ঢাকা, শনিবার 14 January 2017, ১ মাঘ ১৪২৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ২০১৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে ব্লাড টেলিগ্রামের মূল কপি হস্তান্তরকালে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট যথার্থই বলেছিলেন, ভিন্নমত প্রকাশ এবং বিরোধীদের অধিকার চর্চার পর্যাপ্ত ও নিরাপদ সুযোগ এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত হতে পারে। তার এ বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, বাংলাদেশের মানুষের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। যেটি এখনো বিদ্যমান রয়েছে। তা বক্তব্যের দুই বছর পর গণতান্ত্রিক অধিকার পালনে আরও কঠোর অবস্থানে সরকার। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গেল বছরে তারা রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার জন্য সাতবার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সরকার তাদের সংবিধান সম্মত সমাবেশ করতে দেয়নি। শুধু বিএনপি নয়, বিরোধী দলগুলো তাদের সংবিধান সম্মত অধিকার পাচ্ছেনা।
সভা সমাবেশ এমনকি মানববন্ধনেও গত কয়েকবছর ধরে এক রকম অলিখিত নিষেধাজ্ঞা রেখেছে সরকার। দেশের বিরোধী প্রায় রাজনৈতিক দলের অফিসে তালা। হাজার হাজার মামলা। লক্ষাধিক নেতাকর্মী কারাগারে। বিএনপি কার্যালয় ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নেতাকর্মীদের পদচারণায় বাধা দেয়া হয়। বস্তুত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান গণতন্ত্রের অন্যতম মূলকথা, যা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে দীর্ঘ প্রায় তিন বছরেরও বেশী সময় ধরে। যদিও ২০০৬ সালে শেষের দিকের অগণতান্ত্রিক সরকারের সময় থেকেই দেশে রাজনৈতিক অচলবস্থা সৃষ্টি হয়। এটি ২০০৮ সালের একটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর আরও প্রকট হয়ে উঠে। অনেকেই ভেবেছিল অগণতান্ত্রিক সরকারের অচরণ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষা নেবে। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই আ’লীগ সেটি ভূলে যায়। তারা বিরোধীদের উপর এখন নির্যাতনের স্টীমরোলার চালাচ্ছে। দেশের অর্থনীতি, শিক্ষাসহ প্রতিটি খাতে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এ অবস্থার অবসানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে ২০ দলীয় জোট বারবার সংলাপের দাবি করে আসছে। এ দাবির সাথে একাত্মতা জানিয়ে সংলাপের তাগিদ দিচ্ছে জাতিসংঘসহ বিদেশীরা। সরকারপক্ষ বলছে, কোনো আলোচনা নয়। ২০১৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকবে। সরকার তার  অবস্থানে অটল থাকায় সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বরছেন, মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করা কোন মতেই গণতন্ত্রের চর্চা নয়, তেমনি প্রভাব খাটিয়ে বিরোধী পক্ষকে দমিয়ে রাখার চেষ্টাও প্রকৃত গণতন্ত্র নয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দেশের অন্যতম বড় দল। তাদের সঙ্গে সংলাপ ছাড়া দেশে স্থায়ী শান্তি আসবে কীভাবে? ধরা যাক, বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন বিরোধী পক্ষ করছে, সরকার সেটি বাস্তবায়ন না করে কঠোর অবস্থান নিয়ে তা দমন করবে।
একতরফা আরো একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবে তাহলে কি দেশে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে? পরে নতুন করে পরিস্থিতি অশান্ত হওয়ার আশংকা কি থেকেই যাবে না? দেশবাসীর বড়  অংশই ২০ দলীয় জোটের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই শক্তিকে বিবেচনায় না নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সুতরাং আজ হোক, কাল হোক এ দলটি বা জোটের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতেই হবে। আর সমঝোতায় পৌঁছার পূর্বশর্তই হল সংলাপে বসা। প্রশ্ন হল, সেটা কতদিনে? দেশে আবারো দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধ চলবে, মানুষ অগ্নিদগ্ধ হতে থাকবে, সম্পদ ও অর্থনীতির ক্ষতি হবে- আর দুপক্ষ যার যার অবস্থানে অনড় থেকে তা-ই হতে দেবে? গণতন্ত্রের আরেকটি মর্মবস্তু হল ছাড় দেয়ার মানসিকতা। দেশের দুই রাজনৈতিক পক্ষকেই এটা অনুধাবন করতে হবে। সরকার পক্ষ হয়তো ভাবছে, সংলাপে রাজি হয়ে গেলে তা বিএনপির জন্য এক বড় বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা প্রকারান্তরে সরকারের ক্ষতি করবে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, সরকারকেই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেকেই চিন্তিত ও বিচলিত। বিচলিত হওয়ারই কথা। সরকার এখন বিরোধীদের অর্থনীতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দখলে নিচ্ছে। সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এর পরিচালনা পর্ষদে ব্যাপক পরিবর্তন করায় সরকারের সমালোচনায় মুখর সবাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর বিপক্ষে বেশ সমালোচনা হচ্ছে। সরকারের আজ্ঞাবহ এই দেশের সবচেয়ে বড় এই ব্যাংকটিতে লুটপাটের আশংকা করছে সবাই। তাই অনেকেই তাদের আমানত তুলে নিচ্ছেন। এমনকি অনেকে তাদের একাউন্টও ক্লোজ করে ফেলছেন। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলেই সবাই মনে। অনেকেই বলছেন, একটি দেশ এভাবে চলতে পারে না। বাংলাদেশে বিগত দিনে যা কিছু অর্জিত হয়েছে, তা এদেশের সাধারণ মানুষের অতি কষ্টের ফসল। স্রেফ লুটপাট আর রাজনৈতিক কারণে এই ফসল ধ্বংস হতে পারে না এবং হতে দেয়া যায়ও না। এসব দিক বিবেচনা করেই হয়তো দেশী-বিদেশী মহল উদ্যোগী হয়েছে এবং পরামর্শ দিচ্ছে বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে। এতে দেশের মাথা আরও উঁচু হবে, বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমর্যাদাও উজ্জ্বল হবে, সর্বোপরি একটি সভ্য জাতি হিসেবে আমরা বিবেচিত হব। আমরা চাই, মানুষ তার গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাক। মানুষ স্বাধীনভাবে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক। জনগণ তাদের শারীরিক ও আর্থিক নিরাপত্তা চায়, বিরোধী পক্ষ সরকারের সমালোচনা করুক, তাদের এটা গণতান্ত্রিক অধিকার।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার দায়িত্ব রাজনীতিকদের, বিশেষ করে যারা চালকের আসনে আছেন তাদের। আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে সেটা রাজনীতিকদের ভুল ও গোঁয়ার্তুমির কারণেই হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখার অন্যতম পূর্বশর্ত হল সংলাপ-সমঝোতা ও পরমতসহিষ্ণুতা, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। ফলে এখানে যে কোনো অপশক্তির উদ্ভব ঘটার সমূহ আশংকা রয়েছে। আশংকা রয়েছে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার। এমনটি হলে এর প্রথম শিকার হবেন রাজনীতিকরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা, যেমনটি হয়েছিল এক-এগারোর প্রেক্ষাপটে। অতএব রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে বলতে চাই- সতর্ক হোন, দ্রুত সংলাপে বসুন, রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করুন, মানুষকে শান্তিতে রাখুন, সর্বোপরি দেশকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন। ১৯৯১ সালে দেশে নতুন করে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও উন্নতি হয়ে এসেছে। এর সুফল ভোগ করছে বর্তমান সরকারও। দেশে শিল্পোৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। রফতানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে প্রায় ১ কোটি মানুষের। হাজার হাজার কোটি ডলার আসছে রেমিটেন্স ও রফতানি আয় হিসেবে, যা অধিক জনসংখ্যার, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। যারা মানুষ নিয়ে ভাবেন, রাজনীতি করেন বা নেতৃত্ব দেন, এখান থেকে তাদের অনেক কিছুই শেখার আছে।
বলতে দ্বিধা নেই, গণতান্ত্রিক শাসনের একটি সংকটময় সময় এখন অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। এই সংকট এখন প্রান্তসীমায় এসে পৌঁছেছে। দেশে এক অশান্ত ও বেদনাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে বড় দুই দলের মধ্যে ঐক্যের বিকল্প নেই বলে মানুষ মনে করছে। রাজনীতিতে অশুভ শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করা বাঞ্ছনীয় নয়। রাজনীতিতে যদি পরমতসহিষ্ণুতা ও গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে কোনোভাবেই দেশে শান্তি বিরাজ করবে না। রাজনৈতিক সংকট দূর করতে হলে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। নইলে দেশে রাজনৈতিক সংকটের সুরাহা হবে না। এই সংকট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সর্বস্তরের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। অন্য সব দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিরোধী দলের নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তার দাবি নিরেট গণতান্ত্রিক দাবি। এ দাবির প্রতি সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন রয়েছে। মানুষ চায় সব দলের অংশগ্রহণে আগামীতে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু সরকার এক্ষেত্রে নীরব। তাই মানুষের শংকা দূর হচ্ছে না। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হতে পারে না। তবে রাষ্ট্রপতি যদি একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করেন তাহলে চলমান সংকট কিছুটা হলেও লাগব হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার যেভাবে খতম করা হয়েছে, তাকে ফ্যাসিবাদ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। সভা-সমাবেশ-মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে তা হলেও তার ওপর পুলিশি তদারকি দেখে মনে হয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পুলিশের মতো দানবীয় শক্তির মুক্তির জন্যই হয়েছিল। এ অবস্থার উদ্ভব হঠাৎ করে হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জনগণের ওপর এই আক্রমণ সব রকমভাবেই শুরু হয়েছিল। এখন পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ইত্যাদি বাহিনী জনগণের ওপর যেভাবে হামলা করছে সেভাবেই ১৯৭২ সাল থেকেই নবগঠিত ‘রক্ষী বাহিনী’র হামলা জনগণের ওপর শুরু হয়েছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে যা কল্পনা করাও যেত না, স্বাধীন বাংলায় প্রথম থেকেই তা শুরু হয়েছিল। অসংখ্য বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী এবং রাজনৈতিক দলের সমর্থক সে সময় রক্ষী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা পড়েছিলেন। তরুণ ও যুবকরা বিশাল আকারে ঘরছাড়া হয়ে পালিয়ে ছিলেন। অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী দেশ ছেড়ে হাজির হয়েছিলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।গত কয়েকবছর ধরে তা আবার শুরু হয়েছে। সরকারের সমালোচনা করলেই নেমে আসে নির্যাতন। কখনো কখনো মৃত্যুকেও আলিঙ্গণ করতে হচ্ছে। 
ই-মেইল: [email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ