাণ থাকে কম। এ সময়ে দেশের দক্ষিণাংশের তুলনায় উত্তরাংশে শীতের তীব্রতা বেশি থাকে। প্রবল শৈত্যপ্রবাহে দেশের উত্তরাঞ্চলে অনেক সময় প্রাণহানিও ঘটে থাকে।” 

বাংলাপিডিয়ায় আরো বর্ণিত হয়েছে, “শীতকাল বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক ঋতু। এ ঋতুতে গাছের পাতা ঝরতে থাকে। আমলকী, জলপাই, মাদার প্রভৃতি কোনো কোনো বৃক্ষ পত্রশূন্য হয়ে যায়। এ সময় শিশির পড়ে। সকালে ঘন কুয়াশায় পথঘাট ঢেকে যায়। এ সময় তরিতরকারির প্রাচুর্য দেখা যায়। কপি, মুলা, বেগুন, পালংশাক, মটরশুটি ইত্যাদিতে হাট-বাজার পূর্ণ থাকে। কৈ, মাগুর, শিংসহ অন্যান্য  মাছ এ সময় প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। শীতে গাঁদা ও  সূর্যমুখী ফুল ফোটে। কমলালেবু এ ঋতুরই ফল। বরই শীতের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ফল। শীতকালে খেজুর রস পাওয়া যায়। এ রস থেকে তৈরি হয় বিখ্যাত খেজুরের গুড়। ঘরে ঘরে ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, পুলি ইত্যাদি  পিঠা তৈরি করা হয়।”

মাঘের শীত এ দেশের প্রতিটি মানুষের কাছেই অন্য রকম ‘আতঙ্ক’। হতদরিদ্র মানুষ আগুন জ্বালিয়ে শীত রোখার চেষ্টা করে। শীতের কামড় থেকে গা বাঁচাতে কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়ে লেপ-কাঁথা বানাতে। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্র শীতবস্ত্রের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। মওসুমী গরম কাপড় বিক্রেতাদের এখন সুবর্ণ সময়। কেউ বা এ সময়টাতে অন্য কোনো কাজ না থাকায় পাটের শিকা বা ব্যবহার্য জিনিস  তৈরি করে গৃহস্থালী প্রয়োজন মেটাবার নিমিত্তে পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ভাষায়- “বউদের আজ কোনো কাজ নেই, বেড়ায় বাঁধিয়া রশি/সমুদ্র কলি শিকা বানাইয়া নীরবে দেখিছে বসি/কেউবা রঙ্গীন কাঁথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি/তারে ভাষা দেয় দীঘল সুতার মায়াবী আখরে টানি।”

এ সময়ে বন-বনানীতে বিরহের সুর বেজে উঠলেও জনপদগুলো মেতে ওঠে মেলা আর উৎসবে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) দীর্ঘ দু’দশক আগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, মাঘ মাসে সারা দেশে ৭৭টি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানত, বার্ষিক মাঘী পূর্ণিমা ও ওরশ উপলক্ষে আয়োজিত এসব মেলা বসে একদিন থেকে ১৭ দিনব্যাপী।

বাংলা সাহিত্যে ঋতু-প্রকৃতি নিয়ে অনেক কথা বলা হলেও ‘জবুথবু’ মাঘের প্রসঙ্গ দুর্লভ। তবে কৃষি ও কৃষকের সাথে এর একটি যোগসূত্র রয়েছে। খনার বচনে উল্লেখ আছে- ‘পৌষের শেষ আর মাঘের শুরু/এর মধ্যে শাইল বোরো যত পারো।’ গাছে গাছে ডালে ডালে আমের কুশি এখন বোলে পরিণত হচ্ছে। খনার বচনে এ সময়ের বৃষ্টিপাতের কথা বলা হয়েছে-‘যদি বর্ষে মাঘ/গিরস্থের বন্ধে ভাগ (ভাগ্য)’। রিক্ত নিঃস্ব মাঘের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্বাতন্ত্র্য হলো, এ মাসের আগমন চির নতুন ও চির সবুজের প্রতীক বসন্তের  নৈকট্যকে ইঙ্গিত করে- যা সকলেরই কাম্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ