ঢাকা, শনিবার 14 January 2017, ১ মাঘ ১৪২৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

গণতন্ত্র উত্তরণের জন্য অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য

আবু মালিহা : ২০১৬ সাল গত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক অবস্থান মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ভাবেই চলে গেছে। কারণ বিরোধী দলের আহামরি তেমন কোন তৎপরতা ছিলনা, যার কারণে সংঘাত এবং রাজনৈতিক সংকট চোখে পড়ার মতন তেমন কোন কিছু ছিলনা। জনগণ প্রতিনিয়ত নিঃশ্বাস ফেলে যে যার মত চলার চেষ্টা করেছে। অতি বাড়াবাড়ি বা সংকট সৃষ্টি করার মত অতি উৎসাহ বিরোধী রাজনৈতিক দল সহ কারো মধ্যেই তেমন পরিলক্ষিত ছিলনা। দু’চারটি সামাজিক সংকট বা রাজনীতির দলীয় কোন্দলের বাড়াবাড়ি কিছু ছিল, তবে সরকার বিরোধী আন্দোলন দেশের কোথাও তেমন ছিলনা বা করার চেষ্টা কেউ করেনি। কারণ একটাই, কোন দাবী দাওয়া বা সরকারের কর্মকান্ডের কোন কিছু প্রতিবাদ করে মাঠে নামলেই নির্ঘাত বুকে গুলি খাওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।
কেননা, বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই জিরো টলারেন্স দেখিয়ে আসছে। এর পেছনে সরকার জঙ্গীবাদ বা উগ্রবাদের ধোঁয়া তুলে খোঁড়া যুক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়ে ফেলে। অতএব সরকার বিরোধী আর কোন আন্দোলন নয়। সরকারের মতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়তে হলে সরকার বিরোধী কোন আন্দোলন নয়। সরকারের ভাষায় তা দেশকে পিছিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র। যাই হোক, বর্তমানে কোন আন্দোলন দেশে নেই। তবে তেল গ্যাস রক্ষা বা জাতীয় সম্পদ রক্ষার দাবীতে আন্দোলনরত সরকার সমর্থক বামঘেষা রাজনীতির কিছু মানুষ আন্দোলনের নামে মাঠে ময়দানে সরব রয়েছে, তবে এ আন্দোলন সরকারের গাত্রদাহ বা উৎকন্ঠিত হবার মত কোন আন্দোলন নয় এ বিষয়ে তাদের সম্যক জ্ঞান আছে।
তাই তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেই। যদিও বা দু’চারটি পুলিশের লাঠির আঘাত দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন দেশের আন্দোলন চরমে এবং তাদের দমনে সরকার খুবই কঠোর। গণতন্ত্রের দাবিদারদের মুখ রক্ষার অপকৌশলই বটে। তারা বুঝিয়ে দিতে চায় দেশে গণতন্ত্র আছে বলেই তারা আন্দোলন করতে পারছে। জাতি অবশ্য তাদের এ সমস্ত দাওয়াই হা করে গিলছে বটে। কারণ অন্য কোন উপায় নেই।
প্রসঙ্গত, রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন সহ আরো অনেক বিষয় আছে যা জাতির পক্ষ থেকে কোন ম্যান্ডেট না নিয়েই সরকার এক তরফা ভাবে তার একচেটিয়া নীতিমালা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এতে দেশের স্বার্থ থাকুক বা নাই থাকুক। এ সরকার যাদের হাতের ক্রীড়ানক তাদের স্বার্থই মূল লক্ষ্য। অতএব জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সরকার দৃঢ় প্রত্যয়ী।
এদেশের সকল রাজনীতিক এবং বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে যখন সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়, গণতন্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টি করে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করে নির্বাচন দেয়ার জন্য তখনই সরকারের মহল বিশেষের গাত্রদাহ শুরু হয়। কেননা আভিধানিক নিরপেক্ষ শব্দটিই এখন মহা যন্ত্রণার কারণ। ধর্ম নিরপেক্ষতা মানা যাবে তবে নিরপেক্ষ কোন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচন কমিশন মানা যাবে না। হেতু একটাই, তাহলে তো সবই ভেস্তে যাবে। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার এ অভিসন্ধি তো আর টিকিয়ে রাখা যাবেনা। বর্তমান সরকারের গণতন্ত্রের নমুনাই হচ্ছে যেন সাবেক পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ‘বুনিয়াদী গণতন্ত্রে’র মত। লেবেলটি ছিল গণতন্ত্রের কিন্তু আচরণ ছিল স্বৈরতান্ত্রিক। যা আজকের জেলা পরিষদ নির্বাচন তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। একদেশদর্শী দৃষ্টি ভঙ্গি, স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা এবং জুলুমতন্ত্রের ভয়াবহতা গণতন্ত্রের স্বাদ স্বপ্নকে ধুলায় মিশিয়ে দেয়। তখন জনপদের লোকদের শান্তি ও সুখ চিরতরে নির্বাসিত হয়।
আমরা কী এমন পরিস্থিতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি কিনা তা জনগণের বিবেচ্য বিষয়। ২০১৭ সাল আমাদের জীবনে নতুন সূর্যোদয়ে ভবিষ্যত রক্ষার পথকে স্বাগত জানাল। আগামী দিনে শুভ প্রত্যাশা জনগণের চোখে আশা জাগানিয়া চেতনায় দোল খাচ্ছে। ধরা দিবে কি সেই স্বপ্ন সাধ, সুখের আবাস, নিরাপদ জীবন এবং বইছে কী রাজনীতির সু-বাতাস।
এমন প্রত্যাশার দোলায় জনগণ ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নতুন বছরের শুরুর দিনে একটি দুর্ঘটনায় জন্ম দিয়ে যাত্রা শুরু করল। পত্রিকার পাতায় চোখ বুলাতেই রিপোর্টটি দেখতে পেলাম। সুন্দরগঞ্জের এমপি লিটন নিহত। দুর্বত্তদের গুলিতে তার বাসায় বুকে এবং পায়ে গুলি করে পালিয়ে যায়। আওয়ামীলীগ দলীয় এমপি নিজ বাসায় তখন দলের লোকজনের সাথে আলাপ করছিলেন। অত্যন্ত বেদনা দায়ক এবং দুঃখজনক। এতে কে বা কারা জড়িত সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। আমরা প্রকৃত দোষীদের খোঁজে বের করে কঠোর শাস্তি প্রদান করুক তা প্রত্যাশা করি।
উল্লেখ্য, নিহত এমপি ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর সকালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার গোপালচরণ গ্রামের বাড়ির পাশের সড়কে চাচার সঙ্গে হাঁটতে বের হয় শিশু শাহাদাত হোসেন সৌরভ (১২), সে গোপালচরণ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। তখন সে এমপি মঞ্জুরুলের গুলিতে নিহত হয়। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত হওয়ার পর তিনি কারাগারে ছিলেন। গত ১৫ অক্টোবর থেকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে ২৪ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তিপান আলোচিত এই এমপি।
অশুভ শক্তি এবং দুর্নীতিদের উৎখাত না করতে পারলে দেশের রাজনীতির পরিস্থিতি নিরাপদ থাকবেনা। এ ঘটনা তার স্বাক্ষী। মৃত্যু বিভীষিকা ধ্বংস এ বিভাজনের রাজনীতি ছিল বিগত সাল। গণতন্ত্র মৃত প্রায়। বস্তুত গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো পরমত সহিষ্ণুতা। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তুলতে হলে প্রথমেই দরকার জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ। যাতে থাকবে, জনগণের মতামত ব্যক্ত করার স্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতি এবং নির্বাচনের পূর্বে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, যা দলীয় প্রভাব মুক্ত থাকবে এবং দলীয় প্রভাব মুক্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যাতে করে জনগণের কোন ধরনের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে কোন দলের পক্ষে একচেটিয়া সমর্থন ব্যক্ত করার কোন সুযোগ না থাকে অবৈধ পদ্ধতিতে।
এমন ধরনের নিরপেক্ষ রাজনৈতিক প্লাট ফরম সৃষ্টি করতে পারলেই কেবল দেশের জনগণ সুষ্ঠুভাবে তার পছন্দ মত ব্যক্তির পক্ষে ভোট প্রদান করে দেশের উন্নয়নে যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবে। আর এতে করেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশের পক্ষে কাজ করতে পারবে নির্বাচিত ব্যক্তিরা। নতুবা স্বৈরাচারী মনোভাবে দলীয় প্রভাবে যদি কোন ব্যক্তি নির্বাচিত হয় তবে এর দ্বারা ব্যক্তি স্বার্থ অর্জন ছাড়া দেশ ও জনগণের স্বার্থ দেখার সুযোগ থাকবেনা। প্রকারান্তরে হিংসা হানাহানি এবং প্রতিপক্ষ দমনে তৎপর হওয়াটাই বাঞ্চনীয় হয়ে উঠে।
নতুবা কোন এমপি বা দলীয় মানুষ দ্বারা জনগণ হত্যা, গুম, খুন বা দমন নিপীড়নের শিকার হয়ে উঠবে। দেশের শান্তির পরিবর্তে অশান্তির সয়লাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে দেশের রাজনীতির পরিবেশ। বলাই বাহুল্য, বিরোধী রাজনীতিকরা বলছেন, বর্তমান সরকার যে ভাবে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য দলীয় ক্যাডার বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রীয় সকল বিভাগকে নিযুক্তির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বারোটা বাজাচ্ছেন এতে করে এ দেশে গণতন্ত্র নির্বাসিত হবার উপক্রম হচ্ছে।
অতএব এ দেশের জনগণের শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নতি সমৃদ্ধি অর্জনে এবং বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মত এগিয়ে যাওয়ার জন্য সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া এদেশের গণতন্ত্র উত্তরণের কোন পথ বিকল্প আছে কীনা আমাদের জানা নেই। তাই গণতন্ত্র উত্তরণের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অপরিহার্য।
-সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ